বাজেট বিতর্কে জবাব হিমন্তের

বাজেটের পর বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছিলেন অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। একের পর এক তোপ দাগছিল বিরোধী শিবির— বাজেটে অর্থনীতির চেয়ে সাহিত্য বেশি। উচ্ছেদ হওয়া সংখ্যালঘুদের পাশে নেই রাজ্য। আরএসএস ভাবধারা চাপানো হচ্ছে রাজ্যে। নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি সংখ্যালঘু উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সড়ক সম্প্রসারণ, উন্নয়ন পরিকাঠামোর বরাদ্দগুলি।

Advertisement

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০৩:০৩
Share:

বাজেটের পর বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছিলেন অর্থমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।

Advertisement

একের পর এক তোপ দাগছিল বিরোধী শিবির— বাজেটে অর্থনীতির চেয়ে সাহিত্য বেশি। উচ্ছেদ হওয়া সংখ্যালঘুদের পাশে নেই রাজ্য। আরএসএস ভাবধারা চাপানো হচ্ছে রাজ্যে। নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি সংখ্যালঘু উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, সড়ক সম্প্রসারণ, উন্নয়ন পরিকাঠামোর বরাদ্দগুলি। ৮৫ হাজার কোটি খরচের কথা বললেও রাজ্যের হাতে অত টাকাই নেই।

আজ সে সবের জবাব দিলেন হিমন্ত। বাজেট ভাষণের মতোই বেদ থেকে বিবেকানন্দের বাণী উল্লেখ করলেন। তিনি জানালেন, টুইটার ট্রেন্ডিং-এ তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক ডামাডোল পিছনে ফেলেছিল তাঁর বাজেট বক্তৃতা।

Advertisement

কংগ্রেস বিধায়ক আবদুল খালেক দাবি করেছিলেন, কাজিরাঙা বা অন্যত্র উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলির পাশে রাজ্য সরকারের দাঁড়ানো উচিত। হিমন্ত বেদের ব্যাখ্যা টেনে জানান, ভগবান শুধুই মানুষের মধ্যে নন, সমান ভাবে গন্ডার, বাঘ, হাতির মধ্যেও বর্তমান। তাই তাদের জায়গা কাড়ছে, খুন করছে যারা- তাদের হঠানো সরকারের কর্তব্য। তিনি বলেন, ‘‘কংগ্রেসে থাকাকালীন বুঝতে পারিনি জবরদখলকারীদের রক্ষণাবেক্ষণ কারা দিয়েছে। এখন বুঝলাম ওদের জন্য কাদের দরদ বেশি।’’ কমলপুরের বিধায়ক সত্যব্রত কলিতা তাঁর বক্তব্য সমর্থন করে বলেন, ‘‘জঙ্গল হ্রাসের প্রভাব পড়ছে বাস্তুতন্ত্র ও প্রাণীদের খাদ্যাভ্যাসে। কাজিরাঙায় হাতিরা এখন মাছ খাচ্ছে। তার ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। কমলপুরে বাঁদররা নিয়ম করে খাচ্ছে পায়রা ও ডিম!’’

মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ ভাষণের দৈর্ঘ্য নিয়ে বলেছিলেন, ‘‘কেন্দ্রীয় বাজেট পড়তে এক ঘণ্টা লাগে। আর একটি রাজ্যের বাজেট পড়তে চার ঘণ্টা!’’ হিমন্ত বলেন, ‘‘আপনি আমার ভাষণ পুরো শোনেননি। ১৫ মিনিট শুনেই বেরিয়ে যান। ২২০ কোটি খ্রিষ্টান ও ১৬০ কোটি ইসলাম ধর্মাবলম্বীর একটি করেই ধর্মগ্রন্থ। কিন্তু ১০০ কোটি হিন্দুর চার বেদ, ১৮ উপনিষদ, দু’টি মহাকাব্য, আরও কত কী। তাই সংখ্যার নিরিখে আমার বাজেট ভাষণের দৈর্ঘ্য ও গভীরতা মাপা ঠিক হবে না। আমি সব শ্রেণির মানুষের পুঙ্খানুপুঙ্খ উন্নতির রূপরেখা তৈরির চেষ্টা করেছি।’’ তিনি জানান, রাজ্যের মূল লক্ষ হবে কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী না থেকে সাবলম্বী হওয়া। তাই কেন্দ্র টাকা দেওয়ার আগেই এখন রাজ্য মিড ডে মিলের টাকা দিয়ে দেবে। আগের বেতন কমিশনের সুপারিশ ৩৯ মাস পরে কার্যকর হয়েছিল। কিন্তু এ বারের নতুন বেতন ১ এপ্রিল থেকে কার্যকর হবে। গত এপ্রিল থেকে মিলবে বকেয়া। আগের বাজেটের সব টাকা ৩১ মার্চের মধ্যে খরচ করা হবে। বিশদ খরচের খতিয়ান অগস্টের অধিবেশনে পেশ করবেন বলে জানান হিমন্ত।

অর্থমন্ত্রী জানান, বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারি কর্মীদের বেতন কাটা, ৪৮ হাজার বিদ্যালয়কে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করে ঢেলে সাজা, রাজস্ব বৃদ্ধি, সরকারী কর্মী কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে ৬০ বছর পর্যন্ত পরিবারকে বেতন দেওয়া, সব বিভাগের ৫ শতাংশ টাকা চা বাগানের উন্নয়নে বরাদ্দ করা, অসমীয়া সিনেমার উন্নয়নে একগুচ্ছ ব্যবস্থা, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ তৈরির মতো কাজ এক উন্নততর অসমের স্বপ্নকে সফল করবে। তিনি জানান, আরএসএসের আদর্শ প্রচারের জন্য নয়, অসমীয়া ভাষা রক্ষার স্বার্থেই তিনি রাজ্যের সব সরকারি-বেসরকারি স্কুলে সংস্কৃত ও স্থানীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করেছেন। না হলে পরের প্রজন্ম নিজের ভাষাই ঠিকমতো শিখবে না।

হিমন্ত হিসেব দেন, রাজস্ব আদায় প্রচুর বেড়েছে। ধারা বজায় থাকলে ও জিএসটি চালু হলে রাজস্ব বৃদ্ধির হার ২১ শতাংশ হতে পারে। কেন্দ্রের কাছ থেকেও মিলতে চলেছে অতিরিক্ত ২ হাজার কোটি টাকা। জানান, ১৭ ফেব্রুয়ারি নগাঁও ও ধুবুরি মেডিক্যাল কলেজের কাজ শুরু হবে। লখিমপুরে মাধবদেব কলেজ, হোজাইয়ে হোজাই কলেজ ও বরপেটায় বজালি কলেজকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।

কংগ্রেস আমলে ১৫ বছরে ১০০ কিলোমিটার রাস্তা হয়েছে। হিমন্তের দাবি, বিজেপি পাঁচ বছরে তার চেয়ে ঢের বেশি রাস্তা পাকা করবে। বিরোধী বিধায়কদের তিনি বলেন, ‘‘আপনাদেরও উন্নতি, পাকা সড়ক লাগলে আমাদের দলে চলে আসুন।’’

বড়োল্যান্ডকে একত্রে দুই দফার টাকা মঞ্জুর করে দিয়েছে রাজ্য। সরকারি বিদ্যালয়গুলির মানোন্নয়নে গুণোৎসব পরীক্ষার আয়োজন হয়েছে রাজ্যজুড়ে। সরকারি কর্মীদের স্বল্পসূদে ১৫ লক্ষ টাকা করে ও কৃষকদের বিনা সূদে ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে বাজারে অর্থের লেনদেন বাড়াতে চান মন্ত্রী। তাঁর আশা, ২০২১ সালের মধ্যে সরকারি কর্মীদের বেতনের জন্য আর কেন্দ্রের কাছে হাত পাততে হবে না। তিনি জানান, নতুন সব সরকারি ভবন, দফতর, স্কুলে প্রতিবন্ধীদের জন্য র্যাম্প থাকা বাধ্যতামূলক হয়েছে। অর্থ মঞ্জুরির ফাইল সরাসরি অর্থ দফতর থেকে কোষাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করে ৬৯টি টেবিল ঘুরে টাকা পাওয়ার প্রথাই মুছে দেওয়া হয়েছে।

হিমন্তের দাবি, বাজেটে যে ১৮ দফা উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সবকটি পূরণ করে দেখাবেন তিনি। এ বছর এক লক্ষ বেকারকে কাজ দেওয়ার পরে পরের বছর লক্ষ্য বাড়িয়ে দুই লক্ষ করা হবে। বাড়ানো হবে বেকারদের ও মহিলা আত্মসহায়ক সংগঠনকে প্রদত্ত ঋণের পরিমাণ।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ পরে বলেন, ‘‘হিমন্ত এমন বলছেন যেন আগের সরকারের সব মন্ত্রী, বিধায়করা অকর্মণ্য ছিলেন। আমরা রাজ্যকে এত স্থিতিশীল স্থানে নিয়ে এসেছি বলেই সেই মজবুত জমিতে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী উন্নততর অসমের স্বপ্ন দেখাতে পারছেন। তাঁর বড় ঘোষণা ও বক্তৃতা কাজে পরিণত হলে খুশি হবো। তবে, গত আট মাসে পরিস্থিতি ভাল হয়নি বরং খারাপই হয়েছে।’’

এ দিকে, বরাক উপত্যকায় হাইকোর্টের বেঞ্চ স্থাপনের সম্ভাবনা খারিজ হয়ে গিয়েছে। বিধানসভায় মন্ত্রী নবকুমার দোলে আজ জানিয়েছেন, বেঞ্চ স্থাপনের জন্য হাইকোর্টের অনুমতি প্রয়োজন। সে জন্য সরকার চিঠি পাঠিয়েছিল। কিন্তু হাইকোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, বরাকে বেঞ্চ স্থাপন যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমন এখন সম্ভবও নয়। উধারবন্দের বিজেপি বিধায়ক মিহিরকান্তি সোমের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানিয়ে দেন, সরকারের এ বিষয়ে আর কিছু করণীয় নেই।

প্রসঙ্গত, জেলা বার সংস্থা বরাক উপত্যকায় হাইকোর্টের বেঞ্চের জন্য অনেকদিন ধরে দাবি করছিল। অন্যান্য সংস্থাও এ নিয়ে বিভিন্ন সময় আওয়াজ তুলেছিল।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement