Stomach Problem Rises

চারদিকে কান পাতলেই খালি পেটের রোগের খবর, ভুগছে ছোট থেকে বড়রা, কী থেকে হচ্ছে এমন অসুখ?

ভাইরাল জ্বর ঘরে ঘরে। সেই সঙ্গেই যেন দাবানলের মতো শুরু হয়েছে পেটের রোগ। ছোটরা তো বটেই, ভুগছেন বড়রাও। আজ বমি, তো কাল পেটখারাপ। ঘন ঘন ডায়েরিয়া হচ্ছে। এই অসুখের কারণ কী? কেবলমাত্র খাওয়াদাওয়ার কারণেই কি হচ্ছে?

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:০৬
Share:

পেটের রোগ ছড়াচ্ছে, কারণটা শুধু খাওয়াদাওয়া নয়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

মরসুম বদলের সময়ে এক-আধটা জ্বর, পেটখারাপের খবর আসেই। শীতের শেষ ও বসন্তের সূচনা হচ্ছে মানে, ভাইরাল জ্বরের খবর পাবেনই। প্রতি বছরই তা হয়। এতে তেমন অস্বাভাবিক কিছু নেই। তবে যে কারণে চিন্তা বাড়ছে, তা হল পেটের রোগ। বাঙালি মাত্রেই পেটের অসুখে ভুগবে, এমন ধারণা আছেই। তবে এ রোগ তেমনটা নয়। চারপাশে যাঁকেই জিজ্ঞাসা করবেন, তিনিই বলবেন যে পেটের সমস্যা চলছে। অথবা পরিবারে কারও হয়েছে। শিশুরা এত বেশি ডায়েরিয়ায় ভুগছে যে, চিন্তা ক্রমেই বাড়ছে বাবা-মায়ের। এই সময়টা আবার বিয়েবাড়ির মরসুমও। অনেকেই ভাবছেন, খাওয়াদাওয়ায় অনিয়মের কারণে হয়তো পেটের অসুখ হচ্ছে। কিন্তু ঠিক তা নয়। খাওয়া যেমন একটি বিষয়, তেমনই পেটের রোগ যে এমন দাবানলের আকার নিয়েছে, তার নেপথ্যে আরও কিছু কারণ রয়েছে।

Advertisement

শুধুই কি খাওয়ায় অনিয়ম, পেটের রোগ এমন ভাবে ছড়ানোর কারণ কী?

দেশের নানা রাজ্যে সমীক্ষা চালিয়েছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)। জানানো হয়েছে, শীত ও গরমের এই সন্ধিস্থলে একগুচ্ছ ভাইরাস সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারাই আসল খলনায়ক। এদের মধ্যে রয়েছে নোরোভাইরাস, রোটাভাইরাস, যাদের কারণে ‘ভাইরাল গ্যাস্ট্রোএন্টেরাইটিস’ নামক রোগ হয়। চিকিৎসকেরা যাকে বলেন ‘স্টমাক ফ্লু’। এটি হলে পেটের রোগ সহজে সারবে না। পেটখারাপ লেগেই থাকবে, বমিও হতে পারে। পেটের ব্যথাও হবে। আরও একটি ভাইরাস আছে, যার নাম অ্যাস্ট্রোভাইরাস, যেটি ছোটদের ও বয়স্কদের পেটের রোগের জন্য দায়ী। শিশুদের ভাইরাল জ্বর ও পেটখারাপের নেপথ্যে রয়েছে অ্যাডিনোভাইরাস। এখন তো আবার এই ভাইরাস রূপ বদলে আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে বলে সতর্কও করেছিলেন গবেষকেরা।

Advertisement

অস্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া ও দূষিত জল তো রয়েছেই, তার বাইরেও ভাইরাস ঘটিত কারণে পেটের রোগ এত বেড়েছে। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সংক্রামক রোগ বিষয়ক চিকিৎসক অরুণাংশু তালুকদারের কথায়, ‘‘ঋতুবদলের সময়ে জীবাণুদের বংশবৃদ্ধি হয়। সে কারণেই জ্বর, পেটের রোগ বাড়ে। নোরোভাইরাস, রোটাভাইরাসের সংক্রমণে আচমকা পেটখারাপ, সঙ্গে জ্বর, বমি, পেটে যন্ত্রণা হতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর ফলে শরীরে জলের অভাব ঘটে। কোনও শিশু আগে থেকেই অপুষ্টিতে ভুগলে বা সময় মতো হাসপাতালে না পৌঁছলে বড় বিপদ ঘটতে পারে। ছোটরা শুধু নয়, বড়রাও এখন সংক্রমণের শিকার। ডায়াবিটিস, কিডনির রোগ রয়েছে অথবা ক্যানসারের চিকিৎসা চলছে, এমন রোগীরা পেটের সমস্যায় বেশি ভুগছেন।’’

ভাইরাসের কারণে খাদ্যনালিতে সংক্রমণও ঘটছে। অনেক সময়ে দেখা যায়, ভাইরাসের সংক্রমণে পেটে বিষক্রিয়া হয়েছে। এই ভাইরাস খুব দ্রুত ছড়িয়েও পড়তে পারে।

পেটের অসুখে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে অ্যান্টিবায়োটিক

অসুখ হল কি হল না, পেটেখারাপের অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খেয়ে ফেলার প্রবণতা কমবেশি সকলেরই আছে। এটি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। চিকিৎসক জানাচ্ছেন, বেশির ভাগ পেটের সমস্যার কারণ ভাইরাস। তাই এমন রোগে অ্যান্টিবায়োটিক চলে না। ভুলটা সেখানেই হচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে পেট সাময়িক ভাবে সারছে ঠিকই,, তবে অন্য সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। কিছু দিন পরে আবারও ডায়েরিয়া, জ্বর হচ্ছে। আর এই ডায়েরিয়া ওষুধেও সারছে না। পরবর্তী সময়ে গিয়ে আবার কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যাও দেখা দিচ্ছে।

‘স্টমাক ফ্লু’ সাধারণত তিন থেকে চার দিনে ঠিক হয়ে যায়। তাই শুরুতেই ওষুধ না খেয়ে উপসর্গের দিকে খেয়াল রাখতে বলছেন চিকিৎসক। ঘরের তৈরি খাবার, পর্যাপ্ত জল খেলে পেট ঠিক হয়ে যেতে পারে তিন থেকে চার দিনেই। তবে যদি তা না হয়, তখন অ্যান্টিবায়োটিক না খেয়ে চিকিৎসককে দেখিয়ে নির্ধারিত ওষুধ খাওয়াই উচিত।

সাবধানের মার নেই

নভেম্বর থেকে এপ্রিল অবধি নোরোভাইরাসের ভাইরাসের প্রকোপ বেশি থাকে। এমনটাই জানালেন চিকিৎসক রণবীর ভৌমিক। তাঁর পরামর্শ, এই সময়ে তাই বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকতে হবে। কিনে আনা সব্জি, ফল বা কাঁচা মাছ-মাংস ভাল করে ধুয়ে তবে রান্না করতে হবে। শাকপাতা নুন দেওয়া গরম জলে ধুয়ে রান্না করা উচিত। রাস্তায় বিক্রি হওয়া নরম পানীয়, লেবুর শরবত, রঙিন শরবত, লস্যি থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তাই ছোটদের এই ধরনের পানীয় কিনে দেবেন না। এখন আবার অনেকেই রাস্তা থেকে কিনে আখের রস খাচ্ছেন। স্বাস্থ্যবিধি না মানা হলে ভাইরাস ছড়াতে বাধ্য।

চিকিৎসকের কথায়, ‘‘রাস্তা থেকে জলের বোতল কিনে জল খাওয়ার ভুল করবেন না। বিশেষ করে রাস্তার ধারের দোকানে, ট্রেনে যে সব জল বিক্রি হয়, সেগুলি আদৌ পরিশোধিত জল কি না জানা নেই। তাই সতর্ক থাকতে হবে। রাস্তার ধারের দোকানগুলিতে যে খাবার বিক্রি হচ্ছে সেটি রান্নার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না অনেক সময়েই। যে জল দিয়ে রান্নাটি করা হয়, তারও গুণমান কেমন তা জানা নেই। তাই এই সময়ে বিশেষ ভাবে সতর্ক থাকতে হবে।’’

খাদ্যনালিতে অনেক ভাল ব্যাক্টেরিয়াও থাকে, যারা খাবার পরিপাকে সাহায্য করে। কিন্তু বাইরে থেকে কোনও সংক্রামক ভাইরাস সেখানে ঢুকে পড়লে তীব্র প্রদাহ শুরু হয়। খাবার ঠিকমতো হজম হয় না, পেটে যন্ত্রণা শুরু হয়। পেটখারাপ, বমি এবং তা থেকেই জ্বর চলে আসে। শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকলে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ঘটবে। তাই শিশু ও বয়স্কদের সাবধানে রাখতে হবে। যাঁদের হার্টের রোগ, লিভার বা কিডনির রোগ, ডায়াবিটিস রয়েছে, তাঁদের আরও বেশি সতর্ক থাকা উচিত।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement