কেটে গেলে রক্ত পড়া বন্ধ হবে না, হিমোফিলিয়া বড় ভয়াবহ অসুখ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা ছড়ে গেলে, কিছু ক্ষণ পরে কাটা জায়গার রক্ত জমাট বেঁধে যায়। ক্ষত গভীর হলে একটানা রক্তপাত হয় বটে, তবে তা-ও কিছু সময় পরে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এমনও হয় যে, রক্ত পড়া বন্ধই হচ্ছে না। ওষুধ দিয়ে বা ব্যান্ডেজ বেঁধেও যদি রক্তক্ষরণ বন্ধ না হয়, তা হলে সতর্ক হতে হবে। এমন রোগকে চিকিৎসার পরিভাষায় বলে হিমোফিলিয়া যা খুবই জচিল এক অসুখ। সময় থাকতে সতর্ক না হলে তা প্রাণসংশয়ের কারণও হয়ে উঠতে পারে।
হিমোফিলিয়া কতটা ভয়াবহ?
শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার জন্য কিছু প্রোটিন থাকে। সেগুলিকে বলা হয় ‘ক্লটিং ফ্যাক্টর’। যদি সেই সব প্রোটিনের ঘাটতি হয়, তখন রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। হিমোফিলিয়া হলে শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ফ্যাক্টর-৮ ও ফ্যাক্টর-৯ প্রোটিন তৈরি হতে পারে না। ফলে রক্ত জমাট বাঁধতে পারে না। তাই সামান্য আঘাতেও রক্ত পড়া বন্ধ হয় না। কেবল শরীরের বাইরে নয়, শরীরের ভিতরেও নানা অঙ্গে এই রক্তক্ষরণ চলতে থাকে, যা ‘মাল্টিঅর্গ্যান ফেলিয়োর’-এর দিকে নিয়ে যায় রোগীকে। একে বলে ‘রেড ব্লাড ডিজ়অর্ডার’। সাধারণত দেখা যায়, এই প্রোটিনগুলি যে জিনে থাকে সেই জিনে মিউটেশন বা রাসায়নিক বদল হলে এমন অসুখ হয়।
কোন কোন লক্ষণে বোঝা যাবে হিমোফিলিয়া আছে?
হিমোফিলিয়া আছে কি না, তা গোড়ায় বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে রোগের লক্ষণ প্রকট হতে থাকে। যেমন, খেয়াল করতে হবে সামান্য কেটে গেলে বা ছড়ে গেলে কত ক্ষণ ধরে রক্তপাত হচ্ছে। যদি দেখা যায় বরফ চেপে বা ওষুধ দিয়ে, ব্যান্ডেট লাগিয়েও রক্ত পড়া থামানো যাচ্ছে না, তখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
বড় কোনও আঘাত ছাড়াই শরীরের নানা জায়গায় মাঝেমধ্যেই কালচে বা নীলচে ছোপ অথবা কালশিটে পড়বে। অনেকটা জায়গা জুড়ে কালশিটে পড়তে দেখা যাবে।
হাঁটু, কনুই এবং গোড়ালিতে মাঝেমধ্যেই তীব্র যন্ত্রণা হবে ও ফুলে যাবে।
যখন তখন নাক দিয়ে রক্ত পড়া, মাড়ি থেকে রক্তপাত, ব্রাশ করার সময়ে মাড়ি লাল হয়ে ফুলে ওঠা— হিমোফিলিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
এমন কিছু লক্ষণও দেখা দেয়, যাকে অন্য অসুখের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন অনেকে। যেমন, কোষ্ঠকাঠিন্য বা অর্শের সমস্যা ছাড়াই মলদ্বার দিয়ে রক্তপাত হবে, প্রস্রাবের সঙ্গেও রক্ত বেরোতে পারে।
মাথা ব্যথা সারতে চাইবে না, সব সময়েই বমি ভাব থাকবে। মস্তিষ্কের ভিতরে রক্তক্ষরণ হতে থাকলে এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে সতর্ক না হলে ব্রেন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়বে।
হিমোফিলিয়া পুরোপুরি নিরাময়যোগ্য নয়, তবে সঠিক চিকিৎসায় স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। পুরুষেরা হিমোফিলিয়ায় বেশি ভোগন, মহিলারা শুধু রোগের বাহক হন। ফ্যাক্টর-৮ ইঞ্জেকশন দিয়ে হিমোফিলিয়া রোগীকে স্বাভাবিক রাখা হয়। এই রোগ থাকলে বেশি ব্যথানাশক ওষুধ খেতে বারণ করা হয়। তা ছাড়া খেলাধুলার সময় সতর্ক থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি, নিয়মিত দাঁতের যত্ন ও পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াও প্রয়োজন।