স্বরূপের গ্রেফতারি নিয়ে মুখ খুললেন দেব। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম
কী-ই বা বলা যায় একজন হেরে যাওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে? হেরে যাওয়া মানুষের সঙ্গে লড়াইয়েরই বা মানে কী? দেবের স্বভাব এমন নয়! স্বরূপ বিশ্বাসের গ্রেফতারির প্রসঙ্গে এখন এমনই প্রতিক্রিয়া সাংসদ-অভিনেতা দেবের। একই সঙ্গে দেব জানান, নতুন সরকারকে সবটা গুছিয়ে নিতে একটু সময় দেওয়া হোক। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর উপরে ভরসাও রাখেন দেব।
টলিগঞ্জের ফিল্ম পাড়ায় স্বরূপের ‘দাপট’ চালানোর কথা নতুন নয়। আর তা নিয়ে দেবের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্বও বহুচর্চিত। বৃহস্পতিবার রাতে তোলাবাজি ও শ্লীলতাহানির অভিযোগে টলিউডের সেই ‘সর্বেসর্বা’ স্বরূপকে গ্রেফতার করে নিউ আলিপুর থানার পুলিশ। রাত ৯টা নাগাদ তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় নিউ আলিপুর থানায়। শুক্রবার সকালে আলিপুর আদালতে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। গ্রেফতারের পর থেকেই টালিগঞ্জের বহু শিল্পী-পরিচালক নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেই থেকেই দেবের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষায় অনেকে। অবশেষে আনন্দবাজার ডট কমের কাছে মুখ খুললেন দেব। অভিনেতা বলেন, ‘‘গতকাল রাত থেকেই প্রচুর ফোন পেয়েছি। একটা কারণেই উত্তর দিতে চাইনি। কী বলব একজন হেরে যাওয়া মানুষকে নিয়ে! হেরে যাওয়া মানুষের সঙ্গে লড়াই করব? এখন প্রচুর কথা বলতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কী লাভ! যে যার কর্মের ফল ভুগবে। দেবের চরিত্র এমন নয় যে, কারও খারাপ সময়ে কিছু বলবে। যখন ওঁর ভাল সময় ছিল, তিনি সকলের খারাপ সময় এনে দিয়েছিলেন।’’
খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর নিজেরও। অভিনেতা জানান এত দিন না বলা অভিযোগের কথা। দেব বলেন, ‘‘আমি প্রথম বার বলছি কথাটা, আমাকেও সমাজমাধ্যমে ক্ষমা চাইতে বলা হয়েছিল! না হলে আমাকে আর কাজ করতে দেওয়া হবে না, এমনও বলা হয়েছিল। আমি আমার লড়াইটা লড়েছি। আজ তিনি তাঁর কর্মের ফল পেয়েছেন।’’
তৃণমূলের নেতা অরূপ বিশ্বাসের ভাই স্বরূপকে নিয়ে ভূরি ভূরি অভিযোগ এসেছে। টলিউডের এক রূপটানশিল্পীর করা অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর গ্রেফতারির পর থেকে আরও বহু ‘না বলা’ অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে টলিপাড়ায়। দেবের বক্তব্য, ‘‘আমার কাছেই ঝুড়ি ঝুড়ি অভিযোগ এসেছে ওঁর বিরুদ্ধে। আমাদেরও দোষ আছে অনেক। এখনও মনে আছে, আমি আর্টিস্ট ফোরামকে একটা মেল পাঠিয়েছিলাম যে, এত জন শিল্পীকে ব্যান করে রাখা হয়েছে। আর্টিস্ট ফোরামও কিন্তু তখন পদক্ষেপ করেনি। তারা কেন প্রশ্ন করল না স্বরূপ বিশ্বাসকে? আমরা যদি মাথা নিচু করি, আমাদের উপর দিয়ে তো হাঁটবেই কেউ না কেউ। যাঁরা মাথা উঁচু করে ছিলেন, তাঁদের আজ সম্মান বাড়ল। তাঁদের মুখে এখন হাসি, উল্লাস।’’
দেব মনে করান, শুধু শিল্পী নন, বহু টেকনিশিয়ানকেও ‘ব্যান’ করে রেখেছিলেন স্বরূপ। তাঁদের রুজি-রুটিও তো এই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি থেকেই আসার কথা। দেবের অভিযোগ, সমস্যায় পড়ে, ভয় পেয়ে অনেকে আত্মহত্যা করতে গিয়েছেন। দেব বলেন, ‘‘আমি অনেক টেকনিশিয়ানের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। বলেছি, ভাল দিন আসবে। তাঁদের অভিশাপও তো গায়ে লাগবে। আমি চাই না কেউ জেলে যাক। কিন্তু তিনি যা করেছেন, আজ তারই পরিণতি এটা।’’
এক রূপটানশিল্পীর অভিযোগ, তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে কাজ দিতেন না স্বরূপ। তখন তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল, স্বরূপ স্বমহিমায় ছিলেন। তাঁকে ভয় দেখানো হত, সেই খবর পেয়ে দেব তাঁকে এফআইআর করতে বলেছিলেন। শুক্রবার সে কথা নিজেই জানান দেব। এত দিন ধরে জমে থাকা বহু বিরক্তি প্রকাশ পায় অভিনেতার কথায়। তিনি বলেন, ‘‘আমি চেষ্টা করেছি, আমার টেকনিশিয়ানেরা যাতে নির্ভয়ে থাকতে পারেন। যদি দল জিতত, স্বরূপকে আটকানো মুশকিল হয়ে যেত। আমিই ব্যান হয়ে যেতাম। আমি ডিসেম্বর থেকে লড়ছি। স্ক্রিনিং কমিটি হয়েছে, আমি ভোট দিইনি। আমার নামে অভিযোগ দিতে লালবাজারে পৌঁছে গিয়েছিলেন অনেকে। তার মুখও ছিলেন স্বরূপ বিশ্বাস। ‘দেশু ৭’-এর ঘোষণা করার পর আমাকে বলা হয়েছিল, আমি ছবি রিলিজ় করতে পারব না। কারণ, স্ক্রিনিং কমিটিতে আমি ভোট দিইনি। ১২ জন বলেছিলেন, পুজোয় দেবের ছবি রিলিজ় করতে পারবে না। আসলে ক্ষমতা আজ আছে, কাল নেই। ভালবাসা সব সময় থাকে। অন্যায় করলে প্রতিবাদ তো হবেই।’’
আগামী দিনে যাঁরা ‘ইন্ডাস্ট্রি’ চালাবেন, তাঁদের জন্য বিশেষ অনুরোধও রয়েছে দেবের। তাঁর স্পষ্ট কথা, ‘‘আমার অনুরোধ, তাঁরা যেন স্বরূপ বিশ্বাসের মতো ভুল না করেন। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিভার অভাব নেই। কী ভাবে তাঁদের নিয়ে কাজ করানো যায়, তাঁদের তৈরি করা যায়, সে দিকেই লক্ষ্য হওয়া উচিত। নিজের সেরাটা দেওয়ার জন্য সেমিনার হওয়া উচিত। আরও সেরা কাজ করা যায়।’’
তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে কি ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে দেবের চিন্তার বার্তা পৌঁছেছিল? দেব বলেন, ‘‘আমি নিজেই অনেক বার জানিয়েছি তাঁকে। এখন দল নির্বাচনে হেরেছে বলে আমরা সকলেই কথা বলছি। সেই সময়ে কেন প্রতিবাদ করিনি? আমাকে বলা হয়েছিল, আমার ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তী আছেন বলে নন্দনে শো দেওয়া হয়নি। আমি আবার পরের ছবিতে মিঠুন চক্রবর্তীকে নিয়েছি। আমি আমার মতো করে প্রতিবাদ করেছি। এর পর থেকে আমার প্রযোজনা সংস্থার তৈরি কোনও ছবি নন্দনে চালাইনি। অতনু রায়চৌধুরীর হাত ধরে আবার আমার ছবি নন্দনে চলে। আমি আজ এটা বিক্রি করছি না। আমাদের সকলের সেই সময়ে আরও প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। রুদ্রনীল, হিরণ তো প্রতিবাদ করে অন্য দলে চলে গিয়েছিলেন। তাঁদের প্রতি আজ সম্মান বেশি মানুষের। আমার অরূপ বিশ্বাস, স্বরূপ বিশ্বাসকে নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে কারণ, তাঁরা আরও ভাল ভাবে ইন্ডাস্ট্রি চালাতে পারতেন, ইন্ডাস্ট্রির উন্নতি হতে পারত। তাঁরা তা করলেন না।’’
দেবের মনে হয়, ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর কারণেই টালিগঞ্জের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে নিয়ে চারদিকে মশকরা করা হয় এখন। তিনি জানান, এক বাংলাদেশি প্রযোজক ভিডিয়ো পাঠিয়ে দেবকে জানিয়েছিলেন, কলকাতায় শুটিং করতে গেলে অনুমতি নিতে হবে। সাংবাদিক সম্মেলন করতে হবে। দেব বলেন, ‘‘আমি তাঁকে বলেছিলাম, আপনি আসুন। আমি পাশে দাঁড়াব।’’ কিন্তু দেবের প্রশ্ন, স্বরূপ অনুমতি দিলে শুটিং হবে, যাঁকে নিয়ে কাজ করতে বলবে, তাঁকে নিতে হবে— এমনটা হবে কেন? দেবের অভিযোগ, আগে সকলে জানতেন, কলকাতায় চলচ্চিত্রজগতে কাজ করার জন্য ফেডারেশনকে শুধু জানানো প্রয়োজন। তবে অনুমতি নেওয়ার কোনও বিষয় ছিল না। কিন্তু স্বরূপ এসে অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেন। অভিনেতার প্রশ্ন, ‘‘স্বরূপ বিশ্বাস অনুমতি দেবেন কেন? তিনি তো ভগবান নন।’’ তিনি বললে ইন্ডাস্ট্রি চলবে, মানুষ কাজ করবে। এটা তো অন্যায়, বক্তব্য দেবের।
যে রূপটানশিল্পীর অভিযোগের ভিত্তিতে স্বরূপ গ্রেফতার হয়েছেন, তাঁকে নতুন ছবি ‘দেশু ৭’-এ নেওয়ার কথা ছিল দেবের। তবে তিনি এখনও কাজে ডাক পাননি বলেই জানিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দেব বলেন, ‘‘দেব কথা দিয়ে তার অন্যথা করে না। তিনি আমাদের টিমের অংশ। দু’দিন মাত্র ছবির শুটিং হয়েছে। আমার নিজস্ব টিম আছে। শুটিংয়ের ডেট পেলেই যোগাযোগ করা হবে আমার টিমের তরফে। আমি অনির্বাণকেও নিয়েছিলাম, কারও কথা ভাবিনি। দল জিতলে আমাকে শুটিং করতে দেওয়া হত না। তবে প্ল্যান-বি ও তৈরি রেখেছিলাম। এসআরএফটিআই-এর ছাত্রছাত্রীদের নিয়েই কাজ করতাম। কিন্তু অনির্বাণকে ছাড়তাম না।’’
তবে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার উপরে এখনও বিরক্তি নেই দেবের। তিনি বলেন, ‘‘আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শ্রদ্ধা করি, প্রার্থনা করি ওঁর শরীর সুস্থ থাকুক।’’ সঙ্গে দেবের বক্তব্য, দিদি তো বিশ্বাস করেই দায়িত্ব দিয়েছিলেন স্বরূপকে। তিনি এটা করবেন, তা কেউ জানতেন না।
নতুন সরকারের উপরে ভরসা রাখছেন অভিনেতা। রাজ্য সরকার সবে বদলেছে। গুছিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের একটু সময় দিতে হবে। তারা ইন্ডাস্ট্রিকে বুঝছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা বাস্তবায়িত করার মধ্যে একটু তো সময় লাগবে, মনে করেন দেব।
ঘাটাল মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে সাংসদ দেবের দীর্ঘ লড়াই। তা নিয়ে কী ভাবছেন তিনি? দেব বলেন, ‘‘আমার সঙ্গে নতুন সরকারের এখনও কোনও কথা হয়নি এই নিয়ে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন শুনলাম যে, ৫০ শতাংশ কেন্দ্র এবং ৫০ শতাংশ রাজ্যের টাকায় কাজ করবে। আমার বিশ্বাস, কাজ হবে। যদি আমার সঙ্গে দেখা হয়, আমি অবশ্যই তাঁকে জানাব। এই একটিমাত্র কারণে আমার রাজনীতিতে থেকে যাওয়া। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও মেদিনীপুরের মানুষ। তিনি জানেন, এটা হওয়া কতটা দরকার। শুভেন্দুদা আছেন বলে আমার বিশ্বাস, সময়েই কাজটা শেষ হবে।’’
দেবের এত অভিযোগের কথা কি জানেন তৃণমূলের আর কেউ? এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হয়েছিল তৃণমূল বিধায়ক তথা সম্প্রতি গোটা তিনেক ছবিতে অভিনয় করা কুণাল ঘোষের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‘আমি অতীতে যখন টালিগঞ্জে কাজ করেছি, তখন স্বরূপেরা ছিলেন না। আর সম্প্রতি তিনটি ছবিতে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি ওঁরা টেকনিশিয়ানদের নিয়ে কাজ করেন। এর বাইরে ভিতরে কী ছিল, তা আমার পক্ষে জানা সম্ভব নয়।’’ তবে এ বিষয়ে দেবের মন্তব্য শুনেছেন তিনি। সে প্রসঙ্গে কুণাল বলেন, ‘‘দেব এক নম্বর সুপারস্টার। ওঁর সঙ্গে বিশ্বাস ব্রাদার্সের দ্বন্দ্বের কথা সকলের মতো আমিও জানি। এর বাইরে কোনও মন্তব্য নেই।’’