Online Game Addiction

খেলা খেলা দিয়ে শুরু...

বাচ্চা থেকে প্রাপ্তবয়স্কদের অনেকেই অনলাইন খেলায় আসক্ত। ছোটদের ক্ষেত্রে এর পরিণতি হতে পারে মারাত্মক। কী ভাবে রুখবেন সন্তানকে?

নবনীতা দত্ত

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:০২
Share:

সম্প্রতি গাজ়িয়াবাদে তিন বোনের আত্মহত্যার ঘটনা ফের উসকে দিল অনলাইন গেমিংয়ের মারাত্মক দিকগুলো। অনলাইন গেমে আসক্ত তিন বোনকে ফোন দেখার উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করলে এই চরম পদক্ষেপ করে তারা। এই ঘটনার তদন্ত এখনও চলছে, উঠে আসছে নানা বিষয়। কিন্তু যেটা স্পষ্ট তা হল অনলাইন গেমের প্রতি টিনএজারদের ক্রমবর্ধমান আসক্তি, যা নেশার পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছে। পর্যবেক্ষণ বলছে, দেশের ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সিরাই এই ধরনের নেশার শিকার হচ্ছে বেশি। সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আইসিডি-ইলেভনে অনলাইন গেমের প্রতি এই আসক্তিকে মেন্টাল ডিজ়অর্ডারের আওতায় এনেছে। ইন্টারনেট গেমিং ডিজ়অর্ডার মানসিক সমস্যাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর জেরে নিজের উপরেই নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন পূর্ণবয়স্ক মানুষরাও। সেখানে বয়ঃসন্ধির শিশুদের উপরে এই ধরনের খেলার প্রভাব কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা অনুমেয়।

কেন বাড়ছে অনলাইন গেমিং-এ আসক্তি?

মোবাইল ও ইন্টারনেট এখন সহজলভ্য। ফলে যে জিনিস হাতের কাছে রয়েছে, সেই জগতে ঢুকে পড়া কঠিন নয়। আর এই ধরনের গেমে এক ধাপ, এক ধাপ করে এগিয়ে গেলেই রিওয়ার্ড মিলতে থাকে। ফলে কিছু পাওয়ার চাহিদাও শিশুটিকে পরবর্তী ধাপের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। “এর পরে রয়েছে সেই মানুষটির মানসিক স্থিতি। একাকিত্বে ভুগছেন, কাজের জগৎ বা পরিবার নিয়ে হতাশ এমন অনেকেই অনলাইন গেমিংয়ের এই সাময়িক আনন্দ বা জয়লাভকে উপভোগ করতে শুরু করেন। আর এই গেমগুলো এমন করেই তৈরি হয় যেখানে একটা লুপ তৈরি হয়। ফলে খেলতে খেলতে কখন যে মানুষটি চক্রব্যূহে আটকে গিয়েছেন ধরতে পারেন না,” বলে জানালেন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট দেবারতি আচার্য।

আর একটা দিক উল্লেখ করলেন সমাজতত্ত্ববিদ অনিরুদ্ধ চৌধুরী। তাঁর কথায়, “এখনকার পরিবার আর সমাজ এর জন্য কম দায়ী নয়। একটা শিশু শুধু স্কুলে যাবে, বাড়ি আসবে আর পড়বে... এটা তার রুটিন হতে পারে না। দিনের মধ্যে কিছু সময় তার বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে খেলাধুলো থাকবে। কিন্তু এখন ক’টা বাচ্চা বিকেলে খেলতে বেরোয়? পাড়ায় সেই মাঠ বা পার্কও নেই। বন্ধুও নেই। ফলে এরা গেমিং সাইটগুলোয় মনের খোরাক খুঁজে নিচ্ছে। এই গেমে যে অ্যাড্রিনালিন রাশ হয়, সেটা এদের কাছে সন্তোষজনক। ফলে ক্রমশ এর মধ্যেই তারা জড়িয়ে পড়ে।” মোবাইলের গেমগুলোয় নেশাসক্তি মানসিক নানা সমস্যা তৈরি করে। কিন্তু অনলাইন গেমে বাচ্চাদের নিরাপত্তাও থাকছে না। সেখানেও বিপদ বাড়ছে।

অনলাইন গেমে নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে

অনেক সময়ে বাচ্চারা প্রিয় গেমের ফ্রি ভার্শন ডাউনলোড করে নেয়। সে ক্ষেত্রে ক্ষতিকর ভাইরাস ঢুকে যেতে পারে। অনলাইন গেমিংয়ে চ্যাটে অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলা যায়। সেখানে অপরাধমনস্ক ব্যক্তিরা অনেক সময়েই নানা ফাঁদ পাতে। ব্যক্তিগত তথ্য জেনে ব্ল্যাকমেল করতে পারে। বাচ্চারা ভয়ে মা-বাবাকে সেগুলো বলতে পারে না এবং ক্রমশ সেই জালে জড়িয়ে পড়ে। ডিজিটাল ফরেন্সিক ইনভেস্টিগেটর পার্থপ্রতিম মুখোপাধ্যায় বলছেন, “এ ক্ষেত্রে মা-বাবারা কিন্তু পেরেন্টাল কন্ট্রোল অ্যাপের সাহায্য নিতে পারেন। এর সাহায্যে বাচ্চার ফোনে যা-যা টাইপ হবে, সেটা মা-বাবারা দেখতে পাবেন। ওয়েবসাইট ও কনটেন্ট ফিল্টার করতে পারবেন, বাচ্চার লাইভ লোকেশন জানতে পারবেন। এই ধরনের অ্যাপে সাইবারবুলিং ও কিওয়ার্ড অ্যালার্ট থাকে, ফলে সন্দেহজনক কথাবার্তা হলে সঙ্কেত চলে আসবে। অনলাইন গেমিংয়ে কোনও ভাবে যদি দেখেন বাচ্চাকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বা সে নিজে এমন ভাবে জড়িয়ে গিয়েছে যে বেরোতে পারছে না, ভয় পাচ্ছে, দেরি না করে সাইবার ক্রাইম বিভাগে যোগাযোগ করুন।” কারণ যত দেরি করবেন, সেই অপরাধী তত সময় পাবে।

সাইবার লিটারেসি দরকার

আন্তর্জাল কী ভাবে ব্যবহার করবেন, সে বিষয়ে সম্যক জ্ঞান থাকা দরকার মা-বাবা ও শিশুর। এর জন্য কমিউনিটি অ্যাওয়ারনেস তৈরি হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনিরুদ্ধ চৌধুরী। স্কুলে যেমন এখন সেক্স এডুকেশন বাধ্যতামূলক, একই ভাবে সাইবার লিটারেসিও বাড়াতে হবে। এতে অনলাইন গেমিং বা ফোন গেমের বিপজ্জনক দিকগুলো সম্পর্কে সকলেই সাবধান হবেন। দেবারতির কথায়, “আগে মা-বাবাকে এ বিষয়ে সচেতন করা দরকার। কারণ ছোট থেকেই অনেকে ফোন দেখিয়ে সন্তানকে খাওয়ানো শুরু করেন। তার পর কার্টুন, এ ভাবে ধাপে ধাপে সে গেমিংয়ের জগতে ঢুকে পড়ে। শিশুবয়সে কিন্তু মস্তিষ্কের গঠন চলতে থাকে। মস্তিষ্কের সামনের অংশ ফ্রন্টাল লোব আমাদের চিন্তাভাবনা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করে দেয়। এটা তৈরি হয় জন্ম থেকে প্রায় ২০-২৫ বছর বয়স অবধি। কম বয়স থেকে স্ক্রিন এক্সপোজ়ার বেশি পেলে ফ্রন্টাল লোবের উপরে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।” ফলে মস্তিষ্কের গঠনে প্রভাব ফেলে। এ ছাড়াও অনেক সমস্যা দেখা যায়। মনোযোগ ও ধৈর্য কমে। তাৎক্ষণিক প্রাপ্তির উপরে ঝোঁক বাড়তে থাকে। কোনও জিনিস পাওয়ার ধৈর্য থাকে না। অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে ডোপামিন ক্ষরণ বাড়ে। এই হরমোনের প্রভাবে সন্তুষ্টি আসে। ফলে বাস্তব জগৎ থেকে নিজেকে গুটিয়ে ভার্চুয়াল জগতে বেশি আবদ্ধ হয়ে পড়ে। গেমে আসক্ত বাচ্চারা বহির্জগতে মিশতে শেখে না। ক্রমাগত স্ক্রিন দেখায় স্লিপ ক্লকও নষ্ট হয়। ঘুম কমতে থাকে। স্মৃতিশক্তি কমে। তাই গোড়া থেকেই স্ক্রিনটাইম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। কারণ একবার এই চক্রব্যূহে ঢুকে পড়লে, পরে (বিশেষত টিনএজে) সন্তানকে তা থেকে বার করে আনা কঠিন।

সমাধান কোন পথে?

বাড়ির সকলকেই স্ক্রিনটাইম কমাতে হবে। তার বদলে সাইক্লিং, ব্যাডমিন্টন, ফুটবল ইত্যাদি ফিজ়িক্যাল অ্যাক্টিভিটি বাড়াতে হবে। সেই কাজে সঙ্গ দিতে হবে অভিভাবককে। একটু বড় বাচ্চারা বাড়ির ছোটখাটো কাজ, গাছে জল দেওয়া, নিজের ব্যাগ, বইয়ের তাক গোছানো... এগুলো করতে পারে। এখন বেশির ভাগ পরিবারেই মা-বাবা কর্মরত। সে ক্ষেত্রে তার সঙ্গে বাড়িতে যাঁরা থাকছেন, তাঁরা যেন গল্প করেন বা ওদের সঙ্গে সময় কাটান, দোকানবাজারে গেলে নিয়ে যান, সেটা নিশ্চিত করুন। সমাজে যত মিশবে, তত সে বহির্মুখী হবে। নেশাসক্তি কাটানো সহজ হবে।

মনে রাখতে হবে, যে বাচ্চাটা ইতিমধ্যেই গেমের প্রতি আসক্ত, তাকে হঠাৎ একদিন সব বন্ধ করে দিতে বললে করবে না। এতে সে রেগে যাবে, উইথড্রয়াল সিম্পটম দেখা দেবে। মা-বাবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। সে যে ভাবে একটু একটু করে গেমের জগতে ঢুকে পড়েছে, সে ভাবেই ধাপে ধাপে বার করে আনতে হবে। আন্তর্জালের ব্যবহার প্রয়োজনভিত্তিক, সেটা বোঝাতে হবে।


আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন