কড়াইয়ে গরম তেল। তাতে পড়ল এক চিমটে মশলা। সুঘ্রাণে ভরে উঠল হেঁশেল। এই হল ভারতীয় রান্নার সূচনাপর্ব। আবার রান্নার শেষে ঝোলে পড়ল আরও এক চামচ। ব্যস। তবেই বৃত্ত সম্পূর্ণ হল! তাই মশলা ছাড়া এ দেশের রান্নাঘর অকেজোই বটে। তবে বদহজম হোক বা পেটে ব্যথা, ঠান্ডা লাগা হোক বা গ্যাস— সেই মশলাই রক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। ফলে মশলার যে কত অবদান, তার হিসাব নিতে হলে বেগ পেতে হবে। ভারতীয় মশলা নিয়ে আলোচনা চলছে বাইরের দেশেও। বাড়ছে ঔৎসুক্য়ও।
শুধু স্বাদ ও গন্ধই নয়, বহু দিন ধরেই এগুলিকে ব্যবহার করা হয় স্বাস্থ্যরক্ষায়। মশলার উপকারের কথা প্রায়ই শোনা যায় এ দিক-ও দিক থেকে। তার প্রমাণও মিলেছে খাতায়কলমে ও শরীরের উপর পরখ করেও. তবে গুণাগুণ নিয়ে চর্চা করতে হলে ‘অগুণে’রও যে হিসেবনিকেশ করতে হয়। পরিমাণ অতিরিক্ত হয়ে গেলেই স্বাস্থ্যরক্ষার পথে বাধা পড়তে পারে। তাই কোন মশলার কী সমস্যা, তা-ও জেনে নিন। রইল ৯টি মশলার উপকারিতা ও অপকারিতা। কী বলছেন পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক?
সমস্ত মশলাই নির্দিষ্ট পরিমাণে খাওয়া উচিত। না হলে সমস্যা বাড়তে পারে। পুষ্টিবিদের কথায়, ‘‘যেমন আদা বা হলুদ স্বাস্থ্যকর মশলা হলেও, সাপ্লিমেন্ট হিসেবে অতিরিক্ত মাত্রায় খেলে হলুদ লিভারের ক্ষতি করতে পারে এবং আদা রক্তপাতের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে যাঁদের আগে থেকেই লিভারের সমস্যা বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ চলছে। মশলাপাতি খাওয়ার কথা উঠলে আমরা রোগীদের আগেই জিজ্ঞ়াসা করে নিই, তাঁরা কী কী ওষুধ খাচ্ছেন। কারণ এই দুইয়ের মেলবন্ধন অনেক সময়েই সুখকর হয় না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী মশলার সাপ্লিমেন্ট বা নির্দিষ্ট পরিমাণের কথা জেনে নেওয়া উচিত।’’
আদা: যত বেশি, ততই ভাল— এই ধারণা থেকেই বিভ্রান্তির শুরু। রান্নায় যেমন আদা বেশি পড়ে গেলে, তার গন্ধে অন্যান্য মশলার গন্ধ চাপা পড়ে যায়, অথবা ঝাঁজালো স্বাদ জিভে অস্বস্তি এনে দেয়, তেমনই শরীরেও তার প্রভাব পড়ে। খুব বেশি পরিমাণে আদা খেয়ে নিলে বুকজ্বালা, পেটখারাপ, মুখগহ্বরে অস্বস্তি হতে পারে। যাঁদের সদ্য অস্ত্রোপচার হয়েছে, তাঁদের জন্যও অতিরিক্ত আদা ক্ষতিকর হতে পারে। যাঁরা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খাচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে আদা। দিনে ৬ গ্রামের বেশি আদা খেলে গুণ ছা়পিয়ে দোষ বেশি দেখা দেবে।
যদিও হজমপ্রক্রিয়ার উন্নতির জন্য আদার তুলনা হয় না। তাই অম্বল হলে অনেকেই আদা মেশানো জল পান করেন অথবা কাঁচা আদা চিবিয়ে খান। আদার মধ্যে রয়েছে জিঞ্জেরল নামক এক শক্তিশালী বায়ো-অ্যাক্টিভ উপাদান। এটি অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট এবং প্রদাহনাশী গুণে ভরপুর। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে আদা খেলে পেশির ব্যথা, অস্থিসন্ধির সমস্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত অস্বস্তি কমাতে সাহায্য করে। এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়াতে পারে।
হলুদ: অতিরিক্ত হলুদ বা ঘনমাত্রার কারকিউমিন যুক্ত পানীয় সব সময় নিরাপদ নয়। বেশি পরিমাণে খেলে গ্যাস, অম্বল, ডায়েরিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য বা হজমের গোলমাল দেখা দিতে পারে। হলুদেরও রক্ত পাতলা করার প্রবণতা রয়েছে। কখনও সখনও রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত কমেও যেতে পারে। বিরল ক্ষেত্রে কিডনির উপরও খারাপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই দিনে ৩ গ্রামের বেশি হলুদ খাওয়া উচিত নয়।
তবে কারকিউমিনের গুণে স্বাস্থ্যরক্ষা থেকে ত্বকচর্চার জন্য বড়ই প্রশংসিত এই মশলা। এতে অ্যান্টি-সেপ্টিক, অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল, অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট এবং প্রদাহনাশী বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রোগ, অসুখবিসুখ সারাতে এটি একাই একশো। আর্থ্রাইটিস, অ্যাজ়মা, হৃদ্যন্ত্রের রোগ, লিভারের রোগ, অ্যালঝাইমার্স, ডায়াবিটিস, এমনকি ক্যানসার প্রতিরোধেও কারকিউমিনের উপকারী গুণ কাজে আসে। পাশাপাশি, শরীরে ইনসুলিনের কর্মক্ষমতাও বৃদ্ধি করতে পারে হলুদ।
লবঙ্গ: রক্তে সুগারের মাত্রা ঠিক রাখার জন্য লবঙ্গ খুব উপকারী। কিন্তু কোনও কিছুই অতিরিক্ত ভাল নয়। মাত্রাতিরিক্ত লবঙ্গ খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা অস্বাভাবিক ভাবে কমে যেতে পারে। ডায়াবিটিসে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে তাই সতর্ক থাকা প্রয়োজন এই মশলাটি নিয়ে। নয়তো রক্তে হঠাৎ সুগারের মাত্রা কমে গেলে বা হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়ে গেলে প্রাণহানির ঝুঁকিও থাকতে পারে। তাই দিনে ২-৪টি টুকরোর বেশি লবঙ্গ না খাওয়াই শ্রেয়।
কিন্তু লবঙ্গে রয়েছে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টের গুণ। তা ছাড়াও ম্যাঙ্গানিজ় এবং ভিটামিন কে-র উৎস হিসেবে সুনাম রয়েছে এই মশলার। মস্তিষ্কের বিভিন্ন কাজকর্ম সুষ্ঠু রাখতে ও হাড় শক্ত করতে ম্যাঙ্গানিজ় খুব জরুরি। আবার রক্ত জমাট বাঁধা, হাড় মজবুত করা এবং হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্যরক্ষা করার জন্য ভিটামিন কে খুব গুরুত্বপূর্ণ। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য লবঙ্গ খেতে বলা হয়। এই মশলা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে বলে ঠান্ডা লাগলে, সর্দি-কাশি হলে লবঙ্গ মুখে রেখে দিতে বলা হয়।
দারচিনি: অতিরিক্ত দারচিনি খেলে মুখ ও ঠোঁটে জ্বালাভাব, ঘা বা অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। কয়েক ধরনের দারচিনিতে এমন উপাদান থাকে, যা দীর্ঘ দিন অতিরিক্ত পরিমাণে খেলে কিডনির উপরেও চাপ ফেলতে পারে। তাই দিনে ২-৪ গ্রামের বেশি দারচিনি খাওয়া উচিত নয়।
আবার অন্য দিকে, দারচিনি রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে বলে দাবি করা হয়েছে বহু গবেষণায়। তার পাশাপাশি, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা, মানসিক চাপ কমানোর জন্য সুখ্যাতি রয়েছে দারচিনির। হেঁশেলে যত প্রকার মশলা রয়েছে, তার মধ্যে দারচিনিতে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্টের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। দেহের কোনও টিস্যুর ক্ষতি হলে বা শরীরে কোথাও আঘাত পেলে ব্যথা কমাতে পারে দারচিনি।
জায়ফল: এই মশলাটি অতিরিক্ত খেলে নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। বেশি পরিমাণে জয়ফল খেলে মাথা ঘোরা, উদ্বেগ, বিভ্রান্তি, অসংলগ্ন কথা বলা, এমনকি খিঁচুনির মতো মারাত্মক সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই রোজ পরিমাপের দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। রোজ রান্নায় মেশালে অবশ্যই ক্ষতির চিন্তা নেই, কিন্তু দিনে ১-২ মিলিগ্রামের বেশি না খাওয়াই ভাল।
কিন্তু অনিদ্রা থেকে ওজন বশে রাখতে সামান্য জায়ফলই কামাল করতে পারে। ফাইবার, ম্যাগনেশিয়াম, ভিটামিন বি ৬, কপার রয়েছে এতে। ব্যথাবেদনা দূর করতে এবং মানসিক চাপ কমানোর জন্যও জায়ফল খুব কার্যকর। জায়ফল খেলে রোগ প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধি তো পাবেই, এর পাশাপাশি ভাল ঘুমও হবে। বদহজম কমানো এবং অস্থিসন্ধির যন্ত্রণা দূর করার জন্যও জায়ফল বেশ উপকারী।
তেজপাতা: অধিকাংশ রান্নার ফোড়নে তেজপাতা ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি, ঔষধি গুণও রয়েছে এর। কিন্তু তেজপাতা সাধারণত রান্নায় অল্প পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে তেজপাতার নির্যাস অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। আবার রক্তে শর্করার উপরেও এর প্রভাব থাকতে পারে। তাই যাঁরা ডায়াবিটিসের ওষুধ খান, তাঁদের ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন। অতিরিক্ত তেজপাতা খেলে বদহজমের সমস্যাও হতে পারে। তাই দিনে ১-২টি তেজপাতাই যথেষ্ট।
তবে মনে রাখতে হবে, তেজপাতা অন্ত্রের বন্ধুর মতো কাজ করে। এতে থাকা এনজ়াইম প্রোটিন ভাঙতে সাহায্য করে। ফলে হজমে সুবিধা হয়। পেটফাঁপা কমাতেও তেজপাতা কার্যকর। এটি শরীর থেকে টক্সিন বার করে দিতে সাহায্য করে, যা পরোক্ষে লিভার এবং অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভাল রাখে।
গোলমরিচ: গোলমরিচ হজমে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত খেলে অম্বল, বমি ভাব, বদহজম এবং পেটে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। কারও ত্বকেও জ্বালা ভাব বা অ্যালার্জি হতে পারে। এ ছাড়া গোলমরিচের একটি উপাদান শরীরে কিছু ওষুধের কার্যকারিতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। তাই কী কী ওষুধ খাচ্ছেন, তা চিকিৎসককে জানিয়ে তবেই এই মশলা খাওয়া দরকার।
যদিও এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট সহ রয়েছে ভিটামিন সি, ভিটামিন এ ও ক্যারোটিনয়েডস ইত্যাদি। এগুলি শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যালের বিরুদ্ধে কাজ করে। যা ক্যানসার-সহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে। গোলমরিচের বাইরের স্তরে অনেক রকম ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস থাকে, যা ফ্যাট ভাঙতে এবং শরীরের বিপাকক্রিয়া সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। গোলমরিচ একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল উপাদান। ফলে সর্দি, কাশি এবং শ্লেষ্মা দূর করতে সাহায্য করে।
রসুন: ‘লোয়ার ইসোফেগাল স্ফিংটার’ নামক একটি মাংসপেশিকে শিথিল করে তোলে রসুনের উপাদান। যার ফলে পাকস্থলী নিঃসৃত অ্যাসিড খাদ্যনালিতে ঢুকতে পারে না। সেটি যেতে না পেরে উপরের দিকে উঠে আসে। ফলে অ্যাসিড রিফ্লাক্স, অম্বলের ঝুঁকি তৈরি হয় রসুন থেকে। রক্ত পাতলা করার ওষুধ যাঁরা খান, তাঁদের রসুনের পরিমাণ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। নিম্ন রক্তচাপ থাকলেও অতিরিক্ত রসুন খাওয়ার প্রবণতা ক্ষতিকর হতে পারে।
কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, রসুনের যৌগ ‘অ্যালিসিন’ই রক্তে ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইডের সমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে আচমকা স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকিও কমে। অ্যালিসিন অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল উপাদান এবং শক্তিশালী অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট।
মৌরি: পরিমিত পরিমাণে মৌরি খাওয়া সাধারণত নিরাপদ। কিন্তু অতিরিক্ত খেলে বা ঘনীভূত মৌরির তেল ব্যবহার করলে কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে, যেমন, পেটখারাপ, বমি বমি ভাব, বমি, অম্বল ইত্যাদি। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বাদের বেশি মৌরি খেতে নিষেধ করা হয় জরায়ুর স্বাস্থ্যরক্ষার কথা ভেবে।
তবে মৌরিতে রয়েছে অ্যান্টি-ব্যাক্টেরিয়াল উপাদান, যা পেটের সমস্যা কমাতে সাহায্য করে, পেটকে ঠান্ডা রাখে। মৌরিতে ভরপুর মাত্রায় ফাইবার থাকে বলে অম্বলের সমস্যা ও কোষ্ঠকাঠিন্যের ধাত থাকলেও মৌরি মেশানো জল খেলে উপকার পাবেন।