বৈঠকে বসুন্ধরা রাজে এবং নিতিন গডকড়ী। সোমবার জয়পুরে। ছবি: পিটিআই।
সুষমা স্বরাজকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে এখনই সরাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। একই ভাবে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজের বিরুদ্ধে কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা আক্রমণের সুর আরও চড়া করলেও তাঁকেই আপাতত মুখ্যমন্ত্রী পদে রেখে দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ তাঁদের এই সিদ্ধান্ত দলের অন্য প্রথম সারির নেতাদেরও জানিয়ে দিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা নাগপুর-ঘনিষ্ঠ নিতিন গডকড়ীকে প্রধানমন্ত্রী আজ জয়পুরে পাঠান বসুন্ধরা রাজের সঙ্গে কথা বলতে। নিতিনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠকে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী আত্মপক্ষ সমর্থনে জানান, ললিত মোদী ও তাঁর স্ত্রী মিনালের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তাঁর ছেলে দুষ্মন্তের সঙ্গে ললিত মোদীর ব্যবসায়িক সম্পর্কও ছিল। কিন্তু সরকারি প্রভাব তিনি খাটাননি। বসুন্ধরার সঙ্গে বৈঠকের পর গডকড়ী কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। এবং তার পর জয়পুরেই সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি বসুন্ধরাকে ক্লিনচিট দেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই অরুণ জেটলি ও রাজনাথ সিংহ যৌথ সাংবাদিক বৈঠক করেন। সেই সাংবাদিক বৈঠকে সুষমাকে যথেষ্ট সমর্থন করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আমেরিকা থেকে বসুন্ধরা রাজেকেও সমর্থন জানান অরুণ জেটলি।
প্রধানমন্ত্রী নিজে মুখ না খুললেও দলের দুই নেত্রীর পাশে যে ভাবে দাঁড়িয়েছেন, তা দেখে বিরোধী শিবিরের বক্তব্য, এতে মোদী-সরকারের লাভের চেয়ে লোকসান বেশি হচ্ছে। মোদী প্রথমেই সুষমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তাঁর ভাবমূর্তি অনেক বেশি উজ্জ্বল হতো। তাঁদের বক্তব্য, জহওরলাল নেহরুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণ মেননকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পদ ছাড়তে হয়েছিল। পরে অবশ্য তাঁকে মন্ত্রিসভায় ফিরিয়ে এনেছিলেন নেহরু। এমনকী হালফিলে মনমোহন সিংহের মন্ত্রিসভা থেকেও বাদ পড়তে হয় এ রাজাকে। বিজেপির অন্যতম নেতা রবিশঙ্কর প্রসাদ অবশ্য বলছেন, ‘‘মনমোহন সিংহ জমানার সঙ্গে এই ঘটনা ‘নো ম্যাচ।’ এখানে তো তিলকে তাল করা হচ্ছে!’’ যা শুনে কংগ্রেস নেতা আনন্দ শর্মার বক্তব্য, ‘‘নিতিন গডকড়ী যে ভাবে বসুন্ধরার সমর্থনে এগিয়ে এলেন, তা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক। আর এই ঘটনা থেকে প্রমাণ হয়, ‘ডালকে মে কুছ কালা হ্যায়’! রাহুল গাঁধী ঠিকই বলেছেন, বিষয়টি আসলে সুষমা বা বসুন্ধরায় সীমিত নয়। এখানে আসলে এক মোদী আরেক মোদীকে বাঁচাচ্ছেন!’’
সুষমা-বসুন্ধরা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই অবস্থানের পরে আসন্ন বাদল অধিবেশনে সরকারের পক্ষে সংসদ চালানো কঠিন হয়ে গেল বলেই দাবি করছে বিরোধীরা। কংগ্রেস নেতারা তো সাফ বলে দিয়েছেন, ‘‘বাদল অধিবেশন আমরা চলতেই দেব না।’’ সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, ‘‘এ বার সংসদে দুর্নীতি প্রশ্নে বিজেপি বিরোধী সব দল একজোট হয়ে যাবে।’’ এবং সে ক্ষেত্রে জমি বিল, জিএসটি-সহ অন্যান্য বিলগুলি বিশ বাঁও জলে চলে যাবে বলে আশঙ্কা রয়েছে সরকার পক্ষের একাংশের। নরেন্দ্র মোদী ও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব অবশ্য মনে করছেন রাজপথে যোগব্যায়াম করে এই সরকার চমকে দিয়েছে দেশের মানুষকে। একই সঙ্গে গোটা বিশ্ব ভারতের উজ্জ্বল ভাবমূর্তিও তুলে ধরা গিয়েছে। এবং তার ফলে সুষমা-বসুন্ধরা কাণ্ডে যে ভাবে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দুর্বল হতে শুরু করেছিল, আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের সাফল্য দিয়ে তা অনেকটাই ঠেকানো গিয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী এখনই সুষমা স্বরাজকে না সরালেও অদূর ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভার রদবদল করে তাঁকে ‘বিগ ফোরে’র বাইরে নিয়ে গিয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ দফতর দিতেও পারেন। সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকেই। তাঁদের বক্তব্য, সেটা হবে নরেন্দ্র মোদীর ‘প্ল্যান বি।’ বিরোধীরা এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত কতটা আক্রমণাত্মক হয়, তা দেখার জন্য তিনি অপেক্ষা করবেন। এ বিষয়ে আর কোনও নতুন তথ্য ফাঁস হয় কিনা, সে দিকেও নজর রাখতে হবে। একই ভাবে, পরিস্থিতি তেমন জটিল হয়ে পড়লে প্রয়োজনে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রীকেও বদলানো হবে। বসুন্ধরা রাজেকে সরানোর জন্য রাজস্থান বিজেপির বেশ কিছু নেতা অনেক দিন ধরেই সক্রিয়। আরএসএস নেতৃত্ব বরাবরই বসুন্ধরা-বিরোধী। কিন্তু বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ নিজে আবার বসুন্ধরার পক্ষে। এবং তিনি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতকে তা জানিয়েও দিয়েছেন। একই সঙ্গে বুঝিয়ে দিয়েছেন, সরকার ও দল পরিচালনার ব্যাপারে এখনও নরেন্দ্র মোদীই শেষ কথা। পরিস্থিতি বুঝে মোহন ভাগবতও এখনই মোদীর উপরে কোনও রকম চাপ তৈরি করতে চাইছেন না। উল্টে তিনি রাজস্থানের আরএসএস নেতাদের শান্ত থাকতেই অনুরোধ করেছেন।
আপাতত মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত, দলের সাহসী মুখ তুলে ধরতে হবে। সেটাই বিজেপির প্রাথমিক রণকৌশল। এক-এক করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের নির্দেশ দেওয়া হবে বিভিন্ন শহরে গিয়ে দুই নেত্রীর হয়ে সওয়াল করার জন্য। যার পরেই মুখ খুলে কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী সদানন্দ গৌড়া বলেছেন, ‘‘ললিত মোদীকে সহায়তা করে বিদেশমন্ত্রী অন্যায় কাজ করেননি। মানবিকতার কারণে তিনি সাহায্য করেছেন। একজন ক্যান্সারে আক্রান্ত। তাঁর সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। তাই সুষমা ‘ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট’ পেতে সাহায্য করেছিলেন। এর মধ্যে দুর্নীতি কোথায়?’’ আর জেটলির কথায়, ‘‘বসুন্ধরার পুত্র দুষ্মন্তের সঙ্গে ললিতের লেনদেন ব্যক্তিগত। এত দিনের পুরানো লেনদেন নিয়ে সরকার এখন কী করবে?’’
প্রশ্ন কিন্তু উঠছে। বিজেপি যখন রবার্ট বঢড়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল, তখন চিদম্বরম বলেছিলেন, এটি দুই ব্যক্তির মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেন। তখন বিজেপি নেতৃত্ব এ নিয়ে বিস্তর হইচই করেছিলেন।
এখন কংগ্রেস কি ছেড়ে দেবে বিজেপিকে?