বেশিরভাগ নাটকেই ভরছে না দর্শকাসন।—নিজস্ব চিত্র।
মঞ্চে ভাল নাটক। তা দেখতে টিকিটও লাগছে না। তবু হল ফাঁকা।
এই ছবি মেদিনীপুর নাট্যোৎসবের। মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া ও বাঁকুড়া— এই চার জায়গার বিভিন্ন দলের পরিবেশনা নিয়ে মঙ্গলবার থেকে শহর মেদিনীপুরে শুরু হয়েছে নাট্যোত্সব। পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির উদ্যোগে এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পরিষদের সহায়তায় এই উত্সব চলবে আগামী রবিবার পর্যন্ত। সব মিলিয়ে ভিন্ন স্বাদের ১০টি নাটক মঞ্চস্থ হবে।
কিন্তু নাটকের সেই স্বাদ যে দর্শক টানছে না! অথচ কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের নাট্যোৎসবে ভিড় উপছে পড়ছে। প্রথম দিনেই বিক্রি হয়েছে নাট্যোৎসবের সওয়া চার লক্ষ টাকার টিকিট। বহরমপুরে একাধিক নাট্যোৎসব রয়েছে। প্রতিটিতেই টিকিটের চাহিদা তুঙ্গে। তা হলে মেদিনীপুর কেন ব্যতিক্রম? মেদিনীপুর জেলা পরিষদের প্রেক্ষাগৃহে বারোশো আসনের মধ্যে উদ্বোধনী দিনেও দু’শোর বেশি লোক হয়নি।
নাট্যমোদীদের ধারণা, মেদিনীপুরে দর্শক না হওয়ার প্রধান কারণ, কলকাতার বড় দলগুলির নাটক নেই। কল্যাণী বা বহরমপুরে স্থানীয় দলগুলির নাটক থাকলেও কলকাতার প্রায় সব বড় দলই তাদের সাম্প্রতিক নাটক নিয়ে যান। তা নিয়ে মানুষের আগ্রহ থাকে। ঘরের কাছের মঞ্চে সেই নাটক দেখতেও ভিড় হয়। তবে কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের কর্ণধার কিশোর সেনগুপ্ত জানান, সব সময়েই যে বড় দলের নাটকই দর্শক টানে, তা কিন্তু নয়। কল্যাণী কলকাতা থেকে খুব দূর নয়। নাটকের প্রতি আকর্ষণ রয়েছে এমন মানুষ কলকাতায় গিয়েই বড় দলের নাটক দেখে আসতে পারেন। তাঁরা ঘরের কাছের মঞ্চের জন্য অপেক্ষা করেন না। ভিড় তবু হয়। কিশোর বলেন, ‘‘দর্শকদেরও পরিচর্যা করতে হয়। কল্যাণী নাট্যচর্চা কেন্দ্রের যে রূপ এখন দেখছেন, তা ২০ বছর ধরে দর্শকদের পরিচর্যা করার ফল। যাঁরা এখানে নাটক দেখতে আসেন, তাঁদের নাম ঠিকানা আমরা সংগ্রহ করে রাখতাম। এখনও রাখি।’’ কিশোর জানান, দর্শকদের প্রতি বছর দু’টো চিঠি পাঠানো হয়। প্রথমটি বিজয়ার ঠিক পরে। অন্যটি নভেম্বরে। প্রথম চিঠিতে থাকে নাট্যোৎসবের সম্ভাব্য সূচি। দ্বিতীয় চিঠিতে পূর্ণাঙ্গ সূচি। তারই প্রতিফলন ঘটে নাট্যোৎসবে।
মেদিনীপুরে সেখানে নাটকের দলগুলিই অপুষ্টিতে ভুগছে। পুরপ্রধান প্রণব বসু বলেন, “এক সময় নাট্যচার্য্য শিশির ভাদুড়ি ছোটবাজারে থাকতেন। বিদ্যাসাগর হলে বহু নাটক হত। আমরাও দেখতে আসতাম। এখন হল ফাঁকা।’’ আজকাল শহরে কেমন নাটক হয়? নাট্য নির্দেশক সঞ্জীব সরকার বলছেন, “মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করেই গল্প খোঁজার চেষ্টা করি। মানুষ তাঁর আশেপাশের ঘটনাই দেখতে পছন্দ করেন।” নাট্য নির্দেশক দেবাশিস পলমলেরও কথায়, “বাস্তব জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা নানা কাহিনি নিয়েই গল্প খোঁজার চেষ্টা করি। বাস্তব অনেক বেশি চমকপ্রদ।”
তবে দু’জনেই মানছেন সে ভাবে ওয়ার্কশপ করা হয় না। আর এক নাট্য নির্দেশকের স্বীকারোক্তি, “হয়তো সব চরিত্র মানানসই হয়ে ওঠে না। তবে নতুনদের তো সুযোগ দিতে হবে। ফলে, চেষ্টা সত্ত্বেও ফাঁক থেকে যায়!”
অথচ এই মেদিনীপুরেই এক সময় রমরম করে চল বিভিন্ন নাটক। মন্ত্রী সুকুমার হাঁসদা বলছিলেন, “যখন টেলিভিশন ছিল না, সিরিয়ালের আকর্ষণ তৈরি হয়নি। তখন কবে নাটক হবে, সেই অপেক্ষায় থাকতাম। মাইলের পর মাইল হেঁটে লোকে নাটক-যাত্রা দেখতে যেত।’’ মেদিনীপুরে সেই হারিয়ে যাওয়া উন্মাদনাটাই ফেরাতে চান উদ্যোক্তারা। পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির সদস্য-সচিব দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, “সরকারের নীতি মেনে উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ হয়েছে। নাটকের ক্ষেত্রেও নির্দেশ রয়েছে, শুধু কলকাতায় নাট্যমেলা করলে হবে না। মফস্সলে ভাল প্রেক্ষাগৃহ থাকলে সেখানেও তা করতে হবে।’’
সেই মতো মেদিনীপুরের এই নাট্যোৎসব নিয়ে আগাম প্রচার চালানো হয়েছিল। শহরের বিভিন্ন এলাকায় তোরণ হয়েছে। লাগানো হয়েছে ব্যানার। প্রচারগাড়িও বেরিয়েছে। তবু স্পট লাইটের আলোর থেকেও চোখে লেগেছে দর্শকদের অনুপস্থিতি। জেলা তথ্য-সংস্কৃতি আধিকারিক কৌশিক নন্দীর অবশ্য, “শুরুর দিন একটু কম দর্শক ছিলেন। তবে পরের দিনগুলোয় দর্শক সংখ্যা বেড়েছে।’’ তবে বাস্তব হল নাট্যোৎসবের আঙিনা ফাঁকা। মেদিনীপুরের এক প্রবীণ নাট্য-নির্দেশক বলছেন, তরুণ প্রজন্মকে নাট্যচর্চায় উত্সাহিত করা না গেলে ছবিটা বদলানো বেশ কঠিন।