Amit Shah's Announcement On Bengali Theater

শহরে নাটকের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হবে, ঘোষণা অমিত শাহের! ‘গ্রান্ট পাব কি’? প্রশ্ন নাট্যদুনিয়ার

দীর্ঘ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক অনুদান থেকে বঞ্চিত কলকাতার নাট্যদুনিয়া। ‘গ্রান্ট’-এর বদলে নাট্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কতটা ফলপ্রসূ হবে?

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১১ মে ২০২৬ ২১:০৪
Share:

অমিত শাহের ঘোষণায় নাট্যদুনিয়া খুশি? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বাংলা ছবি, ধারাবাহিক বা সিরিজ়ের মতোই বাংলা নাট্যদুনিয়া। এটিও একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ইন্ডাস্ট্রি বলে মনে করেন মঞ্চের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তি। তাঁদের অভিযোগ, সেই মর্যাদা মঞ্চদুনিয়া কোনও দিনই পায়নি। এমন আবহে বাংলায় পদ্মশিবিরের জয়ের পরেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহের ঘোষণা, “পুণের ফিল্ম ইনস্টটিটিউটের মতো বাংলাতেও নাটক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়া হবে।”

Advertisement

নিজের ঘোষণা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যুক্তি, “বাংলা শিল্প, শিক্ষা, সংস্কৃতির সূতিকাঘর। সেই ‘ঘর’ যত সুরক্ষিত হবে, ততই তা দেশের শিল্প-সংস্কৃতিকে আরও উন্নত করবে।” এ দিকে কেন্দ্রীয় সরকার বাংলার নাট্যদুনিয়াকে একটা সময় আর্থিক অনুদান দিত। সেই অনুদান দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ। বাংলার নাট্যদল তা-ই নিয়ে প্রতিবাদও জানিয়ে আসছে। সেই দুঃখ ভোলাতেই কি অনুদানের পরিবর্তে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ার ঘোষণা অমিত শাহের? ‘গ্রান্ট’-এর বদলে নাট্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কতটা ফলপ্রসূ হবে?

এই প্রশ্ন নিয়ে আনন্দবাজার ডট কম যোগাযোগ করেছিল নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, চন্দন সেন, পৌলমী বসু, কৌশিক সেন এবং সুজননীল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

Advertisement

‘নান্দীকার নাট্যগোষ্ঠী’র কর্ণধার রুদ্রপ্রসাদবাবু বিষয়টিকে আপাতদৃষ্টিতে ইতিবাচক বলেই মনে করছেন। তাঁর কথায়, “কথাটা শুনলে মনে হয়, ভালই হবে। বাস্তবায়িত হলে বোঝা যাবে, কতটা ভাল হল।” পাশাপাশি, কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কারা, কী প্রশিক্ষণ দেবেন— এগুলোও জানা দরকার বলে তিনি মনে করেন। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আদৌ কতটা জরুরি কলকাতার জন্য? প্রশ্নের জবাবে রুদ্রপ্রসাদবাবু বলেন, “প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আগেও প্রয়োজন অর্থ। সারা দেশে সবচেয়ে বেশি নাটক মঞ্চস্থ হয় বাংলায়। অথচ, দীর্ঘ দিন ধরে কেন্দ্র আর্থিক অনুদান থেকে বঞ্চিত রেখেছে রাজ্যকে।” এই জায়গা থেকেই তাঁর যুক্তি, অনুদান বন্ধ রেখে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি কতটা উপকারে আসবে, সেটা বুঝতে পারছেন না তিনি। রুদ্রপ্রসাদবাবু তাই চান অনুদান এবং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র— দুটোই দিক কেন্দ্র।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘মুখোমুখি’ নাট্যদলের এ বছর ৩০ বছর। ১৩ মে থেকে পাঁচ দিনের নাট্যোৎসব শুরু করছে দলটি। তার আগে অমিত শাহের এই ঘোষণা যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক শুনিয়েছে দলের অন্যতম কর্ণধার এবং সৌমিত্রবাবুর কন্যা পৌলমী বসুর কাছে। তাঁর মতে, এই ধরনের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অবশ্যই প্রয়োজন আছে। এতে শহরের মঞ্চের সঙ্গে জড়িতদের, বিশেষ করে এই প্রজন্মের অভিনেতা, পরিচালকেরা বিশেষ উপকৃত হবেন। পাশাপাশি আফসোস তাঁর, “বাংলা ছবি, ধারাবাহিক বা সিরিজ়ের মতোই বাংলা নাট্যদুনিয়া একটি শক্তিশালী স্বয়ংসম্পূর্ণ ইন্ডাস্ট্রি। এখনও সেটাই কেউ মানতে চান না!” বাংলায় বিজেপির শাসনক্ষমতা কায়েম হল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আনাগোনা হয়তো হবে। তাঁদের কাছে বা নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে কি কেন্দ্রের অনুদান বন্ধের বিষয়টি তুলে ধরবেন পৌলমী? অভিনেতা, নাট্যপরিচালকের কথায়, “আমি একা নই, প্রায় এক হাজার নাট্যদল ২০২৩ থেকে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন করছে। তাই সকলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেব। একা ‘মুখোমুখি’ নাট্যদল কিছু করবে না।”

