নওয়াজ শরিফহীন পাকিস্তানি মন্ত্রিসভার উপরে সে দেশের সেনার প্রভাব আরও বাড়বে ঠিকই। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে পাক সেনা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে পিএমএল(এন) সরকারকে ফেলে দেওয়ার রাস্তায় হাঁটবে না বলেই মনে করছে দিল্লি। কূটনৈতিক সূত্রের খবর, বরং পিছন থেকে দুর্বল সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে ভারত-বিরোধিতার জিগির আরও বাড়িয়ে নিতে পারে তারা।
এটা ঘটনা যে নওয়াজ শরিফ সরলেও তাঁরই দলের অন্য এক জন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। এটাও সত্যি যে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে ভারতের প্রতি ইতিবাচক বার্তা দিলেও নওয়াজ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেনার হাতেই তামাক খেয়েছেন।
কূটনৈতিক শিবির কিন্তু মনে করছে, তবুও নওয়াজের মতো ব্যক্তিত্ব যদি প্রথম বারের জন্য পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রিত্বের পুরো মেয়াদটি পূর্ণ করতে পারতেন (যা প্রায় হয়ে এসেছিল) তা হলে পরবর্তী নির্বাচনে তাঁর শক্তি বহুলাংশে বেড়ে যেত। চাপ বাড়ত সেনা তথা আইএসআই-এর উপরে।
কিন্তু পানামা নথি কাণ্ডের জেরে অপবাদ ঘাড়ে নিয়ে তিনি সরে যাওয়ায় বড় ধাক্কা খেল নওয়াজের দল। দিল্লির সাউথ ব্লকের কর্তাদের ধারণা, পাক সেনার ‘ঘরের লোক’ ইমরান খানের মতো নেতাকে দিয়ে রাজনীতিতে অস্থিরতা আনা এবং নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সুবিধে পেয়ে গেল পাক সেনার পক্ষে।
তবে প্রভাব বাড়ালেও অভ্যুত্থানের সাবেকি মডেল থেকে কেন সরে আসতে চাইছে পাকিস্তানের সেনা?
কূটনৈতিক শিবিরের মতে, তার কারণ একাধিক। প্রথমত, এই মুহূর্তে গণতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে আন্তর্জাতিক সমালোচনা নিজেদের ঘাড়ে নিতে চাইছে না তারা। সব রকম কর্তৃত্বের সুযোগ তাদের সামনে এমনিতেই রয়েছে। কৌশলগত ভাবে তা পিছন থেকে করাটাই এ ক্ষেত্রে সুবিধেজনক বলে মনে করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে ইসলামাবাদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা বাড়ানো বেজিংও চাইছে না, উত্তর কোরিয়ায় সেনা শাসনের ফলে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা পাকিস্তানেও হোক। অর্থনীতির স্বার্থেই সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়াতে নতুন নতুন বন্দর এবং অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলতে পাকিস্তানের বন্ধু হয়ে উঠেছে চিন। বাণিজ্য করতে আর তা বাড়াতে হলে স্থিরতা বাড়ানো প্রয়োজন। বেজিং মনে করে পাকিস্তানে সামরিক শাসন কায়েম হলে তা আমেরিকার ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ভাল ভাবে নেবে না। কোপ পড়বে পাকিস্তানের উপরে। বাড়তি সুবিধে পেয়ে যেতে
পারে নয়াদিল্লি।
ভারত সতর্ক ভাবে পরিস্থিতির উপরে নজর রাখছে। বিদেশ মন্ত্রকের এক কর্তার মতে, ‘‘কোনও রাষ্ট্রে যখন যে শক্তি ক্ষমতায় থাকবে তার সঙ্গেই দ্বিপাক্ষিক কাজকর্ম এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় আমাদের। সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই এমন কোনও পক্ষের সঙ্গে যে কোনও কূটনৈতিক দৌত্যই ব্যর্থ হতে বাধ্য।’’
ঘরোয়া ভাবে এটাও বলা হচ্ছে যে পাকিস্তানি সেনার সঙ্গেও আলোচনার একটা রাস্তা খুলে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। সে ক্ষেত্রে তাদের ভারত-বিরোধিতার তীব্রতাকেও কিছুটা হলেও প্রশমিত করার একটা সুযোগ থাকে। কিন্তু এখনই রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি সেনার সঙ্গে মূল স্রোতের কূটনৈতিক আলোচনা করাটাও সম্ভব নয়। তাই আপাতত পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক নকশা কী ভাবে বদলায় সে দিকে কড়া নজর রাখবে সাউথ ব্লক।