লালকেল্লায় রামলীলা, শিবের চরিত্রে সেই গজেন্দ্র চৌহান

রামলীলা না ব্রডওয়ে অপেরা! সংশয়ের কারণ আছে বইকি। লালকেল্লার সামনে একশো বিশ ফুট লম্বা, ষাট ফুট চওড়া মঞ্চ। অত্যাধুনিক আলো, প্রযুক্তির মাধ্যমে শূন্যে তির-ধনুক, তরবারির লড়াই।

Advertisement

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০১৫ ২১:৫৩
Share:

রামলীলা না ব্রডওয়ে অপেরা!

Advertisement

সংশয়ের কারণ আছে বইকি। লালকেল্লার সামনে একশো বিশ ফুট লম্বা, ষাট ফুট চওড়া মঞ্চ। অত্যাধুনিক আলো, প্রযুক্তির মাধ্যমে শূন্যে তির-ধনুক, তরবারির লড়াই। রাম-লক্ষ্মণ বনাম মেঘনাদের যুদ্ধের ‘স্টান্ট’-এর নকশা করছেন বলিউডের ফাইটমাস্টার। সাজগোজে বিষ্ণু পটেল— যিনি রামানন্দ সাগরের রামায়ণ, বি আর চোপড়ার মহাভারত— দু’টোরই পোশাকের নকশা তৈরির দায়িত্বে ছিলেন।

আর ‘স্টারকাস্ট’? মহাভারতের যুধিষ্ঠির গজেন্দ্র চৌহান, অধুনা পুণের ফিল্ম ইনস্টিটিউটের শীর্ষপদে বসে ফের শিরোনামে। তিনি এই রামলীলায় একেবারে শিবের চরিত্রে। এখানে কেউ প্রতিবাদ করছেন না। বরঞ্চ বাঘছাল গায়ে মঞ্চে উঠতেই বিস্তর হাততালি। নারদের চরিত্রে আসরানিও জমিয়ে দিয়েছেন। রাবণ-পুত্র নরন্তক সাজছেন শক্তি কপূর। রতি অগ্নিহোত্রী, রাজা মুরাদ, পুণিত ইসার, রঞ্জিৎ, অমিতা নাঙ্গিয়া, দীপশিখা, রূপা দত্ত, সুরেন্দ্র পল, জারিনা ওয়াহ্‌ব, রবি কিষেণ, ডলি বিন্দ্রার মতো একগুচ্ছ বড় পর্দা-ছোট পর্দার অভিনেতা-অভিনেত্রী এ বার লালকেল্লার রামলীলার নানা চরিত্রে। জোর গুজব, বিজয়া দশমীর দিন রাবণবধ অধ্যায়ে রামের চরিত্রে নামতে পারেন শাহিদ কপূর!

Advertisement

যা-ই হোক না কেন, রামলীলার কমিটির কর্তারা দুঃখের কথাটা বলেই ফেললেন। সবাই আসে। আসেন না শুধু দিল্লির বাঙালিরা। তাঁরা দুপুরে খিচুড়ি ভোগের লাইনে দাঁড়াবেন, বিকেলে ভিড় ঠেলে চিত্তরঞ্জন পার্কে ঢুকবেন। সন্ধ্যায় দক্ষিণ দিল্লি থেকে উজিয়ে উত্তরের কাশ্মীরি গেটের বিরিয়ানি খেতে যাবেন। তার পর রাতে কোন মণ্ডপে কলকাতার কোন গাইয়ে আসছেন, সেই খোঁজ করবেন। কিন্তু রামলীলা-র দিকে ফিরেও তাকাবেন না। প্রশ্ন করলেই উত্তর, ‘‘ধুস, ও সব ভাল্লাগে না!’’

কলকাতায় যেমন পুজো কমিটির শীর্ষ পদে রাজনৈতিক নেতারাই বিরাজমান, দিল্লির রামলীলা কমিটিতেও তাই। কংগ্রেস হোক বা বিজেপি, সকলেই সেখানে বিরাজমান। এ বারও যেমন লালকেল্লার রামলীলায় রাহুল গাঁধী আসবেন বলে খবর। নিজের জমি ছাড়তে নারাজ বিজেপি-র সাংসদ, ভোজপুরি অভিনেতা মনোজ তিওয়ারি রামলালীয় রামচন্দ্রের নৌকার মাঝির ছোট চরিত্রেই নেমে পড়ছেন।

দিল্লিতে এসে অনেক বাঙালি অবশ্য ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে আলোর সাজ দেখে পুজোমণ্ডপ ভেবে ভুল করে রামলীলা ময়দানে ঢুকে পড়েন। তার পরেই বোকা বনে বেরিয়ে আসার পথ খোঁজেন। শুধু লালকেল্লার সামনে তিন দশকের পুরনো রামলীলা নয়। গোটা রাজধানী জুড়েই অজস্র রামলীলার আয়োজন। ময়দান জুড়ে নাগরদোলা থেকে পাপড়ি চাট, রাবড়ি-জিলিপি থেকে বিকিকিনি, হাজারো ফুর্তির আয়োজন। সন্ধ্যা হতেই রামায়ণের নানা অধ্যায়ের অভিনয়। কোনও দিন বালী-সুগ্রিবের লড়াই, কোনও দিন হনুমানের লঙ্কাকাণ্ড। বিজয়া দশমীতে রাবণবধ। আতসবাজির রাবণ পোড়ানো। কিন্তু কোনও জায়গাতেই বাঙালির বিশেষ দেখা মেলে না।

বাঙালির অনুপস্থিতি নয়। রামলীলার আসল সঙ্কট কিন্তু অন্যত্র। তরুণ প্রজন্মই এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে রামলীলা থেকে। তাঁদের আর ও সবে মন ভিজছে না। অনেক রামলীলার মঞ্চের সামনেই চেয়ার ফাঁকা পড়ে থাকছে। বয়স্করা বাদে কমবয়সীদের দেখা মিলছে না। লালকেল্লার রামলীলা আয়োজক কমিটির কর্তা অশোক অগ্রবাল বলছেন, ‘‘রামলীলা তো আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অঙ্গ। তরুণ প্রজন্মের সামনে তাই একে আকর্ষণীয় করে তোলাটা জরুরি।’’

সময়ের দাবি মেনেই রামলীলায় বলিউডের তারকা, চোখ ঝলসানো আলো, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে শূন্যে লড়াইয়ের আমদানি। আগে রামলীলা হত শুদ্ধ হিন্দিতে। এখন হিন্দির সঙ্গে ইংরেজির মিশেল। রামায়ণের চরিত্রদের মুখেও নতুন প্রজন্মের মুখের ভাষা। কিছুটা লাভ মিলছে। কিন্তু এই ডিজিটাল-জমানায় এ ভাবে পুরনো রামলীলার ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা যাবে তো? অশোক বলেন, ‘‘আমরা ওয়েবসাইটে রামলীলা লাইভ টেলিকাস্টের ব্যবস্থা করছি। ইউটিউবে সব আপলোড করে দেওয়া হচ্ছে। ফেসবুকেও প্রচার চালাচ্ছি। কমবয়সীরা আসতে শুরু করেছেন। এই ঐতিহ্য হারিয়ে গেলে সেটা আমাদেরই লজ্জা।’’

এই সংক্রান্ত আরও খবর
লালকেল্লায় রামলীলা

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement