অধিকাংশ স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের কাছেই এখন কার্বোহাইড্রেট খাওয়া ‘বিষ’-এর মতো। ডায়াবিটিস, ওবেসিটি, উচ্চ রক্তচাপ বা বাড়তি কোলেস্টেরলের মতো নানা সমস্যার জন্য এই কার্বোহাইড্রেট বা শ্বেতসারকেই এখন দায়ী করা হয়। ফলস্বরূপ ডায়েট চার্ট জুড়ে ফল, সবজি, মাছ, মাংস থাকলেও বাদ পড়ছে ভাত, রুটি। তবে সব কার্বোহাইড্রেট কিন্তু এক রকম নয়। পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক বলছেন, “রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চের মতো কিছু কার্বস শরীরের জন্য শুধু ভালই নয়, বরং তা ডায়াবিটিস, অতিরিক্ত ওজনের মতো সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।”
রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চের উৎস
কাঁচা কলা, কাঁচা আম, ডালজাতীয় শস্য, ওটস, যব, মটরশুঁটির মতো কিছু খাবারে প্রাকৃতিক ভাবেই রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চ থাকে। ডায়েটে কার্বোহাইড্রেট কমাতে মূলত ভাত আর আলু খাওয়া বাদ দেন অনেকেই। কিন্তু খাওয়ার পদ্ধতির সামান্য বদলে এই ভাত, আলু খাওয়াই উপকারী হতে পারে। পুষ্টিবিদ কোয়েল পালচৌধুরী বলছেন, “ভাত, আলু, পাস্তা বা ওটসের মতো খাবার রান্নার পরে ঠান্ডা করে খেলে তাতে থাকা সাধারণ স্টার্চ গঠনগত ভাবে পরিবর্তিত হয়ে রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চে পরিণত হয়।” এ ক্ষেত্রে সকালে রান্না করা খাবার বিকেলে খেলে হবে না। খাবার রান্না হওয়ার পরে তাকে অন্তত বারো থেকে চব্বিশ ঘণ্টা ফ্রিজ়ে রেখে ঠান্ডা করে খেতে হবে। এই পদ্ধতিকে রেট্রোগ্রেডেশন প্রসেস বলা হয়। সাধারণ ডায়াবিটিস রোগী, যাঁদের আলু, ভাত, রুটির মতো কার্বোহাইড্রেটস তুলনামূলক ভাবে কম খেতে বলা হয়, তাঁরাও এই ঠান্ডা পান্তা ভাত কিংবা আলু মাখা খেতে পারেন।
তা ছাড়া, হাই গ্লাইসেমিক ইনডেক্স জাতীয় খাবার খাওয়ার আগে বাদাম, ছোলা, মটর ইত্যাদি ভিজিয়ে খেতে পারেন। তা সিদ্ধ করে খেলে কিন্তু চলবে না। খাবার একবার ঠান্ডা করার পরে ফের গরম করলে তাতে তৈরি হওয়া রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চ নষ্ট হয় না। এখন বিভিন্ন ড্রাই ফুডস কিংবা সাপ্লিমেন্ট আকারেও রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চ পাউডার পাওয়া যায়।
সাধারণ স্টার্চের সঙ্গে তফাত
এই রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চ শরীরে গিয়ে সাধারণ স্টার্চের মতো আচরণ করে না। জেনারেল ফিজ়িশিয়ান ডা. সুবীর মণ্ডল বলছেন, “বহু গ্লুকোজ় মলিকিউল পরপর জুড়ে স্টার্চ তৈরি করে। চাল, গম, আলু সবেতেই এই স্টার্চ থাকে। তবে তার মধ্যে থাকা স্টার্চের পরিমাণ আলাদা হয়। সহজ কথায়, কম সংখ্যক গ্লুকোজ় জুড়ে তৈরি স্টার্চ শরীরের পক্ষে খারাপ। বেশি সংখ্যক গ্লুকোজ় জুড়ে স্টার্চ তৈরি হলে, তা ভাল। ফাইবার দিয়ে স্টার্চ গঠিত হলে তা-ও শরীরের পক্ষে ভাল। সুতরাং স্টার্চ কী ভাবে তৈরি হচ্ছে, তার উপরে কার্বোহাইড্রেটের ভাল-মন্দ হওয়া নির্ভর করে।” সাধারণ স্টার্চজাতীয় খাবার দ্রুত হজম হয়। সে ক্ষেত্রে শরীর প্রথমে এনজ়াইমের সাহায্যে স্টার্চকে ছোট ছোট কার্বোহাইড্রেটে ভাঙে। তার পর তা ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছলে শুরু হয় হজম প্রক্রিয়া। রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চ ঠিক উল্টো। তা হজমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই স্টার্চ ক্ষুদ্রান্ত্রে হজম না হয়ে সরাসরি বৃহদন্ত্রে পৌঁছয় এবং সেখানে প্রিবায়োটিক ফাইবার হিসেবে অন্ত্রের উপকারী ব্যাক্টিরিয়াকে পুষ্টি জোগায়।
উপকার কী কী?
দীর্ঘ সময় খাবারকে ঠান্ডা করার ফলে তাতে থাকা কার্বোহাইড্রেট তখন ফাইবার হিসেবে কাজ করা শুরু করে। এ ধরনের খাবার শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে হার্টের স্বাস্থ্য ভাল রাখে।
তা ছাড়া, পিসিওএস-এর সমস্যা যাঁদের রয়েছে, তাঁদের জন্যও উপকারী।
কারা খাবেন না?
ডায়াবিটিসের রোগী বা বয়স্ক মানুষ, যাঁরা বারবার অল্প করে খান, তাঁদের প্রতিরোধক স্টার্চ না নেওয়াই ভাল। ফারমেন্টেড খাবার হওয়ায় তা গ্যাস তৈরি করে, যা থেকে পেট ফাঁপা, ব্যথা, অস্বস্তি বাড়তে পারে। ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম কিংবা ডায়রিয়ার মতো সমস্যায় ভুগলেও প্রতিরোধক স্টার্চজাতীয় খাবার খাদ্যতালিকায় না রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন পুষ্টিবিদেরা। এই ধরনের স্টার্চ গাটের স্বাস্থ্যের জন্য ভাল হলেও ক্ষুদ্রান্ত্রে অতিরিক্ত ব্যাক্টিরিয়ার সমস্যা যাঁদের রয়েছে, তাঁদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত কম ওজন অর্থাৎ এক্টোমরফিক সোমাটোটাইপে যাঁরা ভুগছেন, তাঁদেরও রেজ়িস্ট্যান্ট স্টার্চ চলবে না।
তবে এই ধরনের খাবার শরীরের জন্য ভাল হলেও, একটানা প্রতিরোধক স্টার্চ খাওয়া ঠিক না। নিয়মিত তা কতটা পরিমাণে খাদ্যতালিকায় রাখা যাবে, বিশেষত ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য, সে বিষয়ে পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া দরকার। ব্যক্তিবিশেষে এ ক্ষেত্রে পরিমাণের হেরফের হতে পারে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে