কেরলে ভোটের লাইন। — নিজস্ব চিত্র।
ভোটের গরমকে ছাপিয়ে গিয়েছিল প্রাকৃতিক গরম! তার উপরে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী মালয়ালিদের অনেকে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে উঠতে পারবেন না বলে ধারণা ছিল নানা মহলের। শেষ পর্যন্ত ভোটের দিনে যাবতীয় প্রতিকূলতা ছাপিয়ে দেখা দিয়েছে ভোটারের লাইন। গ্রামাঞ্চল তো বটেই, শহরেও ভোটদানের হার এ বার ঊর্ধ্বমুখী। ভোটদানে এই উৎসাহই নানা জল্পনা তৈরি করছে কেরলের তিন রাজনৈতিক ফ্রন্টে।
দক্ষিণী এই রাজ্যের ১৪০ বিধানসভা আসনে এক দফায় ভোট মিটে গিয়েছে ৯ এপ্রিল। ফলাফল ঘোষণার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা চলবে আগামী ৪ মে পর্যন্ত! ভোট পড়ার প্রবণতাকে বিবেচনায় রেখেই আপাতত হিসেব-নিকেশ চলছে সব শিবিরে। শাসক সিপিএম এবং প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস, দু’পক্ষই সংখ্যাগরিষ্ঠতার আশা করছে। আর তৃতীয় পক্ষ বিজেপির দাবি, কেরল এ বার ত্রিশঙ্কু বিধানসভা পেতে চলেছে।
কেরলে এ বার বিধানসভায় ভোট পড়েছে ৭৮.২০%। যা রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ। আরও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য, ভোটদানের নিরিখে প্রথম ২০টি কেন্দ্রের মধ্যে উঠে এসেছে কোঝিকোঢ়, তিরুঅনন্তপুরম, কোচির বেশ কিছু শহুরে বিধানসভা আসন। গ্রামাঞ্চলে ভোটদানের প্রবণতা সচরাচর বেশিই থাকে। কিন্তু এ বার শহরেরও বিস্তীর্ণ এলাকায় ভোট দেওয়ার উৎসাহ দু’ধরনের এলাকাকে প্রায় এক সারিতে এনে দিয়েছে। একটি সূত্রের ব্যাখ্যা, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় শহর এলাকার বিধানসভা কেন্দ্রগুলি থেকে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার করে নাম বাদ গিয়েছে। মোট ভোটার কমে যাওয়ায় ভোটের শতাংশের হিসেবও অন্য রকম হয়েছে।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় ঝাড়াই-বাছাই শেষে কেরলের ১৪টি জেলার মধ্যে মলপ্পুরম, কান্নুর ও কাসারগোড়ে মোট ভোটার বেড়েছে। বাকি ১১টি জেলাতেই মোট ভোটার সংখ্যা কমেছে। ভোটের দিন মলপ্পুরম, কান্নুর, কাসারগোড়ের অনেক বুথেই রাত ৯টা পর্যন্ত লাইন ছিল। বিদেশে ছিলেন বা ভিন্ রাজ্যে কর্মরত, এমন বেশ কিছু মানুষ প্রথম বার ভোট দিতে কেরলে নিজের বুথে গিয়েছেন। বাম ও কংগ্রেস নেতাদের মতে, এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া শুরু হওয়ার জেরে মানুষের মধ্যে এখন ভোট দেওয়ার আগ্রহ বেড়ে যাচ্ছে। বিহারের ভোটেও একই ছবি দেখা গিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে নাম বাদ যাওয়া ঘিরে বিপুল বিতর্ক পরিস্থিতির উপরে আরও প্রভাব ফেলেছে বলেই ওই নেতাদের মত।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এবং পেরাভুর কেন্দ্রের প্রার্থী (সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কে কে শৈলজা তাঁর এই পুরনো কেন্দ্রেই প্রার্থী এ বার) সানি জোসেফের মতে, ‘‘এত বিপুল সংখ্যায় মানুষ ভোট দিতে বেরিয়েছেন মানে রাজ্যে পরিবর্তনের হাওয়া রয়েছে। গত দু’বারের এলডিএফ সরকারকে বদলানোর লক্ষ্যেই মানুষ ভোট দিয়েছেন। কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউডিএফ সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে বেশিই নিয়ে ক্ষমতায় আসবে।’’ সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক এম ভি গোবিন্দন এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, ‘‘ভোটদানের হার বেশি হয়েছে মানেই মানুষ বদল চাইছেন, এমন ধরে নেওয়া যায় না। বাম সরকার যে উন্নয়নের কাজ করেছে, তার পক্ষেই মানুষ আস্থা রাখছেন বলে আমরা আশাবাদী। তা ছাড়া, এসআইআর-এর প্রভাবও পড়েছে ভোটদানের এই হারে।’’ আসনভিত্তিক সম্ভাব্য কোনও হিসেব অবশ্য এখনও বাম শিবির করেনি। তবে তাদের লক্ষ্য ১০০ আসন ছোঁয়া।
তিরুঅনন্তপুরম পুর-নিগমে এনডিএ-র পুরবোর্ড আসার পরে দক্ষিণের এই রাজ্য নিয়ে নতুন করে উৎসাহী হয়েছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও আগের চেয়ে বেশি সময় দিয়েছেন। তৃতীয় ফন্ট হিসেবে বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ কত ভোট পাবে, তার উপরে অনেক ক্ষেত্রেই ফলাফল নির্ভর করবে বলে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশের মত। বিজেপির রাজ্য সভাপতি এবং নেমম কেন্দ্রের প্রার্থী রাজীব চন্দ্রশেখরের দাবি, ‘‘ইউডিএফ ৫০ আসনের বেশি উঠতে পারবে না। আর তৃতীয় বারের জন্য বামেদের ফেরানোর কারণ নেই। রাজনৈতিক পরিবেশ ত্রিশঙ্কু বিধানসভার সম্ভাবনাই উস্কে দিচ্ছে। এবং এনডিএ সেখানে নির্ণায়ক শক্তি হবে।’’
এরই মধ্যে বঙ্গে প্রচারে এসে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দাবি, ‘‘কেরলে এমন পরিস্থিতি যে, এলডিএফ এবং ইউডিএফ জেতার দাবি পর্যন্ত করছে না! ওরা বুঝে গিয়েছে, হার পাকা! ’’
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে