ছাঁকনি এড়াতে দ্বিতীয় গাড়ির খোঁজ দিল্লিতে

দিল্লির দূষণ কমাতে গাড়ির সংখ্যায় জোড়-বিজোড়ের ছাঁকনি তৈরি করেছে অরবিন্দ কেজরীবাল সরকার। তা এড়াতে দ্বিতীয় গাড়ির খোঁজে নেমেছেন রাজধানীর বহু বাসিন্দা। ফলে, শেষে দূষণ বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ৩০ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:৫৪
Share:

আইন আছে। আছে তার ফাঁকও।

Advertisement

দিল্লির দূষণ কমাতে গাড়ির সংখ্যায় জোড়-বিজোড়ের ছাঁকনি তৈরি করেছে অরবিন্দ কেজরীবাল সরকার। তা এড়াতে দ্বিতীয় গাড়ির খোঁজে নেমেছেন রাজধানীর বহু বাসিন্দা। ফলে, শেষে দূষণ বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের।

পূর্ব দিল্লির বিকাশ মার্গে ‘ভারত কার বাজার’ পুরনো গাড়ির কেনাবেচার ঠিকানা। গত দু’এক সপ্তাহ ধরে সস্তায় পুরনো ‘সেকেন্ড-হ্যান্ড’ গাড়ির খোঁজে একটু বেশিই ভিড় হচ্ছে। যাঁরাই আসছেন, তাঁরা গাড়ির মডেল নয়, জোড় বা বিজোড় নম্বরপ্লেটের খোঁজ করছেন। গত সপ্তাহেই দিল্লিতে ব্যবহৃত বা ‘সেকেন্ড-হ্যান্ড’ গাড়ি বিক্রির বিরাট মেলা আয়োজন করেছিল একটি নামী গাড়ি সংস্থা। তাদের বিজ্ঞাপনেও ‘মূল আকর্ষণ’ ছিল, জোড় ও বিজোড়, দু’রকম নম্বরপ্লেটের গাড়িই মিলবে। উপচে পড়েছিল ভিড়। দূষণের ঠেলায় নতুন বছরের পয়লা তারিখ থেকে দিল্লির গাড়িতে জোড়-বিজোড়ের ছাঁকনি চালু করছেন অরবিন্দ কেজরীবাল। জোড় তারিখে শুধু জোড়, বিজোড় তারিখে শুধু বিজোড় নম্বরের গাড়িই রাস্তায় নামবে। সেই সঙ্গে শীর্ষ আদালত দিল্লিতে নতুন ডিজেলচালিত এসইউভি ও ২০০০ সিসি-র বেশি ক্ষমতার ইঞ্জিনের গাড়ির উপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

Advertisement

এক দিকে জোড়-বিজোড়ের ছাঁকনি, অন্য দিকে নতুন ডিজেল গাড়ির উপরে নিষেধাজ্ঞা—এই দুই থেকে রক্ষা পেতে দিল্লিবাসী এখন ‘সেকেন্ড-হ্যান্ড’ গাড়ির দিকে ঝুঁকছেন। এই প্রবণতা পরিবেশবিদদের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। তাঁদের আশঙ্কা, যে দূষণ কমানোর জন্য এত কড়াকড়ি, পুরনো গাড়ি রাস্তায় নামতে শুরু করলে সেই দূষণই আরও বেশি হবে।

ডব্লিউআরআই রস সেন্টার ফর সাস্টেনেবল সিটিজ’-এর ভারতীয় প্রধান মাধব পাইয়ের মতে প্রথমত, মানুষ গাড়ি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। দ্বিতীয়ত, বিকল্প গণ পরিবহণ ব্যবস্থার অভাবে রাজধানীর বহু মানুষ গাড়ি ছাড়া অসহায়। বিশেষত মহিলারা। কেজরীবালের জোড়-বিজোড়ের ছাঁকনি এড়াতে যাঁদের জোড় নম্বরের গাড়ি, তাঁরা খুঁজছেন বিজোড়। যাঁদের বিজোড়, তাঁরা জোড়ের সন্ধানে। গাড়ির মডেল বা রং নয়, নম্বরপ্লেটই আসল মাপকাঠি। ডিজেলচালিত পুরনো গাড়ির চাহিদাও চড়ছে। অনলাইনে গাড়ি কেনাবেচার সংস্থা কারদেখো-র সমীক্ষা অনুযায়ী, নতুন ডিজেল গাড়িতে নিষেধাজ্ঞার নির্দেশ আসার পর এখন সকলে পুরনো ডিজেল গাড়িতেই পছন্দের মডেলের খোঁজ করছেন। আদালতের নির্দেশিকার আগের সপ্তাহ ও পরের সপ্তাহ তুলনা করে দেখা যাচ্ছে, পুরনো গাড়ির খোঁজ এক ধাক্কায় ১৭ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। উল্টো দিকে নতুন গাড়িতে কমেছে ২৭ শতাংশ।

সিএসই (সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট)-এর পরিবেশবিদ বিবেক চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘শুধু নম্বরপ্লেটের বাধানিষেধ বা নতুন ডিজেল গাড়ি বন্ধ করে লাভ হবে না। ১০ বছরের পুরনো গাড়ি বা ইউরো-টু মানের আগের যে সব গাড়ি রয়েছে, সে সবও একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে। না হলে মানুষ স্বাভাবিক ভাবেই সস্তায় পুরনো গাড়ির দিকে ঝুঁকবেন। তাতে দূষণ মাত্রাছাড়া হবে।’’ পরিবেশবিদদের অভিযোগ, কেজরীবাল সরকারকে দূষণ কমানোর জন্য সামগ্রিক ভাবে যে সব সুপারিশ করা হয়েছিল, তার মধ্যে শুধু জোড়-বিজোড় ছাঁকনিকেই বেছে নেওয়াতে এই সমস্যা দেখা দিতে চলেছে। জোড়-বিজোড় প্রকল্প ভাঙলে ২ হাজার টাকা জরিমানা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল দিল্লি সরকার। কিন্তু আজ তারা সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিকল্প গণ পরিবহণ ব্যবস্থা তৈরি না হলে দিল্লির অবস্থাও মেক্সিকো সিটি-র মতো হবে। কী হয়েছিল মেক্সিকো সিটি-তে? ১৯৮৯-তে মেক্সিকো সিটি-তে দূষণ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে তা কমাতে গাড়ির উপরে নিষেধাজ্ঞা চালু হয়। সেই নম্বরপ্লেটের ভিত্তিতেই। যার ফলে সপ্তাহের কাজের দিনে ভোর ৫টা থেকে রাত ১০টার মধ্যে ২০ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি রাস্তায় নামা বন্ধ হয়। প্রথমে ভালই ফল মেলে। কিন্তু ১৯৯৫-এর মধ্যে শহরের ২২ শতাংশ মানুষ আর একটা সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ি কিনে ফেলেন। সস্তার সেই গাড়ি থেকে এত বাদামি ধোঁয়া বের হত, যে তাদের নামই হয়ে গিয়েছিল ‘চকোলেট কার’। উল্টো দিকে কলম্বিয়ার বোগোটা শহর নম্বরপ্লেটের ভিত্তিতে গাড়িতে নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে বিআরটি (বাস র‌্যাপিড ট্রান্সপোর্ট) ব্যবস্থা, পৃথক সাইকেল ট্র্যাক চালু করে সাফল্য পেয়েছে।

মাধব পাইয়ের যুক্তি, অন্য শহরের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দিল্লি সরকারকেও সেকেন্ড-হ্যান্ড গাড়ি বিক্রির উপরে বিধিনিষেধ জারি
করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা হিসেবে জোড়-বিজোড়ের ছাঁকনি ঠিক আছে। কিন্তু ঘরের দরজায় গণ পরিবহণ ব্যবস্থা পৌঁছে দেওয়াটাই পাকাপাকি সমাধান।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement