কে প্রকৃত দাবিদার? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
আমজনতার মুখে মুখে ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স অ্যাসোসিয়েশন, সংক্ষেপে ইমপা-র নাম! যাঁরা কস্মিনকালেও বিনোদন দুনিয়ার প্রতি আগ্রহী নন, সেখানকার হালচাল সম্পর্কে কোনও খবর রাখেন না, তাঁরাও ইদানীং এই সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়ে কৌতূহলী। কারণ, একটি ‘চেয়ার’ বা সংগঠনের সভাপতি পদ নিয়ে একাধিক ব্যক্তির দড়ি টানাটানি। সংগঠনের এই কলহ ছাপিয়ে গিয়েছে রাজ্য রাজনীতিকেও।
সোমবার এ কথা নিজমুখে বলেছেন সংগঠনের বর্তমান সভাপতি পিয়া সেনগুপ্ত। কলহের জেরে তিনি সংগঠনের অফিসের বদলে সাংবাদিক বৈঠক সেরেছেন অন্যত্র! সেখানেই তাঁর আফসোস, “৮২ বছরের সংগঠনে একটি কুর্সিকে ঘিরে এত কোন্দল কখনও ঘটেনি!” রাজনৈতিক পালাবদলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে আর নেই। স্বরূপ বিশ্বাসের কথা অনুযায়ী, ফেডারেশন সভাপতিত্বের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ায় তিনি নিজেই সরে গিয়েছেন। সেখানে হাই কোর্টের নিয়ম মেনে ২০২৭ সাল পর্যন্ত ইমপা-র সভাপতি পিয়া। তিনি নির্বাচিত হয়ে এই পদাধিকারী।
তা হলে এই কুর্সি নিয়ে কেন এত টানাটানি? কেন এই পদের প্রতি সকলের এত ‘মোহ’?
আনন্দবাজার ডট কম প্রশ্ন করেছিল খোদ পিয়াকেই। তাঁর কথায়, “আমি তো নিজেই বুঝতে পারছি না সেটা। এই চেয়ারে বসলে বাড়তি কী পাওয়া যায়! আমি জানি না। কেন হঠাৎ রাজ্যে সরকার বদল ঘটায় আমায় সরে যেতে হবে? এটা কি কোনও রাজনৈতিক সংগঠন? আমি অন্তত জানি সেটা নয়।” তাঁর আরও প্রশ্ন। পিয়ার যুক্তি, “আমি যদি সকলের এত অপ্রিয় হই, তা হলে এত দিন কেন কেউ কিচ্ছু বললেন না? আমায় তো কোনও রাজনৈতিক দল এই পদে বসায়নি। বলতেই পারতেন তাঁরা, তা হলে আমার করা ভুলগুলো শুধরোতে পারতাম। বিক্ষুব্ধ প্রযোজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংগঠনের পরিবেশ স্বচ্ছ হত। দুর্নীতি থাকত না।” যদিও তাঁর দাবি, তিনি কোনও দুর্নীতি করেননি। কুর্সিকে সামনে রেখে কোনও বাড়তি বা অনৈতিক সুবিধা নেননি।
পিয়ার এই বক্তব্য বিক্ষুব্ধ প্রযোজকেরা মানতে নারাজ। আর এই জায়গা থেকেই নাকি ‘চেয়ার’ ঘিরে এত আন্দোলন।
রাজ্য রাজনীতির পালাবদল ঘটতেই রতন সাহা, শতদীপ সাহা, মিলন ভৌমিক, পীযূষ সাহা এবং পরিচালক অতনু বসুর দাবি, এত দিন তাঁরা ‘ভয়ে’ বলতে পারেননি! নতুন সরকার তাঁদের ‘ভরসা’ জুগিয়েছে। সেই জোরে পিয়া সেনগুপ্তের ‘কবলমুক্ত’ করতে চাইছেন ইমপা-কে। যেখানে আর স্বজনপোষণ হবে না, আর্থিক দুর্নীতি থাকবে না। সম্প্রতি, সংখ্যাগরিষ্ঠ ধ্বনিভোটের মাধ্যমে পিয়ার অস্তিত্বকে ‘প্রাক্তন’ তকমা দিয়েছেন এই বিক্ষুব্ধ প্রযোজকেরা। তাঁদের দাবি, রতন সাহা অস্থায়ী সভাপতি। সোমবার তাঁকে ইমপা-য় সংবর্ধনা জানানো হয়।
সেখানে তাঁকেও একই প্রশ্ন করা হয়েছিল। কেন তিনি সভাপতির আসনে বসতে চাইছেন? রতন সাফ বলেছেন, “কেন নয়? সংগঠনের বাইরে থেকে আমি সিনেমার জন্য যা যা করেছি, পিয়া কি তার সিকি ভাগও করেছেন? তা হলে তিনি কেন এই পদে থাকবেন?” একই সঙ্গে আশ্বাস দিয়েছেন, তিনি সভাপতির আসনে বসলে ছবির মানোন্নয়নের চেষ্টা করবেন। প্রযোজকদের পাশে দাঁড়াবেন। তাঁদের ভালমন্দ দেখার চেষ্টা করবেন। একই সঙ্গে রাজ্যে যাতে সিনেমা হলের সংখ্যা বাড়ে, সে দিকে নজর দেবেন। রতন সাহার কথায়, “এই সংগঠনে কোনও ভাবেই রাজনৈতিক রং লাগতে দেব না। আর্থিক তছরুপও আর হবে না এখানে।”
রতন সাহা জানিয়েছেন, কেন তিনি ‘চেয়ার’-এ বসতে চাইছেন। পিয়া কেন ‘চেয়ার’ ধরে রাখতে চাইছেন?
পিয়ার যুক্তি, “এক, আমি আইন মেনে সভাপতি। নির্দিষ্ট সময়ে আবার ভোট হোক। সেখানে যদি হেরে যাই বা পদ ছেড়ে দিই, তখন ইস্তফা দেব। তার আগে সরব কেন?” তিনি এ-ও বলেছেন, “এখন সরে যাওয়া মানে সব কলঙ্ক, সব অভিযোগ মেনে নেওয়া। কোনও কলঙ্ক, কোনও অভিযোগ নিয়ে সরব না। নিজেকে প্রমাণ করে তার পর যাব।”
এই মুহূর্তে, পরিবেশক, হলমালিক, প্রযোজক মিলিয়ে ইমপা-র সদস্যসংখ্যা অনেক। সংগঠনের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিচালক-প্রযোজক গৌতম ঘোষ বলেছেন, “অনেক দিন ধরেই সংগঠনের আবহাওয়া বদলে গিয়েছে। তাই আর এখানে আসি না।” বাকি সদস্যেরা কেন নিশ্চুপ? কী মত তাঁদের? কেনই বা তাঁরা কোনও বৈঠকেই আসছেন না! এ প্রসঙ্গে জানতে যোগাযোগ চেষ্টা করা হয়েছিল প্রযোজক অতনু রায়চৌধুরী, ফিরদৌসল হাসান, প্রদীপ নন্দী, নীলরতন দত্তের সঙ্গে। প্রত্যেকে ফোনে অধরা। ফিরদৌসল জানিয়েছেন, তিনি বৈঠকে ব্যস্ত। বদলে মুখ খুলেছেন প্রিয়া প্রেক্ষাগৃহের মালিক অরিজিৎ দত্ত এবং প্রযোজক রানা সরকার।
অরিজিৎও জানেন না, কেন ইমপা-র সভাপতি পদ ঘিরে এত দ্বন্দ্ব। পাশাপাশি এ-ও জানাতে ভোলেননি, ২০১১ থেকে সত্যিই সংগঠনটি আর ততটাও স্বচ্ছ ছিল না। অর্থাৎ, তার আগে কি সংগঠন সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ছিল? অরিজিতের কথায়, “তখন ইমপা খুবই শক্তিশালী ছিল। দাপট ছিল দেখার মতো। প্রযোজক, পরিবেশক, হলমালিক— প্রত্যেকের ঢাল হয়ে দাঁড়াত। ইমপার অনুমতি ছাড়া একটা ছবিও মুক্তি পেত না।” তার জন্য তিনি দায়ী করেছেন, দিনের পর দিন ধরে একই ব্যক্তির ‘আসন’ আঁকড়ে পড়ে থাকাকে। অরিজিতের মতে, যিনি ১২ বছর আগে প্রযোজনা করেছেন, তাঁর তো এখনকার প্রযোজনা সম্পর্কে ধারণাই নেই। তা হলে কেন তিনি এখনও পদাধিকারী? অরিজিৎ কেন সক্রিয় ভাবে দ্বন্দ্ব মেটাতে এগিয়ে আসছেন না? তিনি সাফ বললেন, “গিয়েছিলাম এক দিন। পিয়ার থেকে যে ব্যবহার পেয়েছি, তাতে ক্ষুব্ধ।” তাতেই আগ্রহ হারিয়েছেন তিনি। কলহের চোটে আমজনতার আলোচনায় ইমপা। খবরের শিরোনামও। বলতেই স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিমায় রসিকতা তাঁর, “তা হলে বলতে হবে, সদস্যেরা খুবই ভাল কাজ করছেন! বাংলা ছবির খারাপ সময়ে যে ভাবেই হোক, প্রচারে নিয়ে এসেছেন সংগঠনকে।”
প্রায় একই কথা বলেছেন রানাও। তাঁর স্পষ্ট জবাব, “ইমপা নিয়ে নতুন সরকারের কী পলিসি, সেটা জানার জন্য অপেক্ষায় রয়েছি। সরকার যা নিয়ম করবে, সেটা মেনে চলতে হবে আমাদের। আলাদা করে ইমপা নিয়ে বলার কিছু নেই এই মুহূর্তে।” পাশাপাশি এ-ও জানিয়েছেন, পিয়া সেনগুপ্তকে নিয়ে যে সব অভিযোগ উঠেছে, তার সঙ্গে তিনি সহমত।