চন্দন সেন বরাবরের স্পষ্টভাষী। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের দিন আনন্দবাজার ডট কম-কে রসিকতা করে বলেছিলেন, “ছুটির দিনে ছোটপর্দায় ‘সার্কাস’ দেখছি!” এ দিন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতেই অভিনেতা ফের রসিকতায় মেতে ওঠেন। জানান, ‘সার্কাস’ এখনও চলছে। তবে কলকাতায় অমিত শাহের নাট্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরির ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাবনা বাস্তবায়িত হলে উপকৃত হবে বাংলার নাট্যসমাজ, দাবি চন্দনের। তবে তার থেকে বেশি জরুরি আর্থিক অনুদান, মত তাঁরও। অভিনেতা বলেছেন, “আমি ওই খবরটি জানতে বেশি আগ্রহী।”

দীর্ঘ সময় ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের আর্থিক অনুদান থেকে বঞ্চিত বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব অরুণ মুখোপাধ্যায়ের নাট্যদল ‘চেতনা নাট্যগোষ্টী’। প্রসঙ্গ তুলতেই অরুণ মুখোপাধ্যায়ের ছোটছেলে সুজননীল মুখোপাধ্যায়ের দাবি, “কেন্দ্রীয় সরকারের থেকে আমার কিছু চাওয়ার আছে। দীর্ঘ কাল অনুদান বন্ধের পর সম্প্রতি আবার সেটি পাচ্ছি। সেই অর্থের পরিমাণ একদম নতুন নাট্যদলের অনুদানের সমান। তবু তো পাচ্ছি। আমার অনেক বন্ধুস্থানীয় সেটাও পাচ্ছেন না!” সেই জায়গা থেকে তিনি কেন্দ্রকে অনুদানের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানিয়েছেন। এতে যারা বঞ্চিত, তারা হয়তো অনুদানের আওতাধীন হবে। একই সঙ্গে যে দল অনুদান পাবে না, তাদের না-পাওয়ার কারণ জানানো হলে সেই দলেরও বিষয়টি বুঝতে সুবিধা হবে।

সুজননীল অমিত শাহের ভাবনার মুক্তকণ্ঠে প্রশংসা করেছেন। প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাস্তবায়িত হলে নানা স্তরে কর্মীর প্রয়োজন হবে। এতেও রোজগারের পথ খুলে যাবে বলে মনে করছেন তিনি। প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষকরা কি কলকাতার হলে ভাল হয়? প্রশ্ন করা হলে মঞ্চ এবং পর্দার অভিনেতার দাবি, “সেটা নির্ভর করবে কী কী বিভাগ থাকবে তার উপরে। যেমন, আঞ্চলিক নাট্য বিভাগ থাকলে সেখানে অন্যান্য রাজ্যের খ্যাতনামী নাট্যব্যক্তিত্বদের প্রশিক্ষণ দেওয়াটা জরুরি। তবে কলকাতার নাট্যব্যক্তিত্বদের প্রাধান্য থাকবে, এটাই আশা করি।” পাশাপাশি, আরও একটি উপলব্ধি তাঁর। অনুদান থেকে বঞ্চিত ‘চেতনা নাট্যগোষ্ঠী’কে স্বনির্ভর করতে সুজননীলকে প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়েছে। তার পরেও তিনি খুশি, কষ্ট করে নিজেদের নাট্যদলকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। সুজননীল বলেছেন, “আর্থিক অনুদান না পাওয়া একদিকে ‘শাপে বর’ হয়েছে। এতে আমরা স্বনির্ভর হয়েছি। এটারও দরকার ছিল।”

মঞ্চ এবং পর্দার দাপুটে অভিনেতা কৌশিক সেন। তাঁর ‘স্বপ্নসন্ধানী’ নাট্যদল শহরের প্রথম সারির নাট্যগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম। তিনি কিন্তু সুজননীলের ভাবনাকে সমর্থন জানাতে পারেনি। কৌশিকের কাছে খবর আছে, নির্বাচনের মাসখানেক আগে গ্রাম এবং মফস্‌সলের ৪০-৫০টি নাট্যদলের আর্থিক অনুদান বন্ধ করে দিয়েছে কেন্দ্র। তিনিও রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত বা চন্দন সেনের মতোই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এ দিকে। কৌশিক বলেছেন, “একদিকে অনুদান বন্ধ, অন্য দিকে নাট্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র যেন ‘সোনার পাথরবাটি’! সত্যিই যদি জয়ী সরকার মনে করেন, বাংলা নাট্যদুনিয়ার উন্নতিসাধন করবেন তা হলে আগে অনুদান চালু করা উচিত।” তিনি জানান, শহরের বাইরের বহু দল এই অনুদানের টাকায় বেঁচে আছে। সেই সব দল নাটকের প্রচার করতে পারে না। তাদের কথা খুব কম লোকেই জানতে পারে। তাঁর দাবি, এটা শুধুই বাংলা বা ভারতে নয়, বিদেশেও অনুদানের টাকায় নাট্যদুনিয়া চলে। উদাহরণ হিসাবে তিনি ইংলন্ডের কথা তোলেন। জানান, সেখানকার নাট্যদলগুলি সরকারি অনুদানে পুষ্ট। কৌশিকের আরও উপলব্ধি, শহরের প্রথম সারির দলের সঙ্গে শহরতলি বা গ্রামের নাট্যগোষ্ঠীর তুলনাই চলে না। কলকাতার নাট্যগোষ্ঠীরা যে ভাবে দর্শকের সমর্থন পায়, মফস্‌সলের নাট্যগোষ্ঠীর পক্ষে সেই সমর্থনলাভ কখনওই সম্ভব নয়।

তাই কৌশিকের কাছে নাট্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরির ঘোষণা অত্যন্ত হাস্যকর।

তা হলে কি কৌশিক অমিত শাহের ঘোষণায় খুশি নন? তাঁর কথায়, “আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তৈরি হলে অবশ্যই গ্রাম এবং মফস্‌সলের ছেলেমেয়েরা উপকৃত হবেন। কারণ, তাঁদের কাছে নাটক শেখাটা প্রয়োজন।” এই প্রসঙ্গে তিনি মনে করিয়েছেন মিনার্ভা রেপারেটরির কথা, যা বাম আমলে তৈরি হয়েছিল। বদলে তিনি সামনে এনেছেন অন্য একটি সমস্যা। কৌশিক মনে করছেন, বাংলার নাট্যদুনিয়ার স্বাধীনতা হয়তো জয়ী রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপে খর্ব হবে। তাঁর কথায়, “ভারতীয় জনতা পার্টি যে দর্শনে বিশ্বাসী, সেই দর্শন হয়তো নাটক শেখার সুযোগ করে দেবে। কিন্তু কী নাটক মঞ্চস্থ হবে বা কোনও ভাবে যদি দলের মনে হয়, নাটকটি জাতীয়তাবাদী বিরোধী কিংবা ধর্মে আঘাত করছে— তা হলে কিন্তু সেই নাটক মঞ্চস্থ হবে না। অর্থাৎ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকবে। কিন্তু কী নাটক হবে, কী ধরনের নাটক হবে— সেটা রাজনৈতিক দল ঠিক করে দেবে।”

এই জায়গা থেকে কৌশিকের বার্তা, “আমার অনুরোধ, অমিত শাহের ঘোষণা শুনে সুখস্বপ্নে বিভোর না হওয়াই ভাল। বরং বাংলার মঞ্চদুনিয়া এখন থেকে কোমর বেঁধে নিজেদের অস্বিস্ত্বরক্ষার লড়াইয়ে নামুন। কী করে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করবেন, তার প্রস্তুতি নিন। অনুদানের আশাও ছেড়ে দিন।” তাঁর মতে, আপাতত এই ধরনের নানা ঘোষণা শুনিয়েই হয়তো আগামী কিছু বছর বাংলায় দিব্যি কাটিয়ে দেবে বিজেপি সরকার।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement