ছবি: সুব্রত কুমার মণ্ডল।
তাঁকে কেউ ডাকে না ছোট পর্দায়।
সাড়ে চার দশকের সম্পর্কের পর সিনেমাপাড়ায় আজ তিনি দলছুট।
তাঁকে প্রায় ভুলেই গেছে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট।
কী হল বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের! টালিগঞ্জ কাঁপানো এক সময়ের পয়লা নম্বর ‘দুষ্টু লোক’। কালেভদ্রে কাজ। দুটো থিয়েটার, ‘আবাসন প্রকল্প’ আর ‘দুর্গা’। ব্যস্। বাকি যোগাযোগ ছেঁটে কেন এমন গুটিয়ে নিলেন নিজেকে?
“কেন যোগাযোগ রাখব বলুন তো? এই তো সৃজিত, ফোন করলে ধরে না। অথচ এই সৃজিত মুখোপাধ্যায় যখন বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতায় এল, রুমাদি’র (গুহ ঠাকুরতা) মেয়ে প্রথম আমার কাছেই পাঠায়। দুর্ধর্ষ একটা নাটক লিখেছিল। সেটা আমাকে দিয়ে করাতে চায়। আর এখন ...! রাজ চক্রবর্তী, রবি কিনাগিও তাই। কেউ ফোন রিসিভই করত না। এ ভাবে আমি কাজ চাইতে পারি না। করুণা চাই না কারও।” দেশপ্রিয় পার্কের কাছে, চার নম্বর তিলক রোডের ছ’তলায় নিজের ফ্ল্যাটে বসে বলছিলেন বিপ্লব।
’৭০ সালে সত্যজিত্ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ দিয়ে শুরু। এ পর্যন্ত ছবির সংখ্যা আড়াইশো পেরিয়েছে। অথচ বছর দু’তিন হল, ওঁর কাছে তেমন কোনও কাজই নেই। “অনীক দত্ত একবার বলল, ভূতের ভবিষ্যত্-এর কাস্টিং-এ আমার কথা ভেবেছিল। তার পর বয়সটা নাকি সমস্যা হওয়ায় অন্য এক জনকে নেয়। সেই অভিনেতার অভিনয় আগাগোড়া ম্যানারিজমে ভর্তি,” আনমনা গলা বিপ্লবের।
অনেকে বলে, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়ের ঔদ্ধত্য, দুর্ব্যবহারও কাজ না পাওয়ার কারণ? শুনে উত্তেজিত বিপ্লব, “এগুলো রটানো। ঔদ্ধত্য নয়, আমি স্পষ্টবক্তা। যে কারণে বারবার বিপদে পড়েছি। আর অন্যরা আমাকে এগিয়ে দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে। মনে আছে, রবিদা (ঘোষ) মারা যাওয়ার সময়। ঠিক হল, শু্যটিং বন্ধ রাখা হবে। নন্দনে মরদেহ এল। আমায় একজন বলল, এক্ষুনি এনটিওয়ানে যা। ওখানে শু্যটিং হচ্ছে। ওটা বন্ধ কর। একাই গেলাম। গিয়ে অবাক হয়ে দেখি রবিদারই বন্ধু সত্যদা (পিএলটি-র সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়) শু্যট করছেন। বন্ধ করে দিলাম শু্যটিং। এর পর রটে গেল, আমি যা-তা বলেছি। তখন কিন্তু আমার পাশে কেউ নেই।”
সে তো বহুকাল আগে। এরপরও তাঁর ব্যবহারে নাকি অতিষ্ঠ অনেকেই?
“বাজে কথা। এ সব আমারই একজন সহশিল্পীর রটনা। প্রফেশনাল জেলাসি। আমি স্টুডিয়োতে কাজ করতে গেলে সাফসুতরো রাখতে চাই। তার সুফলটা ও-ও পেয়েছে। এটা করতে গিয়ে তদ্বির-হম্বিতম্বিটা আমি করতাম। তাতে লোকজনের বিরাগভাজন হতাম। সেই সুযোগে ও আমাকে আড়ালে ‘হল্লাগাড়ি’ নাম দিয়ে ব্যঙ্গ করতেও ছাড়েনি,” ফুঁসে উঠলেন বিপ্লব। তাঁর অভিযোগ, ২০১৩-র শেষে তাঁর অসুস্থতার পর এ ভাবেই রটিয়ে দেওয়া হয়, বিপ্লব কাজ করার মতো সুস্থ নেই, “অথচ দেড় মাসের মধ্যেই আমি চাঙ্গা হয়ে যাই। এখন কাজকম্ম, মর্নিংওয়াক, যোগাসন সবই চলছে।”
চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের পরিচালনায় সদ্য কাজ করলেন ‘নির্বাসিত’-তে। ছোট রোল। একদিনের কাজ। মাস দু-তিন আগে ছিল তার ডাবিং। বলছিলেন, “অমন ছোট্ট চরিত্রে ডাকলেও কাজ করি। ভানুদা (বন্দ্যোপাধ্যায়), অনিলদা (চট্টোপাধ্যায়) আমায় বলেছিলেন, দেখবি একটা সময় আসবে, যখন লোকে রোল দিয়ে বলবে, ‘দুর্দান্ত চরিত্র!’ কিন্তু কাজ? এক কী দু’দিন।”
না, তাতেও আপত্তি নেই। বরং তেমন চরিত্র যে কালজয়ীও হয়ে যায়, তা’ও মানেন। ইন্দর সেনের ‘পিকনিক’ ছবির কথা তুললেন, “কাউকে মনে করাতে লাগে, ‘আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না’-র সঙ্গে সমিত ভঞ্জের অভিনয়?”
তা’হলে, সমস্যাটা কোথায়? স্পষ্ট করলেন বিপ্লব, “সিনিয়র কাউকে দিয়ে অমন কাজ করালে পরে বড় কাজে ডাক পাওয়ার আশা করাটা কি অন্যায়? চূর্ণীকে ‘চাঁদনি’-র অনুপম খেরের উদাহরণ দিলাম। চরিত্রটা ছোট্ট। কিন্তু পরিচালক ওকে দিয়ে পরে বড় কাজও করিয়েছেন। পাশে দাঁড়িয়ে কৌশিক (গঙ্গোপাধ্যায়) শুনে অল্প হাসল।”
সদ্য কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অপুর পাঁচালী’ দেখে মুগ্ধ। কিন্তু তার সঙ্গে এও মনে হয়েছে, অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কোনও কাজ তিনিও কি করতে পারেন না! “ইদানীং সৌমিত্রদা’র কিছু চরিত্র দেখে মনে হয়, আমিও বোধহয় খারাপ করতাম না। ওঁর প্রতি সমস্ত শ্রদ্ধা রেখে, ওঁর বক্স অফিসের সঙ্গে আমার তুলনা হয় না জেনেও কথাটা বলাও কি পাপ?”
‘অলীক সুখ’-এ ‘ডাক’ পেয়েও বাতিল হওয়ার কথা আজও ভুলতে পারেন না, “শিবপ্রসাদ (মুখোপাধ্যায়) ফোনে বলল নেবে। তারপর আবার বলল নেওয়া যাচ্ছে না, স্যরি। খুব সম্মানে লেগেছিল। এরপর অন্তত পরের ছবিতে আমাকে নেওয়ার দায়টুকুও তো ওর থাকার কথা!”
ফিরে গেলেন পুরনো কথায়। কী ভাবে বাদ গিয়েছিলেন অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের ‘পাকা দেখা’ থেকে, “বনফুলের গল্প। মহরত কার্ডেও আমার নাম ছিল। তার পরও বাদ।” মতি নন্দীর গল্প নিয়ে তৈরি এক সময়ের সাড়া জাগানো ছবি ‘স্ট্রাইকার’। শেষ পর্বে বাদ যান সেখানেও, “অথচ প্রথম দৃশ্যটাও আমার কনসিভ করা।”
এক কালে ‘বহুরূপী’-তে থিয়েটার করতেন। তখন ‘কিংবদন্তী’ নাটকে বিপ্লবের গানের গলা শুনে চমকে গিয়েছিলেন শম্ভু মিত্র। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ অভিনয়ের পর সত্যজিত্ রায় নিজে ‘বহুরূপী’-র কুমার রায়কে বলেন, “বিপ্লবের চোখমুখে এমন একটা ক্যারেকটার আছে, ওকে দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেওয়া যায়।”
অথচ সেই বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় বলতেই কি না বারবার পর্দায় ভেসে উঠেছে কোনও না কোনও ভিলেনের মুখ! ওঁর ভিলেনি অভিনয় দেখে এক সময় উত্তমকুমার বলেছিলেন, “তুই যদি এই অভিনয়টা ধরে রাখিস, অনেক দূর যাবি।” ‘দুশমন’ করার সময় পালি হিলে দাঁড়িয়ে শক্তি সামন্ত বলেছিলেন, “তুমি বম্বে চলে এলে আমার একটা ফ্ল্যাট ছেড়ে দিতে পারি।” কিন্তু এই ভিলেনি ছাপ্পাটা কি এই বয়েসে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? মানতে চান না বিপ্লব। বলেন, “ভাল চরিত্র, ভাল অভিনয়টাই শেষ কথা। নইলে অমরিশ পুরী ‘ঘাতক’ বা ‘চাচি ৪২০’ করে জনপ্রিয়তা পেতেন না। সমস্যাটা হল, এখানে তেমন করে ভাববার মতো লোক কই!”
হঠাত্ বললেন, “তরুণ মজুমদারের ‘আপন আমার আপন’ দেখেছেন? একটি জটিল চরিত্রে একজনকে নেন। বিখ্যাত এক অভিনেতা। যদিও তখন ও ততটা পরিণত ছিল না। রোলটা বোধহয় আমি ওর চেয়ে ভাল করতাম। অথচ সেখানে পরিচালক তনুদাই শেষ কথা। এমন দুর্ভাগ্য আমায় বারবার তাড়া করেছে।” তবে ইদানীং ‘ভিলেন’ চরিত্রে উত্সাহ নেই। বরং অনেক বেশি আগ্রহ ক্যারেকটার রোলে। ‘চিনিকম’ দেখে মনে হয়েছিল, বাংলায় কেন সিনিয়র আর্টিস্টকে নিয়ে এমন কাজ হয় না!
আজও একটা স্বপ্নের চরিত্র পেতে চান। প্রযোজক পেলে, ফিরতে চান পরিচালনায়। গল্পটাও বাছা আছে।
একবারের জন্য অন্তত দেখিয়ে দিতে চান, ‘দুষ্টু লোকটা’কে ভ্যানিশ করে দেওয়া অত সহজ না।