Lionel Messi's Event in Salt Lake Stadium

মেসি ফিরে গিয়েছেন, জামিনে মুক্ত শতদ্রুও! যুবভারতীকাণ্ডের দু’মাস পরেও টিকিটের টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি অথৈ জলে!

লিয়োনেল মেসির ভারত সফরের আয়োজন করেছিলেন শতদ্রু দত্ত। যুবভারতীর ঘটনার দিনই গ্রেফতার হন তিনি। গত ১৯ জানুয়ারি গ্রেফতারির ৩৯ দিনের মাথায় অন্তর্বর্তী জামিনও পান। তবে টিকিটের টাকা ফেরতের বিষয়টি এখনও ‘বিচারাধীন’।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৫
Share:

সাড়ে ১৪ হাজার টাকার টিকিট হাতে হতাশ দর্শক। —ফাইল চিত্র।

দু’টি মাস কেটে গিয়েছে। কেউ কথা রাখেনি। কেউ কথা রাখে না। গত ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিয়োনেল মেসিকে ঘিরে যে নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছিল, তার অব্যবহিত পরে সংবাদমাধ্যমের সামনে রাজ্যপুলিশের তৎকালীন ডিজি রাজীব কুমার বলেছিলেন, দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়া উচিত। দর্শকদের টাকা ফেরত না দেওয়া হলে আইনানুগ বিযবস্থা নেওয়া হবে বলেও প্রকাশ্যে জানিয়েছিলেন তিনি। গত ৩১ জানুয়ারি পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নিয়ে নিয়েছেন রাজীব। কিন্তু দর্শকেরা এখনও কেউ টিকিটের টাকা ফেরত পাননি।

Advertisement

মেসির ভারত সফরের আয়োজক ছিলেন শতদ্রু দত্ত। তিনি ওইদিনই গ্রেফতার হন। গত ১৯ জানুয়রি তিনি অন্তর্বর্তী জামিনও পেয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তার পর থেকেই তিনি কার্যত বেপাত্তা। তাঁকে প্রকাশ্যে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ফোনেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। শতদ্রু জামিন পেয়ে গিয়েছেন। কিন্তু দর্শকেরা টিকিটের টাকা ফেরত পাননি।

যুবভারতীর ঘটনার পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড়ে দেওয়া তদন্ত কমিটিও তাদের বক্তব্যে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিল। রাজ্যের বিশেষ তদন্তকারী দলও (সিট) বার বার আদালতে টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছে। তবু এখনও কোনও দর্শক টাকা ফেরত পাননি।

Advertisement

গত ১৩ ডিসেম্বর যুবভারতীতে মেসিকে দেখতে বহু মানুষ দূরদূরান্ত থেকে (ভিন্‌রাজ্য থেকেও) এসে ভিড় করেছিলেন সল্টলেক স্টেডিয়ামে। দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি অনলাইন সংস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেও তাঁরা মেসিতে দেখতে পাননি! আর্জেন্তিনার তারকা ফুটবলারকে ঘিরে মন্ত্রী-সান্ত্রী-প্রভাবশালীদের ভিড়ে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আরও দুই ফুটবলার লুইস সুয়ারেজ় এবং রদ্রিগো ডি’পল। ভিড়ের চাপে তাঁদেরও হেনস্থা হতে হয়েছিল।

পরিস্থিতি দেখে মেসির নিরাপত্তারক্ষীরা আর ঝুঁকি নেননি। তাঁরা মেসি-সহ অন্য ফুটবলারদের স্টেডিয়াম থেকে দ্রুত বার করে নিয়ে যান। তার ফলে তৈরি হয় ব্যাপক গণরোষ। ভাঙচুর হয় স্টেডিয়াম। তখনই দাবি ওঠে, টিকিটের টাকা ফেরত দিতে হবে। কিন্তু সেই দাবি এবং তৎপরবর্তী প্রতিশ্রুতি সবই এখনও অথৈ জলে। দর্শকদের সে টাকা ফেরত পাওয়ার আশাও ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে। যেমন হাওড়ার বাসিন্দা অনিন্দিতা বেরা তাঁর ভাই এবং বন্ধুর সঙ্গে যুবভারতী গিয়েছিলেন মেসিকে দেখতে। কাছ থেকে দেখবেন বলে প্রত্যেকে ১৩ হাজার টাকা করে টিকিট কেটেছিলেন। অনিন্দিতার মতোই টিকিটের জন্য কেউ দিয়েছিলেন ১২ হাজার টাকা, কেউ ১৬ হাজার। কিন্তু তাঁরা এক ঝলকও দেখতে পাননি বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলারকে। অনিন্দিতা এবং আরও অনেকের মতো হাজার হাজার মানুষ এখনও অপেক্ষায়। আবার কেউ কেউ আবার আশা ছেড়ে দিয়েছেন। কারও আফসোস, ‘‘এখনও তো কেউ যোগাযোগই করল না!’’

যুবভারতীতে আসার পথে তাণ্ডবের কথা জানতে পেরে মাঝপথেই গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। পরে সমাজমাধ্যমের পোস্টে লিখেছিলেন, যুবভারতীর ঘটনায় তিনি ‘স্তম্ভিত এবং বিচলিত’। মেসি, ক্রীড়াপ্রেমী এবং ভক্তদের কাছে ‘ক্ষমা’ চেয়েছিলেন। বিশৃঙ্খলার তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই কমিটির মাথায় ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অসীমকুমার রায়। কমিটিতে ছিলেন রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব (বর্তমান মুখ্যসচিব) নন্দিনী চক্রবর্তীরা। যুবভারতীর ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ ‘বিচার’ করে তাঁরা একটি রিপোর্ট দেন। সেই রিপোর্টে যুবভারতীকাণ্ডের তদন্তের জন্য ‘সিট’ (বিশেষ তদন্তকারী দল) গঠনের সুপারিশ ছিল। সরাসরি টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা উল্লেখ না-করলেও সে বিষয়ে ‘ইতিবাচক’ মনোভাব দেখিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর তৈরি করা কমিটি। তবে ওই কমিটিও এখন সে বিষয়ে কিছু বলতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, পুরো বিষয়টি এখন ‘আদালতের বিচারাধীন’।

ওই কমিটির সুপারিশ মেনে ‘সিট’ তদন্তভার হাতে নিয়েছিল। সেই তদন্তকারী দলে ছিলেন রাজ্যের বর্তমান ডিজি পীযূষ পাণ্ডে, বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার মুরলীধর শর্মা, কলকাতার বর্তমান পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকার-সহ অন্যান্য পুলিশকর্তা। আদালতে ‘সিট’ বার বার দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সওয়াল করে। তদন্তে দেখা যায়, একটি অনলাইন সংস্থার মাধ্যমে সে দিনের জন্য যুবভারতীর টিকিট বিক্রি হয়েছিল। পরিসংখ্যান বলছে ৩৪,৫৭৬টি টিকিট বিক্রি করেছিল ওই সংস্থা। ২০ কোটি টাকার বেশি উঠেছিল শুধু টিকিট বিক্রি থেকেই।

সেই টাকা কি আদৌ ফেরত পাবেন দর্শকেরা? অনিন্দিতার কথায়, ‘‘প্রথমে মনে হচ্ছিল ফেরত পেয়ে যাব। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে, ততই আশা ক্ষীণ হচ্ছে।’’ সে দিনের টিকিটটি এখনও বাড়িতে রেখে দিয়েছেন অনিন্দিতারা। কারণ, অনিন্দিতার কথায়, ‘‘ছোটবেলা থেকে আমরা মেসির ভক্ত। ১৩ হাজার টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছিলাম। প্রয়োজনে আরও টাকা খরচ করতাম। তবে মেসিকে দেখতে পাইনি। সে দিনের স্মৃতি হিসাবে টিকিটটা রেখে দিয়েছি। আর যদি কখনও টাকা ফেরতের বিষয় হয়, তা হলে টিকিটটাই তো প্রমাণ।’’

তদন্ত চলাকালীন পুলিশ শতদ্রুর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ করেছিল। সেখানে ২২ কোটি টাকা আছে। আদালতে সওয়ালের সময় পুলিশের দাবি ছিল, ওই টাকা থেকেই টিকিটের অর্থ ফেরত দেওয়া হোক দর্শকদের। তবে এ ব্যাপারে আদালত এখনও কোনও চূড়ান্ত নির্দেশ দেয়নি। তার মধ্যেই জামিনে মুক্তি পান শতদ্রু। তাঁর তরফের দাবি, তিনি ‘দোষী’ কি না, আগে তা প্রমাণ হোক। তার পরে তো টিকিটের টাকা ফেরতের দেওয়ার বিষয় আসবে। পুলিশ এখনও চার্জশিট দেয়নি। বিচারপ্রক্রিয়াও শুরু হয়নি। এখনও প্রমাণিত নয়, যে ওই টাকা কোনও ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ নেওয়া হয়েছিল। তা হলে এখনই কেন টাকা ফেরত দেওয়ার প্রশ্ন উঠছে। বস্তুত, শতদ্রুর তরফের দাবি, এখন টাকা ফেরত দেওয়া হলে বিচারের আগেই তিনি ‘দোষী’ হয়ে যাবেন! পাশাপাশি তাঁর এ-ও দাবি, ওই টিকিটে স্পষ্ট উল্লেখই ছিল, ‘রিফান্ড’ হবে না।

মেসি ফিরে গিয়েছেন। রাজীব অবসরে চলে গিয়েছেন। শতদ্রু জামিন পেয়ে গিয়েছেন। অনিন্দিতাদের হাতে পড়ে আছে ১৩ ডিসেম্বরের টিকিট আর ফাঁকা প্রতিশ্রুতি!

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement