Facial Acupuncture

মীরার মুখে সুচের রূপচর্চা, সুপ্রাচীন থেরাপিটি প্রথম স্বীকৃতি পায় বাংলায়, কলকাতা ছিল প্রাণকেন্দ্র

সারা মুখে অসংখ্য সুচ ফুটিয়ে নজরে এসেছেন অভিনেতা শাহিদ কাপুরের স্ত্রী মীরা রাজপুত। তিনি যে থেরাপিটি করিয়েছেন, তা নিয়ে এখন বিস্তর আলোচনা চলছে। তবে এটি নতুন কোনও পদ্ধতি নয়। প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো এই থেরাপিটি চিন থেকে ভারতে নিয়ে আসেন একজন বাঙালি চিকিৎসকই। কলকাতাতেই গড়ে ওঠে তাঁর চিকিৎসাকেন্দ্র।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ ০৮:৫৭
Share:

আকুপাংচার প্রথম চালু হয় বাংলায়, চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে ওঠে কলকাতাতেই। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

সুতোর মতো সরু স্টিলের সুচ সারা মুখে বিঁধে রয়েছে। একফোঁটাও রক্ত বার হচ্ছে না। কোনও জ্বালা নেই, যন্ত্রণা নেই। সুচগুলি খুলে নিয়ে শাহিদ-ঘরনি মীরা দেখালেন তাঁর মুখ কত সুন্দর দেখাচ্ছে। ফোলা ভাবটিও আর নেই। দুই গালে খেলছে গোলাপি আভা। সুচ ফুটিয়ে রূপচর্চার এই ধরন দেখিয়ে সম্প্রতি নজরে এসেছেন বলিউড অভিনেতা শাহিদ কাপুরের স্ত্রী মীরা রাজপুত। অভিনেতা বা নামজাদা ব্যক্তিত্বরা যা করেন, তা নিয়ে কৌতুহল তৈরি হয়। তখন সেটিই আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে। স্বভাবতই মীরার রূপচর্চার পদ্ধতি নজর কেড়েছে। তবে এমন শলাকা-বিদ্ধ রূপচর্চা ভাল না মন্দ— সেটি নিয়েই কৌতুহল জেগেছে। থেরাপিটি নতুন নয়। কম করেও প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরনো। এর নাম ‘ফেশিয়াল আকুপাংচার’। অধুনা বোটক্স, লেজ়ার বা প্লাজ়মার মতো বয়স কমানোর থেরাপির ভিড়ে আকুপাংচারের নাম প্রায় হারিয়েই গিয়েছে। এটি এমন এক চিকিৎসাপদ্ধতি, যা দিয়ে হাজার রোগকে কাবু করা যায়। ভারতে এই থেরাপিটি নিয়ে এসেছিলেন একজন বাঙালি চিকিৎসকই।

Advertisement

হাজার হাজার বছর আগে চিনা রাজপরিবারেও হত ‘অ্যান্টি-এজিং’ চিকিৎসা

আকুপাংচার চিনের এক চিকিৎসাপদ্ধতি। চিনা ভাষায় ‘আকু’ শব্দের অর্থ সুচ, ‘পাংচার’ হল ফোটানো বা বিঁধিয়ে দেওয়া। শরীরের নির্দিষ্ট কিছু বিন্দু বা এনার্জি পয়েন্টে সুচ গেঁথে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা করা হয়। এই পদ্ধতিই হল আকুপাংচার। প্রাচীন চৈনিক মত অনুযায়ী, আকুপাংচার করলে শরীরে ‘চি’ বা জীবনী শক্তি প্রবাহিত হয়। এই শক্তিপ্রবাহই রোগগ্রস্ত শরীরকে সুস্থ করে, ত্বকের জেল্লা ফিরিয়ে আনে।

Advertisement

প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে চিনে শুরু হয় আকুপাংচার থেরাপি।

বয়স কমানোর চিকিৎসা বা ‘অ্যান্টি-এজিং’ থেরাপি নিয়ে এখন কতই না হইচই হচ্ছে। নিছক ফেশিয়াল করে সুন্দর হওয়ার দিন গত হয়েছে। সে জায়গায় বোটক্স, লেজ়ার ট্রিটমেন্ট, প্লাজ়মা থেরাপি বা হাইড্রা ফেশিয়ালের মতো ত্বকের চিকিৎসা ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। অথচ চিনে বহু কাল আগেই রাজপরিবারের বধূরা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে তা করার চেষ্টা করেছিলেন। চিনে সং রাজবংশের আমলে (৯৬০-১২৭৯ খ্রিস্টাব্দ) রাজবধূরা তাঁদের সৌন্দর্য অক্ষয় রাখতে সারা মুখে ও শরীরে শলাকা বিদ্ধ করে চিকিৎসা করাতেন। এতে তাঁদের শরীরে রক্ত সঞ্চালন বাড়ত, বার্ধক্যের ছাপ পড়ত না। চিন থেকে এই চিকিৎসা পরবর্তীতে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এখন বিশ্বের অন্তত ১২০টি দেশে আকুপাংচার নিয়ে গবেষণা হয়। তার মধ্যে ভারতও রয়েছে। ১৯৭৯ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) আকুপাংচারকে চিকিৎসাপদ্ধতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৫ সালে চিকিৎসা সম্পর্কিত বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি তালিকা প্রকাশ্যে এসেছিল, যেখানে আকুপাংচারকে সম্পূর্ণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন চিকিৎসাপদ্ধতি বলে উল্লেখ করা হয়। সে সঙ্গে এ-ও বলা হয় যে, এই চিকিৎসায় শতাধিক রোগের উপশম হতে পারে।

জটিল থেকে জটিলতর রোগ নিরাময়ে এই থেরাপির প্রয়োগ করা হয়।

আকুপাংচার ভারতে আসে এক বাঙালির চিকিৎসকের হাত ধরে

চিন-জাপান যুদ্ধ সে সময় চলছে। সালটা আনুমানিক ১৯৩৮। জখম চিনা সেনাদের চিকিৎসার জন্য ভারত থেকে পাঁচ জন চিকিৎসকের একটি দল চিনে রওনা দেয়। এই পদক্ষেপের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল মিশন’। সে দলে ছিলেন বিখ্যাত চিকিৎসক দ্বারকানাথ কোটনিসের সহকর্মী চিকিৎসক বিজয়কুমার বসু। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাশ করা চিকিৎসক বিজয়কুমার চিনে গিয়ে আহত সেনাদের চিকিৎসা করলেন ঠিকই, পাশাপাশি চিনের সুপ্রাচীন সব চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে পড়াশোনাও করলেন। তখনই তিনি জানতে পারেন আকুপাংচারের কথা। ১৯৩৮ থেকে প্রায় ১৯৪৩ সাল অবধি তিনি চিনে কাটান এবং নানা রকম চিকিৎসাপদ্ধতি শিখে ভারতে ফেরেন। তবে তাঁর মন পড়ে থাকে আকুপাংচারের দিকেই। পরবর্তীতে ১৯৫৮-৫৯ সালে তিনি ফের চিনে যান এবং আকুপাংচারের নানা জটিল পদ্ধতির বিষয়ে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৫৯ সালে কলকাতায় ফিরে সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য তার প্রয়োগ শুরু করেন। শুধু ফেশিয়াল আকুপাংচার নয়, শরীরের নানা জায়গায় সুচ ফুটিয়ে জটিল থেকে জটিলতর রোগের নিরাময় করতে থাকেন। যাঁরা সুস্থ হন, তাঁদের মুখে মুখে রটে যায় আকুপাংচারের কথা। গোটা বাংলাতেই এই চিকিৎসার প্রচার ও প্রচার শুরু হয়।

শরীরের বিভিন্ন এনার্জি পয়েন্টে সুচ ফুটিয়ে হয় চিকিৎসা।

শোনা যায়, চিকিৎসক বিজয়কুমার তাঁর সমস্ত সঞ্চয় ভারত সরকারকে দান করে যান, যাতে বাংলায় আকুপাংচার চিকিৎসার প্রসার ঘটে। তাঁরই প্রচেষ্টায় পশ্চিমবঙ্গে প্রথম আকুপাংচারকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একটি কাউন্সিলও গঠিত হয়। বিজয়কুমার কলকাতায় তাঁর বাড়িটিও দান করেছিলেন, যা এখন ডা. বিকে বসু মেমোরিয়াল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট অফ আকুপাংচার নামে পরিচিত।

কী ভাবে কাজ করে আকুপাংচার?

মুখে অসংখ্য সুচ ফোটালে ত্বক যে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তার নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞানেরই কারসাজি। একে বলা হয় ‘মাইক্রো-ট্রমা রেসপন্স’। ত্বকের ভিতরে সুচ গেঁথে দিলে ত্বক সেটিকে ‘ট্রমা’ বা আঘাত বলে ধরে নেয়। শরীর ওই আঘাত নিরাময়ের জন্য কৃ্ত্রিম উপায়ে প্রচুর পরিমাণে কোলাজেন ও ইলাস্টিন প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করে। কোলাজেনই ত্বককে টানটান ও তরুণ রাখে।

ত্বকে আকুপাংচার করলে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, বার্ধক্যের ছাপ মুছে যায়।

মুখ শুধু নয়, আকুপাংচার শরীরের যে অংশেই করা হোক না কেন, সেখানে রক্তপ্রবাহ বহু গুণে বেড়ে যায়। এর ফলে কোষে কোষে প্রচুর অক্সিজেন এবং পুষ্টি উপাদান পৌঁছে যায়। রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়, যা শরীরে জমা টক্সিন দূর করে। ফেশিয়াল আকুপাংচার করলে বার্ধক্যের ছাপ মুছে যায়, ত্বক ব্রণ বা দাগছোপ থেকে রেহাই পায় এবং বলিরেখাও দূর হয়।

বাতের ব্যথা থেকে পুরনো আঘাত নিরাময়, মানসিক চাপ কমানো, হজমশক্তি বৃদ্ধি, হাঁপানি বা অ্যালার্জির চিকিৎসায়, অনিদ্রা, পক্ষাঘাত-সহ নানা ক্রনিক রোগের চিকিৎসায় আকুপাংচার থেরাপির প্রয়োগ হয়। পক্ষাঘাতে পঙ্গু রোগীকে সচল করে তোলার ক্ষেত্রেও এই বিশেষ চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োগ হয় নানা ভাবে।

অনেকেই ভাবেন, সুচ ফোটালে বুঝি যন্ত্রণা হয়। তা নয়। এই সুচ এতই নমনীয় ও পাতলা, মানুষের চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম হয়, যা ফোটালে ব্যথা হয় না। তা ছাড়া শরীরের এমন কিছু পয়েন্টে সেগুলি ফোটানো হয়, যাতে ব্যথা না হয়। বরং ব্যথা কমানোর চিকিৎসাতেই এর প্রয়োগ বেশি হয়। আকুপাংচার নিরাপদ থেরাপি, যাকে মান্যতা দিয়েছেন চিকিৎসকেরাই। তবে এই থেরাপি করাতে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement