পাঠানকোটে নিহত এনএসজি-র লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিরঞ্জন কুমারের শেষকৃত্যে তাঁর বাবা ও মেয়ে। সোমবার বেঙ্গালুরুতে পিটিআইয়ের ছবি।
কার্গিল যুদ্ধের পর আঙুল উঠেছিল গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে বোঝাপড়ার অভাবের দিকে। সমন্বয়ের অভাব খুঁজতে সুব্রহ্মণ্যম কমিটি গড়া থেকে শুরু করে চেষ্টা কিছু কম হয়নি। ১৬ বছর পরে পাঠানকোটে বায়ুসেনা ঘাঁটিতে জঙ্গি হানা মোকাবিলার হাল থেকে স্পষ্ট, বোঝাপড়ার অভাবটা রয়েই গিয়েছে এখনও।
প্রশ্ন উঠেছে, আগে থেকে সন্ত্রাসবাদী হামলার নির্দিষ্ট গোয়েন্দা খবর থাকা সত্ত্বেও কেন পাঠানকোটে হামলা রোখা গেল না? কী ভাবে জঙ্গিরা বায়ুসেনা ঘাঁটির এতটা ভিতরে ঢুকে যেতে পারল? কেন ৬ জন জইশ-জঙ্গিকে খতম করতে ৭ জন জওয়ানের প্রাণ গেল? কেনই বা ৬০ ঘণ্টা পরেও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না, নিকেশ হয়েছে ক’জন জঙ্গি? এই যাবতীয় প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রের খবর, পাঠানকোটে প্রথমেই গোল বাধে গোটা অভিযানের নেতৃত্ব কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে। যার সূত্রপাত হয় শনিবার ভোররাতে জঙ্গি হামলা শুরুর আগেই। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের নির্দেশে এনএসজি-র একটি বাহিনী তড়িঘড়ি পাঠানকোট পৌঁছে যায়। সেনা বা বায়ুসেনার কর্তারা কেউই এনএসজি-কে রাশ ছাড়তে রাজি ছিলেন না। শেষে দিল্লি থেকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের হস্তক্ষেপে নেতৃত্ব তুলে দেওয়া হয় এনএসজি-র হাতে।
সেনা-কর্তাদের বক্তব্য, কাছেই হিমাচল প্রদেশের নাহন ক্যান্টনমেন্ট। সেখানে সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের বাহিনী মজুত রয়েছে। তাদের না পাঠিয়ে কেন হরিয়ানার মানেসর থেকে এনএসজি-কে নিয়ে যাওয়া হল? তাঁদের দাবি, এই অভিযানের নেতৃত্ব থাকা উচিত ছিল সেনার স্থানীয় বাহিনীর জিওসি (জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং)-এর হাতে।
এনএসজি সূত্রের অভিযোগ, হামলার আশঙ্কা রয়েছে জেনেও বিমানঘাঁটির পাহারার দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়েছিল ডিফেন্স সিকিউরিটি কোরের প্রবীণ জওয়ানদের হাতে। সেনাবাহিনীর এই সব অবসরপ্রাপ্ত জওয়ানদের সকলেরই বয়স ৫০-এর আশেপাশে। বিমানঘাঁটিতে সাধারণ নজরদারির ক্ষমতা থাকলেও সন্ত্রাসবাদী হামলা ঠেকানো সম্ভব ছিল না তাঁদের পক্ষে। আকস্মিক জঙ্গি হামলায় মূলত এঁদেরই প্রাণ গিয়েছে।
পঞ্জাব পুলিশের এসপি-র গাড়ি ছিনতাইয়ের পরই গোয়েন্দারা রিপোর্ট দিয়েছিলেন যে, ওই জঙ্গিরা বায়ুসেনা ঘাঁটিতে হামলা করতে পারে। সেই রিপোর্টকে বায়ুসেনা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিল কি না— উঠছে সেই প্রশ্নও। প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, জঙ্গিরা ঢুকেছিল পাঁচিলের ভাঙা অংশ দিয়ে। সেখানে কোনও প্রহরাই ছিল না। জঙ্গিরা যে ঢুকে পড়েছে, তা টের পাওয়া যায় ইউএভি (আনম্যান্ড এরিয়াল ভেহিকল) থেকে পাঠানো ছবির মাধ্যমে। অভিযোগ, জঙ্গি-হামলার আশঙ্কায় পঞ্জাব পুলিশ গোটা এলাকায় ‘হাই-অ্যালার্ট’ জারি করার পরেও বায়ুসেনা ঘাঁটির ভিতরে যথেষ্ট সতর্কতা ছিল না। তার ফলেই এত জন জওয়ান নিহত হন।
এটা ঘটনা, ঘাঁটির ভিতরে যুদ্ধবিমানের নিরাপত্তার দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। আর বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পঞ্জাব পুলিশের। বায়ুসেনার কর্তাদের প্রশ্ন, পুলিশের এসপি-র গাড়ি ছিনতাইয়ের পরেও সারা রাতে কেন সন্ত্রাসবাদীদের ধরা গেল না? কী ভাবে তারা ঘাঁটি পর্যন্ত পৌঁছে গেল? যে ভাবে জঙ্গিরা ঘাঁটিতে ঢুকেছে তা থেকে স্পষ্ট, গোটা এলাকা সম্পর্কে তাদের স্পষ্ট ধারণা ছিল। গোয়েন্দাবাহিনীই বা কী করছিল? সেনা-কর্তারা বলছেন, কাশ্মীরের বদলে জঙ্গিরা এখন সহজ নিশানা হিসেবে পঞ্জাবকে বেছে নিচ্ছে। অথচ পঞ্জাব পুলিশ ও গোয়েন্দাবাহিনীর তরফে তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি।
প্রশ্ন অনেক। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফের তদন্ত শুরু হচ্ছে। বোঝাপড়ার অভাব তাতে ঘুচবে কি!
এসপি-কে ঘিরে ধোঁয়াশা
পাঠানকোট হামলায় গুরদাসপুরের এসপি সালবিন্দর সিংহকে সোমবার ছ’ঘণ্টা জেরা করেন এনআইএ-র গোয়েন্দারা। সালবিন্দরকে অপহরণ করে তাঁর গাড়ি নিয়েই জঙ্গিরা পাঠানকোটে হামলার জন্য এগিয়েছিল বলে অভিযোগ। গোয়েন্দাদের প্রশ্ন, জঙ্গিরা সালবিন্দরকে ছেড়ে দিল কেন? তাঁরা
আরও জানতে পেরেছেন, ওই এসপি-র বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ থাকায় জঙ্গিদের হাতে অপহৃত হওয়ার কথা প্রথমে উচ্চপদস্থ কর্তারা বিশ্বাস করেননি। তাতে সময় নষ্ট হয়েছে। জঙ্গিদের সংখ্যা নিয়েও বয়ান বদলেছেন তিনি।