রাস্তা থেকে কেনা খাবার, কাটা ফলে মিশে থাকতে পারে জ়িঙ্ক ফসফাইড। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
রাস্তায় বিক্রি হওয়া খাবারের কৃত্রিম রং বা প্রিজ়ারভেটিভ শুধু নয়, ততে মিশে থাকা কীটনাশক নিয়েও সতর্ক করছে খাদ্যের গুণমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএসএসএআই। কাটা ফল, রাস্তায় বিক্রি হওয় জাঙ্ক ফুডে মিশে থাকতে পারে জ়িঙ্ক ফসফাইড নামে এক ধরনের রাসায়নিক, যা ইঁদুর মারার বিষে পাওয়া যায়। এটি শরীরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই বিষক্রিয়া শুরু করে দেয়। ফলে শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রতঙ্গ বিকল হতে থাকে। মুম্বইয়ের দোকারিয়া পরিবারের চার সদস্যের মৃত্যুর পরে ফরেন্সিক রিপোর্টে এই বিষেরই উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে।
বিরিয়ানির পরে তরমুজ খাওয়ার পরেই বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয় মুম্বইয়ের দোকারিয়া পরিবারের চার সদস্যের। সে সময়ে অনুমান করা হয়েছিল বিরিয়ানি খেয়ে তার পর তরমুজ খাওয়ার কারণেই হয়তো মৃত্যু। কিন্ত পরে জানা যায়, তাঁদের খাবারে মিশে ছিল জ়িঙ্ক ফসফাইড নামে ওই রাসায়নিক, যা তাঁদের পাকস্থলী থেকে পাওয়া যায়।
জ়িঙ্ক ফসফাইড কতট বিপজ্জনক?
ইঁদুর মারার বিষে এই রাসায়নিক থাকে। কৃষিকাজ বা গুদামজাত শস্য রক্ষায় এটি ব্যবহার করা হয়। মূলত ইঁদুর জাতীয় প্রাণী, পোকামাকড় থেকে গুদামে মজুত আনাজ, ফল বা খাদ্যদ্রব্য বাঁচাতেই এ রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। জ়িঙ্ক ফসফাইড এমন ধরনের রাসায়নিক, যা দানাশস্য বা আনাজ, ফলমূলের গায়ে লাগলে তা সহজে সাফ হয় না। ফলে সে খাবার যদি ভাল করে না ধুয়ে বা ঠিকমতো রান্না না করেই কেউ খান, তা হলে সহজেই বিষটি ঢুকে যাবে পাকস্থলীতে। আর সেখানে পাকস্থলীর অম্লরস হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ফসফিন নামে এক বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করবে। ফসফিন রক্তে মিশে সুস্থ কোষে পৌঁছলে সবচেয়ে আগে কোষের শক্তিঘর তথা মাইটোকনড্রিয়াকে নষ্ট করে দেবে। ফলে কোষে আর অক্সিজেন ও পুষ্টিরস পৌঁছতে পারবে না। ধীরে ধীরে কোষ অকেজো হতে থাকবে।
জ়িঙ্ক ফসফাইড সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়লে হার্ট, লিভার, কিডনি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলির ক্ষতি করবে। এর থেকে মাল্টিঅর্গ্যান ফেলিয়োরের আশঙ্কা প্রবল।
কাদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে?
শিশু ও বয়স্কদের জন্য এই বিষ মারাত্মক। ছোটদের বিপাকহার বেশি হওয়ায় দ্রুত বিষ ছড়িয়ে পড়তে পারে সারা শরীরে। আবার যাঁদের ওজন কম, তাঁদের জন্যও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে এই বিষ। শিশুর লিভার ও কিডনি এই ধরনের বিষ ছেঁকে নেওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে না। ফলে প্রাণসংশয় ঘটতে পারে।
হার্টের রোগ, লিভারের অসুখ, ডায়াবিটিস বা কিডনির রোগ আগে থেকেই থাকলে, বিষটির প্রভাবে শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যেতে পারে। তাই খাবার খাওয়ার পরে যদি বমি হতে থাকে, ডায়েরিয়া, পেশির খিঁচুনি দেখা দেয় এবং শরীর অসাড় হয়ে যেতে থাকে, তা হলে দেরি না করে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।
কী থেকে শরীরে ঢুকতে পারে?
দোকান থেকে কিনে আনা সব্জি ও ফল ভাল করে নুন-জলে বা ভিনিগার মেশানো জলে পরিষ্কার করতে হবে। যদি দেখেন ফল বা সব্জি অতিরিক্ত চকচকে দেখাচ্ছে, তা হলে সেটি ভাল করে না ধুয়ে খাবেন না।
রাস্তায় বিক্রি হওয়া চালের কোনও খাবার যেমন খিচুড়ি, বিরিয়ানি বা ভাত, ডাল জাতীয় খাবারে মিশে থাকতে পরে বিষ। দোকানি কী ধরনের শস্য কিনছেন বা দীর্ঘ সময় সেগুলি সংরক্ষণ করে রাখার জন্য কীটনাশক প্রয়োগ করলে তার থেকেও বিষ শরীরে ঢুকতে পারে।
তরমুজ, পেঁপে বা আনারসের মতো ফল যদি আগে থেকে কেটে রাখা হয় বা যে জায়গায় রাখা হচ্ছে সেখানে ইঁদুর তাড়াতে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তা হলেও ফসফাইডের মতো রাসায়নিক ফল বা খাবারে মিশে যেতে পারে।
অনেক সময় পুরনো খবরের কাগজের ঠোঙায় খাবার দেওয়া হয়। যদি সেই কাগজ কোনও বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকে, তবে তা খাবারে আসতে পারে।
বিক্রেতা হয়তো দোকানে ইঁদুর মারার বিষ দিয়েছেন, সেই হাত না ধুয়েই খাবার নাড়াচাড়া করেছেন, তা হলে সে খাবার বিষাক্ত হয়ে যেতে পারে।
ইঁদুরে কাটা প্যাকেট বা বস্তার খাবার না ফেলে ব্যবহার করলেও বিপদ ঘটতে পারে।