হাতেকলমে দেবেশ, খুশি শর্মিষ্ঠারা

নিজের বাড়িতেই একটা ছোটখাটো শাড়ির ব্যবসা। সেই নিয়েই ঘর-সংসার সাঁইথিয়ার গৃহবধূ শর্মিষ্ঠা ঠাকুর কর্মকারের। তার ফাঁকে ফাঁকে নাটকে অভিনয় করাই ওঁর নেশা। ভিতরে ভিতরে তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল, ‘‘কোথাও যদি ভাল করে নাটক শেখার সুযোগ পেতাম!’’ ঠিক যেমন আমোদপুরের উৎপল দাস অথবা সঙ্গীতভবনের রবীন্দ্রনৃত্যের স্নাতকস্তরের ছাত্রী সুস্মিতা সেন।

Advertisement

দয়াল সেনগুপ্ত , সিউড়ি

শেষ আপডেট: ১৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০০:৫৯
Share:

পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের নাট্য কর্মশালায় জেলার নবীন ছেলেমেয়েরা। —তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়

নিজের বাড়িতেই একটা ছোটখাটো শাড়ির ব্যবসা। সেই নিয়েই ঘর-সংসার সাঁইথিয়ার গৃহবধূ শর্মিষ্ঠা ঠাকুর কর্মকারের। তার ফাঁকে ফাঁকে নাটকে অভিনয় করাই ওঁর নেশা। ভিতরে ভিতরে তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল, ‘‘কোথাও যদি ভাল করে নাটক শেখার সুযোগ পেতাম!’’ ঠিক যেমন আমোদপুরের উৎপল দাস অথবা সঙ্গীতভবনের রবীন্দ্রনৃত্যের স্নাতকস্তরের ছাত্রী সুস্মিতা সেন। উজ্বল কবিতা ভালবাসেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতাপাঠের জন্য ওঁর ডাক পড়ে। তবে বেসরকারি সংস্থার চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর নাটকের প্রতি উজ্বলের নাটকের প্রতি প্রেম যেন দ্বিগুণ হয়েছে। কিন্তু কোথায় তেমন প্রশিক্ষণ মিলবে কোথায়? তেমন ঠিকানার সন্ধানে ছিল সুস্মিতাও।

Advertisement

সম্প্রতি তিনজনেই তেমন একটি নাট্য প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছেন। ওঁরা তিন জনই নন, মোট পনেরো জন নাট্যকর্মী ও অনুরাগীদের নিয়ে সিউড়িতে শুরু হয়েছে প্রযোজনা ভিত্তিক নাট্য প্রশিক্ষণ শিবির। জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর সংলগ্ন সিধো কানহু মঞ্চেই চলছে রিহার্সাল। শিক্ষক নাট্য নির্দেশক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়। নিখরচায় জেলায় এমন সুযোগ মিলবে তা যেন ওঁরা ভাবেতেই পারছেন না! শিবিরে যোগ দিতে গিয়ে তৃতীয় বর্ষের একটি পেপার দেবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সুস্মিতা! বলছেন, ‘‘পরীক্ষাটা পরের বার দেওয়া যাবে। দেবেশ স্যারকে আবার কবে পাব তার কী ঠিক আছে!’’

১৩ তারিখ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত টানা দশ-বারো ঘন্টার ওই প্রশিক্ষণ শিবির থেকেই তৈরি হবে মহাশ্বেতাদেবীর কাহিনি ‘কালিদাসের হেঁয়ালি’ অবলম্বনে একটি নাটক। না আগে থেকে কোনও স্ক্রিপ্ট নেই! দেবেশবাবুর নির্দেশনায় স্ক্রিপ্ট লেখা হচ্ছে রিহার্সাল চলতে চলতেই। হঠাৎ জেলায় এসে নাটকের প্রশিক্ষণ শিবিরে দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের মতো ব্যস্ততম পেশাদার নাট্য ও সিনেমা নির্দেশক?

Advertisement

প্রায় দশ বছর ধরে তথ্যচিত্র বানাচ্ছেন দেবেশ। তিরিশটিরও বেশি নাটক পরিচালনা করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাজ হল ‘ফ্যাতারু’, ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’, ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’ ও ‘দেবী সর্পমস্তা’। সত্তরের দশকের এক নাট্যাভিনেত্রীর জীবন-নির্ভর ছবি ‘নাটকের মতো’ প্রশংশিত হয়েছে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেও।

দেবেশবাবু এমন কাজ আগেও করছেন। দক্ষিণ দিনাজপুর, বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরে। দক্ষিণ দিনাজপুরে লোকনাটক ক্ষণের শিল্পীদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল গিরিশ কন্নড়ের কাহিনি নিয়ে নাটক ‘হয়বদন’। সেটি কলকাতা নাট্য উৎসবে মঞ্চস্থ হয়েছিল। কিন্তু বীরভূমে প্রশিক্ষণ দিতে আসার পিছনে বড় ভূমিকা নিয়েছে তাঁরই এক ছাত্র গম্ভীরা ভট্টাচার্য। যিনি আদতে সিউড়িরই বাসিন্দা। শুধু মাত্র থিয়েটারকে পেশা করার ইচ্ছে নিয়ে যিনি গত কয়েক বছর ধরে কলকাতায় পড়ে রয়েছেন। দেবেশবাবুর নির্দেশিত ‘দেবী সর্পমস্তায়’ অভিনয়ের পরই তাঁর কলকাতায় থেকে যাওয়া। গম্ভীরাই শিক্ষক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়কে নিজের জেলার নাট্যকর্মীদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য আবদার জানান। দেবেশবাবু রাজি হওয়ার পর মূলত তাঁরই উদ্যোগে প্রশিক্ষণ শিবির বাস্তবায়িত হল। গম্ভীরা বলেন, ‘‘জেলায় অনেক ট্যালেন্টেড নাট্যকর্মী রয়েছেন। তাঁরা সেভাবে সুযোগ পান না। আমি চেয়েছিলাম যাতে ওঁরা সেই যুযোগ পান। যেমন ভাবা, তেমন কাজ।’’

Advertisement

নিজের ফেসবুক অ্যকাউন্ট থেকে প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুক জেলার নাট্যকর্মী বা অনুরাগীদের সঙ্গে যোগযোগ করেন গম্ভীরা। বিজ্ঞাপনও দেন স্থানীয় পত্র পত্রিকায়। পাশে পেয়ে যান আগে সিউড়ির যে দেল কাজ করতেন সেই ইয়াং নাট্য সংস্থার কর্ণধার নির্মল হাজরা, নাট্য সংস্থা বীরভূমের আননের কর্ণধার বাবুন চক্রবর্তী ও সিউড়ির কিছু বন্ধু-বান্ধবদের। তাঁদের বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরে প্রশিক্ষণে আসা সকলের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাও করে ফেলেন।

এমন উদ্যোগে নিজেকে জড়াতে পারার অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে দেবেশবাবু বলেন, ‘‘আমি নিজে জেলার ছেলে। চাই জেলায় যাঁর ট্যালেন্টেড নাট্যকর্মী রয়েছেন, যাঁরা সুযোগের অভাবে আটকে যান, তাঁরা যেন কলকাতায় গিয়ে বৃহত্তর দর্শকুলের কাছে নিজেদের কাজ নিয়ে নিজেদের মেলে ধরতে পারেন। সঙ্গে আধুনিক নাটকের সঙ্গে ওঁদের ধারনা তৈরি হবে। আগেও জেলায় নাট্য প্রশিক্ষণ শিবির করেছি। ইচ্ছে আছে এই নাটকও কলকাতায় মঞ্চস্থ করার।’’

‘‘এমন করে কেউ শেখায়নি। সেই অর্থে নাটকের সহজপাঠ এই প্রথম!’’ বলছেন, সুস্মিতার মতোই নাটকের প্রশিক্ষণে যোগ দিতে পেরে খুশি উৎপল-শর্মিষ্ঠারাও।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement