কেয়া হুয়া

মুখ্য চরিত্রে পাওলি। তাঁর মায়ের ভূমিকায় রূপা। কেয়া চক্রবর্তীর জীবন অবলম্বনে ‘নাটকের মতো’ ছবি ঘিরে তৈরি হচ্ছে নানান নাটক। লিখছেন প্রিয়াঙ্কা দাশগুপ্ত।মুখ্য চরিত্রে পাওলি। তাঁর মায়ের ভূমিকায় রূপা। কেয়া চক্রবর্তীর জীবন অবলম্বনে ‘নাটকের মতো’ ছবি ঘিরে তৈরি হচ্ছে নানান নাটক। লিখছেন প্রিয়াঙ্কা দাশগুপ্ত।

Advertisement
শেষ আপডেট: ২৮ মার্চ ২০১৪ ১৪:৪০
Share:

প্রসাদ সেনগুপ্ত= শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়

Advertisement

খেয়া চক্রবর্তী= পাওলি

অমিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়= ব্রাত্য বসু

Advertisement

সিনেমার নাম: ‘নাটকের মতো’

গত বছর নভেম্বরে এমনটাই প্রকাশিত হয়েছিল আনন্দplus-এর পাতায়। ছবির বিষয় ছিল সত্তরের দশকের বিখ্যাত এক নাট্যাভিনেত্রীর শ্যুটিং করতে গিয়ে ডুবে মৃত্যু। পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। সে খবর প্রকাশের পর দীর্ঘ পাঁচ মাস কেটে গিয়েছে। এর মধ্যে ভোটের দামামা বেজে গিয়েছে।

Advertisement

রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত ও স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত অ্যাকাডেমিতে এসে দেখে গিয়েছেন ব্রাত্য বসু পরিচালিত নাটক ‘কে?’। নাট্যজগতে দেবেশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু অর্পিতা ঘোষ মনোনীত হয়েছেন লোকসভা প্রার্থী হিসেবে। অর্পিতাকে সমর্থন জানিয়ে একটা সম্মতিপত্রও পাঠিয়েছেন রুদ্রপ্রসাদ। স্বাতীলেখা নিজেও সমর্থন জানিয়েছেন অর্পিতার প্রেস কনফারেন্সে এসে।

আর তার পর থেকেই নাট্য ও চলচ্চিত্র মহলে আবার আলোচনা শুরু। এর পরেও কি ‘নাটকের মতো’ ছবিটা হবে? আর যদি হয়, তা হলে কি চিত্রনাট্যে কোনও পরিবর্তন আনছেন দেবেশ?

মঙ্গলবার সন্ধেবেলায় বিজন থিয়েটারে অঞ্জন কাঞ্জিলাল পরিচালিত ডি এল রায়ের ‘প্রায়শ্চিত্ত’ নাটকের মহড়ার সময় মঞ্চ ও আলো নির্মাণের তদারকি করছিলেন দেবেশ। বললেন, “রুদ্রবাবুর সঙ্গে আমার সখ্য তৈরি হলেও চিত্রনাট্যে আমি কোনও বদল আনিনি।”

কিছুই পাল্টাননি?

“না, কিছু না। ঠিক যে ভাবে আগে লিখেছিলাম এখনও তাই আছে। ছবিটির মধ্যে দিয়ে একটা সময়কে আমি ধরতে চেয়েছি। কোনও ব্যক্তিকে ছোট করার জন্য আমি ছবিটা করছি না,” সিগারেটে টান দিতে দিতে বললেন দেবেশ।

তবে যে শোনা যাচ্ছে, তিনি ছবির দু’টো চরিত্রের নাম ইতিমধ্যে বদলাবেন বলে ঠিক করেছেন? শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় অভিনীত প্রসাদ সেনগুপ্তর চরিত্রটির নাম পাল্টাবেন। সেই সঙ্গে ব্রাত্য বসু অভিনীত অমিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের চরিত্রটির নামটাও।

“হ্যাঁ, প্রসাদ নামটা রাখছি না। ওটা পিনাকী করব। অমিতেশ নামটা পাল্টে করব অরিন্দম,” বলছেন পরিচালক।

রূপা গঙ্গোপাধ্যায়

কেয়া চক্রবর্তী

পাওলি

তা এই নাম পরিবর্তনের হাওয়া তুললেন কে? শেক্সপিয়রের মতো করে শুধুই কি বলা হবে যে, নামে কীই বা এসে যায়? বিজন থিয়েটারের ঠিক উল্টো দিকে রঙ্গনা। প্রায় এক দশক আগেই সেখানে নাটক মঞ্চস্থ হওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এক সময় সেই মঞ্চেই ‘ভালোমানুষ’য়ের বহু শো করেছিলেন কেয়া চক্রবর্তী। ছবিতে অবশ্য যে হলে খেয়াকে অভিনয় করতে দেখা যাবে তার নাম রঙ্গপীঠ। খেয়ার নাট্যদলের নাম নটকার। দেবেশ অবশ্য বলছেন, “নামগুলো তো সব পাল্টাচ্ছি না। খেয়া চক্রবর্তী নামটাই রাখছি। প্রসাদ নামটা রাখলে অনেকেই রুদ্রবাবুর নামের সঙ্গে একটা সাযুজ্য খুঁজে পাবেন। ছবিতে খেয়া চক্রবর্তী নামটা হল রূপক মাত্র। প্রতিভাশালী বিবাহিত মহিলাদের নিজের মতো করে বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প এটা।”

ছবির একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা যাবে রূপা গঙ্গোপাধ্যায়কে। অভিনয় করবেন খেয়ার মায়ের ভূমিকায়। অর্থাৎ পর্দায় তাঁকে দেখা যাবে পাওলির মায়ের রোলে। চিত্রনাট্যের একটা অংশ জুড়ে রয়েছে খেয়া আর অনন্যা (রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের চরিত্রের নাম)। বিজন থিয়েটার থেকে আর কিছুটা এগোলেই রাজেন্দ্র লাল স্ট্রিটে কেয়া চক্রবর্তীর বাড়ি। “বাড়িটা দেখে কষ্ট হয়। কিছুটা ভেঙে পড়েছে। ওখানে কেয়াদির মা, অর্থাৎ লাবণ্য চক্রবর্তীর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। দেখেছি ওঁকে জানলা ধরে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতে। একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। সেখানে বলেছিলেন: ‘ছোটবেলা থেকে মা না থাকায়, একা-একা বড় হয়ে ওঠায়, দুঃখ পেতে পেতে ওর যেন দুঃখ পাওয়াটাই অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল...,” বলছেন দেবেশ।

ঠিক এই সংলাপটাই ছবিতে দেবেশ রেখেছেন অনন্যার গলায়। “আমি হয়তো তাকে দেখিনি। কিন্তু হাজার মানুষ আছেন যাঁরা লাবণ্য চক্রবর্তীকে দেখেছেন। তাই চিত্রায়ণের সময় সাবধানতা অবলম্বন করতেই হয়। আমি জানি দেবেশ খুব সিরিয়াসলি কাজটা করছে,” বলছেন রূপা।

এক দিকে দেবেশ জোর দিয়ে বলছেন যে, লাবণ্য চক্রবর্তীর হাঁটা, কথা বলার ধরন, ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তিনি রূপার কিছু মিল খুঁজে পেয়েছেন। “তাই দেবেশ আমাকে এই চরিত্রটা করতে বলছে। আমি দেবেশকে বলেছি ও যেন একদিন আমাকে শুধু লাবণ্য চক্রবর্তীর গল্প বলে। ওটাই আমার প্রিপারেশন। ওয়ার্কশপ করতেও আমি রাজি আছি,” জানাচ্ছেন রূপা।

কথা বলতে বলতে রূপার মনে পড়ে বহু বছর আগে করা একটা টেলিফিল্মের কথা। “ওটা ওর প্রথম দিকের কাজ। ওখানে আমরা অভিনয় করেছিলাম। তবে ফিচার ফিল্মে এই প্রথম কাজ করব একসঙ্গে। এই ছবিতে আমার চরিত্রটা যে বিশাল বড়, তা বলব না। এ বছর নভেম্বরে পঞ্চাশে পা দেব। এমন তো নয় যে আমি আশা করব আমাকে ভেবে চরিত্র লেখা হবে। যেটুকু সুযোগ আসে, সেটার সদ্ব্যবহার করার চেষ্টা করি। এখানেও করব। এটা বলতে পারি যে পাওলির জন্য দেবেশ একটা ‘রোল অব আ লাইফটাইম’ করার সুযোগ করে দিয়েছে।”

আপাতত পাওলি মুম্বইতে. সেখানে বসেই চিত্রনাট্যটা মন দিয়ে পড়েছেন। ছবিতে কেয়া চক্রবর্তী অভিনীত চারটে নাটক (‘আন্তিগোন’, ‘প্রোপোজাল’, ‘গুড ওম্যান অব সেজুয়ান’, ‘থ্রি পেনি অপেরা’) থেকে কিছু দৃশ্য অভিনয় করতে হবে পাওলিকে। ইতিমধ্যে তার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন তিনি। দেবেশকে দিয়ে ‘আন্তিগোন’-য়ের সংলাপ রেকর্ড করে নিয়ে গিয়েছেন মুম্বই, যাতে বুঝতে পারেন ঠিক কী ভাবে পরিচালক চান সেই দৃশ্যগুলোতে তাঁকে দিয়ে অভিনয় করাতে। “এই প্রথম রূপাদির সঙ্গে ফিচার ফিল্মে অভিনয় করব। আই অ্যাম লুকিং ফরওয়ার্ড টু ইট। চিত্রনাট্যে অনন্যা আর খেয়ার কথোপকথন বেশ অনেকটা অংশ জুড়েই রয়েছে। মা-মেয়ের মধ্যে সাঙ্ঘাতিক অ্যাটাচমেন্ট ছিল,” বলছেন পাওলি।

মায়ের সঙ্গে একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। থিয়েটার ভাড়া করার টাকা দরকার পড়লে মা-কে খেয়া বলে ওঁর দু’টো গয়না বন্ধক রেখে দিতে। আবার মায়ের পেসমেকারের জন্য টাকার প্রয়োজনে নিজে রাজি হয়ে যায় সিনেমায় অভিনয় করতে।

এই ছবির জন্য আরও ভাল করে সাঁতার শিখে নেবেন পাওলি। খেয়ার মৃত্যুর দৃশ্যকে আরও ভাল করে ফুটিয়ে তোলার জন্যই এই প্রস্তুতি। “ফলতার গঙ্গাতে শ্যুটিং হবে। ভাল করে প্রস্তুতি নিয়েই শ্যুটিং করব,” বলছেন তিনি।

আর এই কেয়া চক্রবর্তীর জলে ডুবে যাওয়ার দৃশ্যটাকে কেন্দ্র করেই আরও একটা চমক থাকছে ছবিতে। বছরখানেক আগে দেবেশের আলাপ হয় তরুণ চট্টোপাধ্যায় বলে এক ব্যক্তির সঙ্গে। “কেয়াদি শ্যুটিং করতে গিয়ে সাঁকরাইলে যখন মারা যান, তখন তরুণ ছিলেন সেটে। জলে ডুবে যাওয়ার আগে কেয়াদির হাতটা ধরে ওঁকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন এই তরুণ। তখন সিনেমার প্রোডাকশনে কাজ করতেন। এই ঘটনার পরে সিনেমা করা ছেড়ে দেন। এখন জুতোর ব্যবসা করেন আর প্রচুর থিয়েটার দেখেন। সিনেমাতে ওর একটা চরিত্র রাখছি,” বলছেন পরিচালক।

ছবিতে অবশ্য তরুণের নামও পাল্টে গিয়েছে। সেখানে তিনি প্রবীর। এই সিনেমায় ইনভেস্টিগেটিং অফিসারের ভূমিকায় থাকছেন রজতাভ দত্ত। তার সঙ্গেই থাকবে প্রবীরের একটা দৃশ্য। যেখানে তিনি শ্যুটিংয়ের সেই দিনের ঘটনা নিয়ে কথা বলবেন। তরুণের সঙ্গে টেলিফোনে দেবেশ যোগাযোগ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, “তখন আমার বয়স ১৮। সে দিন সেটে ছিলেন বসন্ত চৌধুরী, ললিতা চট্টোপাধ্যায় এবং কেয়াদি। প্রথম শ্যুটটা চিট করে নেওয়া হয়েছিল। দোতলার ডেক থেকে একতলার গদিতে কেয়াদি ঝাঁপ দেন। ডিরেক্টরের শ্যুটটা পছন্দ হয়েছিল। পরে ঠিক হয় আবার শটটা নেওয়া হবে... কী মর্মান্তিক ঘটনা... আজও ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।”

দেবেশের চিত্রনাট্য ভাল লেগেছে। এই প্রথম সিনেমায়
অভিনয় করব। তবে ছবিতে আমার চরিত্র তো
মুখ্য নয়। তাই ভয় পাচ্ছি না। অর্পিতা ঘোষ

ছবিটা দেখার পর আমার ধারণা
রুদ্রবাবু মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না।
দেবেশ চট্টোপাধ্যায়

তবে সিনেমার চমক শুধুই তরুণের চরিত্র নয়। বাস্তব জীবনে কবি কবিতা সিংহ-এর সঙ্গে কেয়া চক্রবর্তীর সখ্য ছিল। সিনেমায় সেই কবিতা সিংহের চরিত্রে অভিনয় করছেন অর্পিতা ঘোষ! এই প্রথমবার তাঁকে দেখা যাবে সিনেমায় অভিনয় করতে। ছবিতে তাঁর চরিত্রের নাম সবিতা সিংহ। “অর্পিতা ভাল অভিনেত্রী। আর ও খুব ভল কবিতাপাঠ করতে পারে। শাঁওলি মিত্রর ছোঁয়া রয়েছে ওর বাচনভঙ্গিতে। নির্বাচনের প্রচারে যাওয়ার আগেই অর্পিতাকে আমি কবিতা সিংহ সংখ্যা বলে একটা বই দিয়ে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম কবিতাগুলো পড়তে। ওটাই ওর প্রিপারেশন,” বলছেন দেবেশ।

অর্পিতা তখন বালুরঘাটে এক কর্মী-সভায় ব্যস্ত। ফোনে জানালেন এর আগেও সিনেমা করার প্রস্তাব পেয়েছেন। তবে চরিত্র পছন্দ হয়নি। আরও বলেন, “দেবেশের চিত্রনাট্য ভাল লেগেছে। আর আমার চরিত্র তো মুখ্য নয়। তাই খুব ভয় পাচ্ছি না। ইলেকশনের প্রচার সেরে রাতে আমি কবিতা সিংহের বইটা পড়ছি।

কথা বলতে বলতে বিজন থিয়েটারের মহড়াও শেষ হয়ে আসে। দেবেশের এ বার বাড়ি যাওয়ার পালা। চিত্রনাট্য লেখা শেষ। দর্শকের এ ছবি নিয়ে উত্তেজনা, কৌতূহলও বেশ ভাল মাত্রায় তৈরি হয়েছে। ভয় হচ্ছে না? ছবিটি দেখে যদি কেউ আঘাত পান? স্নিকারের তলায় সিগারেটটা চেপে নিভিয়ে দিতে-দিতে দেবেশ বললেন, “এটা তো একটা চলচ্চিত্র। ফিকশন। ছবিটা দেখার পর আমার ধারণা রুদ্রবাবু মনঃক্ষুণ্ণ হবেন না। বুঝবেন এটা এই প্রজন্মের এক নাট্যকর্মীর, রুদ্রবাবুর প্রজন্মের এক মিথ হয়ে যাওয়া নাট্যকর্মীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।”

ছবি: আশিস সাহা
মেক আপ: অনিরুদ্ধ চাকলাদার
স্ট্যাইলিং: স্যান্ডি

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement