বই পড়তে গিয়ে বারবার চোখ কুঁচকে ফেলছেন? মোবাইলের স্ক্রিনে লেখা পড়তে গেলে চোখে চাপ পড়ছে? অনেকেই ভাবেন, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এর নেপথ্যে থাকতে পারে হাইপারোপিয়া। আর এই সমস্যা থাকতে পারে ছোটদেরও।
চোখের এই সাধারণ সমস্যার কারণে দূরের বস্তু তুলনামূলক ভাবে স্পষ্ট দেখা গেলেও, কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা হয়। সময়মতো চিকিৎসা না করালে পড়াশোনা, কাজকর্ম এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এর প্রভাব পড়তে পারে।
কী এই হাইপারোপিয়া?
চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হাইপারোপিয়া হল চোখের একটি প্রতিসরণজনিত ত্রুটি বা রিফ্র্যাকটিভ এরর। সাধারণ অবস্থায় কোনও বস্তু থেকে আসা আলোকরশ্মি রেটিনার উপরে ফোকাস করে। কিন্তু হাইপারোপিয়ার ক্ষেত্রে সেই আলো রেটিনার পিছনে ফোকাস হওয়ার প্রবণতা দেখায়। ফলে কাছের বস্তু ঝাপসা দেখায়।
কেন হয়?
হাইপারোপিয়ার প্রধান কারণগুলির মধ্যে রয়েছে কর্নিয়ার বক্রতা কম হওয়া, বংশগত কারণ, বয়সজনিত পরিবর্তন ইত্যাদি। চক্ষু চিকিৎসক সুমিত চৌধুরী বললেন, “অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা জন্মগত ভাবে সামান্য হাইপারোপিয়া নিয়ে জন্মায়। ওই সময়ে তাদের চোখ একটু ছোট থাকে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখের স্বাভাবিক বৃদ্ধি হলে সমস্যা কমে যেতে পারে। তবে তিন বছর বয়সের পরেও চোখ ছোট থাকলে আলোর রশ্মি রেটিনার উপরে ঠিক মতো না পড়ার কারণে দৃষ্টি ঝাপসা হয়।” তখন চোখে জোর দিয়ে দেখার চেষ্টা করে অনেক শিশু। ছোট বয়সেই এই সমস্যার ঠিকমতো চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে।
কী কী উপসর্গ দেখা দেয়?
হাইপারোপিয়ার লক্ষণ ব্যক্তিভেদে আলাদা হতে পারে। তবে সাধারণ কিছু উপসর্গ হল— কাছের জিনিস ঝাপসা দেখা, চোখে চাপ বা অস্বস্তি, দীর্ঘক্ষণ পড়াশোনা বা স্ক্রিন ব্যবহারের পর মাথাব্যথা, চোখে ক্লান্তি, বারবার চোখ কুঁচকে দেখা, শিশুদের ক্ষেত্রে পড়াশোনায় মনোযোগের সমস্যা।
চিকিৎসক সুমিত চৌধুরী জানাচ্ছেন শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি নিয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বললেন, “অনেক সময় শিশুরা বুঝিয়ে বলতে পারে না যে সে ঠিক মতো দেখতে পাচ্ছে না। ফলে অভিভাবকের সতর্ক থাকা জরুরি। বাচ্চাদের দুই-আড়াই বছর বয়সে প্রি-স্কুলে ভর্তির সময়েই চোখের পাওয়ার ও কালার ভিশন ঠিক আছে কি না, পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত। কোনও সমস্যা থাকলে তখনই ধরা পড়ে যাবে। চোখ কুঁচকে বা ট্যারা ভাবে দেখার চেষ্টা, মাথা ধরা বা ঘোরার সমস্যা থাকলে অবহেলা করা উচিত নয়। প্রথমে শিশুরোগ চিকিৎসক দেখিয়ে নিতে হবে। অন্য কোনও কারণ না থাকলে তার পরে চক্ষু চিকিৎসককে দেখানো উচিত।” অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি চোখে পাওয়ার আছে, অন্যটায় নেই। বিষয়টি নির্ণয় হতে সময় লাগে কারণ, একটি চোখ বন্ধ করে অন্যটির দৃষ্টি কেমন, সেটা সাধারণ ভাবে কেউ খেয়াল করেন না। মাঝেমাঝে নিজেই এক চোখ চাপা দিয়ে অন্য চোখের দৃষ্টি পরীক্ষা করতে পারেন। চিকিৎসা না হলে হাইপারোপিয়া শিশুদের চোখের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে চোখ ট্যারা হয়ে যাওয়া (স্কুইন্ট) বা অলস চোখের (অ্যাম্বলিয়োপিয়া) মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই শিশুদের নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
কী ভাবে নির্ণয় করা হয়?
সম্পূর্ণ চোখ পরীক্ষা করলেই হাইপারোপিয়া ধরা পড়ে। দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা, রিফ্র্যাকশন টেস্ট এবং প্রয়োজন হলে অন্যান্য পরীক্ষা করে সমস্যার মাত্রা নির্ধারণ করেন চক্ষু বিশেষজ্ঞরা।
চিকিৎসা কী?
হাইপারোপিয়ার চিকিৎসা সাধারণত সহজ এবং কার্যকর। চশমাই হল সবচেয়ে প্রচলিত ও নিরাপদ উপায়। এ ক্ষেত্রে ‘প্লাস পাওয়ার’ বা উত্তল লেন্স ব্যবহার করা হয়। যাঁরা চশমা পরতে চান না, তাঁদের জন্য কনট্যাক্ট লেন্স হতে পারে একটি বিকল্প। এ ছাড়া, পাওয়ার খুব বেশি থাকলে লেন্সের উপযোগিতা বাড়ে।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, হাইপারোপিয়া কোনও বিরল সমস্যা নয়। সময়মতো শনাক্ত করা গেলে এবং উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করলে পরিষ্কার দৃষ্টিশক্তি বজায় রাখা সম্ভব।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে