Staying In AC

কৃত্রিম ঠান্ডার স্বস্তি বাড়াচ্ছে অস্বস্তি!

দিনের বেশির ভাগ সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকা কি স্বাস্থ্যকর? জেনে নিন বিশেষজ্ঞদের মতামত

ঊর্মি নাথ

শেষ আপডেট: ২৭ জুন ২০২৬ ০৬:১৯
Share:

গরমের তীব্রতার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য এয়ারকন্ডিশনার ছাড়া গতি নেই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার শুধু শহরে নয়, শহরতলি ও মফস্‌সল এলাকাতেও বাড়ছে। অফিস-বাড়ি-স্কুল-হাসপাতাল-শপিং মল সব মিলিয়ে সারাদিনে অনেকটা সময় কাটানো হয়ে যাচ্ছে কৃত্রিম ঠান্ডার আবহে। এতে গরমে ঘর্মাক্ত হতে হচ্ছে না, শরীর ঠান্ডা থাকছে। কাজে বেশি এনার্জি পাওয়া যাচ্ছে। এসির ঠান্ডা বাতাস স্বস্তি দেয়, কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যের জন্য তা প্রয়োজনও। কিন্তু একজন সুস্থ মানুষ দিনের অধিকাংশ সময় এসি রুমে কাটালে তাঁর গরম সহ্য করার ক্ষমতা হ্রাস পায়, শরীরে নানাবিধ সমস্যাও দেখা যায়।

এই প্রসঙ্গে মেডিকেল কলেজের জেরিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান ডা. অরুণাংশু তালুকদার বললেন, “এসিতে থাকা মানে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রার মধ্যে থাকা। ১২-১৪ ঘণ্টা বা তারও বেশি এসিতে থাকলে মানুষের শরীরের যে শারীরবৃত্তীয় পরিবর্তন হওয়া দরকার তা হয় না। দেখা যায়, অতিরিক্ত সময় এসিতে থাকলে শরীর অলস হয়ে যাচ্ছে। শরীর থেকে যে টক্সিনগুলো বেরিয়ে যাওয়ার কথা তা বেরোচ্ছে না। প্রকৃতির হাওয়া-বাতাস, সূর্যের আলোও শরীরে প্রবেশ করে না। ফলে ক্রনিক ভিটামিন ডি ডেফিসিয়েন্সি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষত এই সমস্যা দেখা যায় বয়স্ক মহিলাদের মধ্যে।”

রুক্ষ ত্বক ও শুষ্ক চোখ

এসি মেশিনের প্রকারভেদ আছে। সাধারণত অফিস, শপিং মল, হাসপাতাল বা বড় জায়গায় সেন্ট্রালাইজ়ড এসি থাকে। সেগুলো যে ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় তাতে বাতাসে আর্দ্রতা বজায় থাকে। কিন্তু ছোট পরিসরে উইন্ডো বা স্প্লিট এসি চালিয়ে ঘর ঠান্ডা করলে বাতাসে আর্দ্রতা বা জলীয় বাষ্প বেশ কমে যায়। এর একটা বড় কারণ ছোট পরিসরে নিজের ইচ্ছে মতো মেশিন নিয়ন্ত্রণ করা। এসির তাপমাত্রা যত নামবে, ঘর তত বেশি ঠান্ডা হবে এবং জলীয় বাষ্পর পরিমাণ বাতাসে কমবে। এতে শরীর জলশূন্য হয়, বারবার জল তেষ্টা পায়, ত্বকের নানা সমস্যাও দেখা দেয়।

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সন্দীপন ধরের কথায়, “দীর্ঘ দিন ধরে অনেকটা সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকলে ত্বকের স্বাভাবিক তারুণ্য চলে যায়। অল্প বয়সে বুড়িয়ে যায় হাত-পা-মুখ-চোখের তলার অংশের ত্বক। যাঁরা অপুষ্টিতে ভুগছেন, থাইরয়েডের সমস্যা আছে, রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি, তাঁদের এমনিতেই ত্বক শুষ্ক থাকে। এঁরা অতিরিক্ত সময় এসিতে থাকলে ত্বকের শুষ্কতা আরও বেড়ে যায়, চুলকানিও বেড়ে যায়। বিশেষ করে যাঁদের সোরিয়াসিস, অ্যাটোপিক ডার্মাটাইটিস বা কোনও এগজ়িমা আছে।” বাচ্চা-বয়স্ক সকলের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ, রাতে এসি ঘরে ঘুমোতে যাওয়ার আগে সারা শরীরে ভাল করে ময়শ্চারাইজ়ার লোশন লাগিয়ে নেওয়ার। স্নানের সময়েও ময়শ্চারাইজ়ার-যুক্ত সাবান ব্যবহার করার। শুধু ত্বক নয়, ক্ষতি হয় চুলের স্বাস্থ্যেরও। স্ক্যাল্প শুষ্ক হয়ে যায় এবং এর ফলে ড্রাই হেয়ার, খুশকি ও চুল পড়ার মতো সমস্যা হয়।

অনেকেই হয়তো খেয়াল করেন না দীর্ঘ দিন ধরে অতিরিক্ত সময় বাতানুকুল পরিবেশে থাকলে চোখেরও সমস্যা হয়। কম্পিউটারের মতো অতটা না হলেও দীর্ঘ সময় এসি রুমে থাকলে ড্রাই আইজ়ের সমস্যা হয়। চোখ কড়কড় করে, চোখ দিয়ে জল পড়তে পারে। চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. শুভ্রাংশু সেনগুপ্ত বললেন, “এসির জন্য বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ কম থাকে, যা শুষ্কতা বাড়ায়। বিশেষ করে যাঁরা আই টি সেক্টরে কাজ করেন বা দীর্ঘ সময় ঘরে বাতানুকুল পরিবেশে থেকে কম্পিউটারে কাজ করেন তাঁদের ড্রাই আইজ়ের সমস্যা ঠেকানোর একটা উপায় আছে। একে বলা হয় ‘২০-২০-২০’ রুল। ২০ মিনিট অন্তর ২০ সেকেন্ডের জন্য ২০ ফুট দূরত্বে তাকানো। এতে চোখের পলক পড়ার মাধ্যমে চোখের মধ্যে অশ্রু ঠিক মতো ছড়াতে পারে এবং সিক্ত রাখতে সাহায্য করে। আমরা যখন কোনও কিছুতে মনোনিবেশ করি, তখন চোখের পাতা কম পড়ে, যেটা ড্রাই আইজ়ের সমস্যাকে ত্বরান্বিত করে। কুড়ি মিনিট অন্তর সম্ভব না হলে, যখনই মনে পড়বে তখনই এটা করবেন।” ডা. সেনগুপ্ত পরামর্শ দিলেন ড্রাই আইজ় ঠেকাতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে লুব্রিকেটিং আই ড্রপ ব্যবহার করা যায়।

সর্দি-গর্মি এড়াতে

রোদ থেকে এসেই এসি চালানো যাবে না। বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর থেকে বেরিয়েই গনগনে রোদে যাবেন না। তাপমাত্রা অনেকটা হেরফেরের মাঝে শরীরকে সইয়ে নেওয়ার সময় দিতে হবে। এ ছাড়া শুষ্কতার সমস্যা থেকে বাঁচতে হলে এসি রুমের বাতাসে আর্দ্রতা থাকতে হবে অন্তত ৪০-৫০ শতাংশ। এর জন্য চিকিৎসকেরা পরামর্শ দেন ঘরের তাপমাত্রা কনকনে ঠান্ডা না করে ২৪-২৬ ডিগ্রিতে রাখার। প্রয়োজনে তাপমাত্রা ২৬-২৭ রেখে ফ্যান চালিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

“ধরা যাক, এসি রুমের তাপমাত্রা ২০-২২ ডিগ্রি, কিন্তু বাইরে তাপমাত্রা ৩০-৩৫ ডিগ্রি বা তারও বেশি। বাইরে থেকে সোজা ওই ঘরে ঢুকলে হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তন অ্যালার্জি তৈরি করে। গরম বাতাস শ্বাসের মাধ্যমে নাক দিয়ে শরীরে ঢুকছিল, হঠাৎ করে তা ঠান্ডা হয়ে গেল। আচমকা তাপমাত্রার পরিবর্তনে নাক বা গলার পিছনে কোষগুলিতে রিঅ্যাকশন হয়। সর্দি-কাশি শুরু হয়ে যায়, যাকে চলতি ভাষায় সর্দি-গর্মি বলে,” বললেন ডা. তালুকদার। বয়স্কদের এমনিতেই ঠান্ডা সহ্য করার ক্ষমতা কম। তাই বেশি ঠান্ডায় তাঁদের সমস্যা বাড়ে। বয়সের সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। পাঁচ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার হেরফের হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে সতর্ক হতে হবে। তাই বাইরের প্রবল গরম থেকে এসি রুমে না ঢুকে মাঝে ছায়ায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে নিন। রোদ থেকে বাড়িতে এসে ফ্যানের তলায় বসে কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে তার পর এসি রুমে প্রবেশ করা যেতে পারে।

সারা দিন এসি রুমে না থেকে কিছুটা সময় স্বাভাবিক বাতাসে, প্রকৃতির মধ্যে ঘোরাফেরা করা জরুরি। কেন অতিরিক্ত ঘাম হচ্ছে সেটাও জানা প্রয়োজন। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপ, হার্টের সমস্যার কারণে অতিরিক্ত ঘাম হয়। গরম লাগলেই এসি চালানোর প্রবণতাও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শরীর ও প্রকৃতি দুইয়ের জন্যই এসির ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।


আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন