—প্রতীকী চিত্র।
ভারতীয় সভ্যতার শক্তি তার বহুত্ববাদ ও বৈচিত্র্যের মধ্যে নিহিত বলে মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট। আদালতের মতে, শবরীমালা মামলায় নয় সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ যে সিদ্ধান্ত জানাবে, তা গোটা ভারতীয় সভ্যতার উপরে প্রভাব ফেলবে। আবেদনকারী আইনজীবীরা এই পরিপ্রেক্ষিতে সওয়াল করেছেন, ভারতের যেমন সভ্যতা আছে, সংবিধানও আছে। সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী হলে ধর্মীয় প্রথা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে।
বৃহস্পতিবার সাংবিধানিক বেঞ্চে বিচারপতি বিভি নাগরত্ন বলেন, ‘‘এত বৈচিত্র্য ও বহুত্ব থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা একটি সভ্যতা হিসেবে টিকে আছি? কারণ বৈচিত্র্যই আমাদের শক্তি। আমাদের একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র বলা হয়। তার মধ্যেও কিছু ধ্রুবকআছে। একটি ধ্রুবক হল ভারতীয় সমাজে মানুষের— সে পুরুষ, নারী বা শিশু যেই হোক— ধর্মের সঙ্গে তার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়।’’ বিচারপতির বক্তব্য, ‘‘যখন কোনও ধর্মীয় প্রথা বা ধর্মীয় বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে— কোথায়, কেন, কী ভাবে তা চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে; সংস্কার কি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভিতরথেকে আসা উচিত, না কি রাষ্ট্র তা করবে; অথবা আদালতকে কি এ সব বিষয়ে রায় দিতে হবে— এই বিষয়গুলিই ভাবাচ্ছে। অর্থনীতি বা উন্নয়নের নানা পরিবর্তনের পরেও আমাদের মধ্যে কিছু স্থায়ী মূল্যবোধ আছে। আমরা সেই মূল ভিত্তিকে ভেঙে দিতে পারি না। সেটাই আমাদের উদ্বেগের কারণ।’’
আইনজীবী রাজু রামচন্দ্রন তাঁর যুক্তিতে বলেন, “আমরা একটি সংবিধানের অধীনে থাকা সভ্যতা। তাই যা সংবিধানের মূল চেতনার বিরুদ্ধে যায়, তা সভ্য সমাজে চলতে পারে না। এখানেই আদালতের দায়িত্ব ও প্রজ্ঞার প্রয়োজন। এ ধরনের আরও অনেক মামলা আসতে থাকবে ভেবে আদালত হাত গুটিয়ে নিতে পারে না। মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন হয়েছে, না কি এটি কেবল ধর্মীয় গোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ মতভেদ, সেটা নির্ধারণ করাই আদালতের দায়িত্ব।’’ শবরীমালার পাশাপাশি দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ে নারীদের বহিষ্কার এবং যৌনাঙ্গ বিকৃতির যে প্রথা রয়েছে, আবেদনকারীরা তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। বহিষ্কার প্রথা প্রসঙ্গে রাজু বলেন, এই প্রথার ফলে সামাজিক ভাবে সম্পূর্ণ একঘরে হয়ে পড়তে হয়। কাউকে বহিষ্কার করা হলে সে মসজিদে যেতে পারে না, এমনকি সম্প্রদায়ের নিজস্ব কবরস্থানে তাকে সমাহিতও করা যায় না। ফলে তার সংবিধানের ২৫(১) অনুচ্ছেদের অধিকার কার্যত কেড়ে নেওয়া হয়। রাজু সওয়াল করেন, সুপ্রিম কোর্ট যখন ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করছে, তখন তা শুধু মন্দিরে প্রবেশের প্রশ্নে আটকে থাকছে না। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তখন বলেন যে, এই সাংবিধানিক বেঞ্চ পারসি বা দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের প্রথা নিয়ে শুনানি করছে না। ২৫ ও ২৬ অনুচ্ছেদের সাংবিধানিক প্রশ্ন এবং আদালত কত দূর পর্যন্ত এ সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে, তানির্ধারণ করছে।
রাজু তাঁর সওয়াল চালিয়ে গিয়ে বলেন, ‘‘এই সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে আদালতে আসতে সাহস লাগে। এটি সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং মৌলিক অধিকারের প্রশ্ন।’’ বিচারপতি নাগরত্ন তখন ফের বলেন, ‘‘ভবিষ্যতে দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ের অন্যকোনও গোষ্ঠী এসে বলতে পারে যে বহিষ্কার প্রথা পুনরুদ্ধার করা হোক, কারণ এটি তাদের ধর্মের অংশ। তখন আদালত কী করবে? ধর্মের ভিতরে বিভিন্ন গোষ্ঠী ভিন্ন দাবি নিয়ে এলে, আদালত কি বারবার এই ধরনের বিষয়ে বিচার করতে থাকবে?” নয় সদস্যের বেঞ্চ বর্তমানে সাতটি সাংবিধানিক প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে। তার অভিঘাত শুধু শবরীমালা নয়, বরং মসজিদে নারীদের প্রবেশ, পারসি মহিলাদের ধর্মের বাইরে বিয়ে করলে বহিষ্কার এবং দাউদি বোহরা সম্প্রদায়ে নারী যৌনাঙ্গ বিকৃতির মতো বিষয়গুলির উপরও পড়বে। বিচারপতি আমানুল্লা খান এ দিন আইনজীবী সিদ্ধার্থ লুথরার সওয়ালের পরে মন্তব্য করেছেন, যৌনাঙ্গ বিকৃতি করা মানে শারীরিক অঙ্গসংস্থানের বিরুদ্ধে যাওয়া।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে