ঝরঝরে চেহারা, নির্মেদ কোমর আর আকর্ষক বাইসেপ— স্বপ্নপূরণের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিমে কাটাচ্ছেন, শারীরচর্চা করছেন? ভোরবেলা পার্কে দৌড়, সন্ধেবেলা জিমে ঘাম ঝরানো, সমাজমাধ্যম খুললেই এখন ফিটনেস ট্রান্সফরমেশনের হরেক রিলস, আইডিয়া। শারীরচর্চা, জিম রোজকার জীবনের অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু শুধুই কি শারীরচর্চা আকর্ষক শরীর গড়ে দিতে পারে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীর কিন্তু জিমে নয়, আদতে তৈরি হয় রান্নাঘরে।
পুষ্টিবিদ থেকে ফিটনেস ট্রেনার প্রায় সকলেই একমত, শারীরচর্চার ফল কতটা দৃশ্যমান হবে, তার বড় অংশ নির্ভর করে কী খাচ্ছেন, কতটা খাচ্ছেন, কখন খাচ্ছেন তার উপরে। জিম শরীরকে পরিশ্রম করায়। কিন্তু সেই শরীরকে গড়ে তোলার কাঁচামাল দেয় খাবার। ব্যায়াম, ওজন তোলা, ট্রেডমিলে দৌড়নো... এ সব কিছুর শেষে শরীরকেও নিজেকে পরের দিনের জন্য তৈরি করতে হয়। শরীরের এই পুনর্গঠনের কাজই করে খাবার।
শারীরচর্চা নাকি খাদ্যাভ্যাস
“শরীরকে সুস্থ, নমনীয়, কর্মক্ষম রাখতে ৭০ শতাংশ ভূমিকা খাদ্যাভ্যাসের। শারীরচর্চার উপরে নির্ভর করে মাত্র ৩০ শতাংশ,” বলছেন ফিটনেস প্রশিক্ষক গুরুপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়। শারীরচর্চার সময়ে পেশিতে সূক্ষ্ম ক্ষয় বা মাইক্রো টিয়ার হয়। এই ক্ষয় পূরণ করেই পেশি আরও শক্তিশালী হয়। পেশির সেই পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজন ঠিক পুষ্টি। সমস্যা হয় সেখানেই। ব্যক্তি ধরেই নেন তিনি পেট ভরে খাচ্ছেন মানেই পর্যাপ্ত পুষ্টি পাচ্ছেন। কিন্তু আদতে তা হয় না। খাবার থেকে কতটা পুষ্টিগুণ শরীর আহরণ করতে পারবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে তা কী ভাবে রান্না করা হচ্ছে তার উপরে। উপকরণ একই থাকলেও, সিদ্ধ, গ্রিলড খাবার থেকে যে পরিমাণ পুষ্টি শরীর পাবে, বেকড কিংবা ফ্রায়েড খাবার থেকে তা পাবে না, বরং তাতে ক্ষতি বেশি হবে। গুরুপ্রসাদ বলছেন, “অনেক সময়ে দেখা যায়, কেউ হয়তো নিয়মিত জিমে এসে ঘাম ঝরাচ্ছেন, কিন্তু তার দুর্বলতা, ক্লান্তি, মাসল লস থেকে যাচ্ছে। বাড়তি ওজন থাকলে, তা-ও কমছে না। তখন কিন্তু বুঝতে হবে সমস্যা তার খাদ্যাভ্যাসে।”
খাদ্যাভ্যাসের হিসেব নিকেশ
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানেই কিন্তু কম খাওয়া নয়। প্রয়োজন, ঠিক অনুপাতে খাওয়া। মানবদেহের প্রতিটি কোষ, টিসু খাবার থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদান দিয়েই তৈরি হয়। ব্যালান্সড ডায়েটের অর্ধেকাংশে থাকে ফাইবার, ভিটামিনস, মিনারেলসের জোগান, বাকি অর্ধেকাংশে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট। পুষ্টিবিদ অনন্যা ভৌমিক বলছেন, “প্রোটিন শরীরকে অ্যামিনো অ্যাসিড দেয়, যা পেশি গঠন ও মেরামতের জন্য অপরিহার্য। কার্বোহাইড্রেট গ্লাইকোজেনের চাহিদা পূরণ করে, শারীরিক পরিশ্রমের শক্তি জোগায়। স্বাস্থ্যকর ফ্যাট হরমোন তৈরি, কোষের গঠন এবং স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শরীর যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি না পায়, তবে ব্যায়ামের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও কমে যায়।” অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, প্যাকেজড, প্রসেসড খাবারের আধিক্য, ইত্যাদির কারণে এখন অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছে অধিকাংশজন। তারা ধরেই নেন জিমে গিয়ে কসরত করলেই ওজন কমবে। কিন্তু কার্ডিয়ো, ওয়েট ট্রেনিং করার পরেই যদি কেউ নরম পানীয়, ভাজাভুজি ইত্যাদি খায়, তবে লাভ কিছু হবে না। অনন্যা বলছেন, “ফ্যাট লসের সহজ হিসেব হল, যতটা ক্যালরি খরচ হচ্ছে, তার চেয়ে কম ক্যালরি গ্রহণ করতে হবে। সঙ্গে সময়ের হিসেবও প্রয়োজন। একই জিমে শারীরচর্চা করেও দু’জন ব্যক্তি একই রকম ফল পান না। মাসল কতটা তৈরি হবে, বডি কতটা টোনড দেখাবে, ব্লটিং হবে কি না, তা কখন খাচ্ছেন, দুটো মিলের মাঝে কতটা বিরতি থাকছে, সে সবের উপরেও নির্ভরশীল।”
তবে খেয়াল রাখতে হবে, একদিনের স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া যেমন কাউকে ‘ফিট’ বানায় না, তেমন এক দিন অস্বাস্থ্যকর খাওয়দাওয়া করলেই যে শরীর খারাপ হবে, এমনও নয়। দরকার শুধু হিসেবনিকেশ করে খাওয়াদাওয়া ও শারীরচর্চা করা। একবার সেই অঙ্ক বুঝে গেলেই কাজটা সহজ হবে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে