ভক্তকুলের সেলফি-দাবি সাধারণত হাসিমুখেই মেনে নেন অমিতাভ। ছবি: ফেসবুকের সৌজন্যে
বাড়িতে-পার্টিতে-অফিসে-ট্রেনে-বাসে— বাদ যাচ্ছে না কোথাওই। যে দিকে তাকান, এক হাত বাড়িয়ে হাসিমুখে পোজ দিতে ব্যস্ত ওঁরা। হাতে ধরা স্মার্টফোন। চলছে নিজস্বী তোলা!
কখনও আবার সে ছবিকে আরও নিখুঁত করে তুলতে ফোন রেখে দেওয়া সেলফি-স্টিকে। কেল্লা ফতে। ছবি এ বার ছড়িয়ে পড়বে ফেসুবক থেকে টুইটার। লাইকের বন্যা! ছবি তুলতে গিয়ে প্রাণ যায় যাক, কুছ পরোয়া নেহি। তাই রেললাইনের ধার হোক, জলের বেমক্কা স্রোতের মুখে হোক, বা উঁচু পাহাড়ের ঢাল হোক— নিজস্বী প্রেমীরা তোয়াক্কা করছেন না। এই প্রবণতা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারছেন, এমন লোকের সংখ্যা এখন হাতে গোনা।
কিন্তু এই প্রবণতা যে কত বড় বিপদ ডেকে আনছে, একটি পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট। ২০১৪ সাল থেকে এখন অবধি নিজস্বী তুলতে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনায় ভারতই শীর্ষে। সান ফ্রান্সিসকোর একটি সংস্থা এই সমীক্ষা করে জানিয়েছে, সারা পৃথিবীতে এখনও পর্যন্ত মোট ৪৯ জন নিজস্বী তুলতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। তার মধ্যে ভারতে মৃত্যু হয়েছে ১৯ জনের। সংখ্যাটা দেখে চিন্তায় মুম্বই প্রশাসন। তাই শহরের ১৬টি অঞ্চলকে ‘নো সেলফি জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এ মাসের গোড়াতেই পুণের একটি কলেজের ১৩ জন পড়ুয়া নিজস্বী তুলতে গিয়ে ভেসে যায় স্রোতের মুখে। প্রত্যেকের বয়স ২০-র আশপাশে। মহারাষ্ট্রের রায়গড় জেলার মুরুদ সৈকতে ঘটনাটি ঘটেছিল। পুলিশ জানিয়েছিল, পিকনিক করতে আসা ওই পড়ুয়ারা সতর্কতা উপেক্ষা করে জোয়ারের সময় এগিয়ে গিয়েছিল নিজস্বী তুলতে। তার পরেই ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। একই ভাবে এ মাসেই নাসিকে একটি বাঁধের কাছে উঁচু পাথরের উপরে উঠে নিজস্বী তুলতে যায় বছর আঠারোর এক কলেজ ছাত্র। জলে পড়ে তলিয়ে যায় সে। তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে ডুবে যায় বন্ধুও।
গত মাসে বান্দ্রা ব্যান্ডস্ট্যান্ড ফোর্টে একই ভাবে নিজের ছবি তুলতে গিয়ে সমুদ্রে পড়ে যান এক অষ্টাদশী। তামিলনাড়ুতে কোলি হিলস-এর কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্র বন্ধুদের সঙ্গে নিজস্বী তুলতে গিয়ে মারাত্মক জখম হন। গত বছর আগরার কাছে আবার ২০-২২ বছরের তিন পড়ুয়া রেললাইনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল নিজস্বী তোলার জন্য। ছবি তোলায় মগ্ন থাকায় তাঁরা খেয়ালই করেননি যে ওই লাইন বরাবরই তখন ধেয়ে আসছে ট্রেন।
বিভিন্ন জায়গায় এই সব ঘটনার কথা মাথায় রেখে মুম্বই পুলিশ জানিয়েছে, আপাত ভাবে যে সব জায়গায় ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে হয়, সেগুলো চিহ্নিত করে নিজস্বীতে নিষেধাজ্ঞা চালু করা হচ্ছে। বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে রেলিং নেই এমন সব উপকূলবর্তী এলাকায়। ওই রকম জায়গায় ঢোকার চেষ্টা করলেই জরিমানা ১২০০ টাকা। ছবি তোলা তো পরের কথা। এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে শহর জুড়ে প্রচার চালানো হবে।
মুম্বইয়ের মনোবিদ কীর্তি সচদেব বলছেন, নিজস্বী তোলার হিড়িক এত দ্রুত কমে যাবে, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। এ যুগে মানুষ এতটাই নিঃসঙ্গ যে এই সব উপায়ে নিজের গুরুত্ব বুঝতে চান। তবে বয়ঃসন্ধিতে এই প্রবণতা বেশি। সমাজে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর তাগিদ থেকেই এমনটা হয় বলে মনে করছেন তিনি।
চানঘরে নিজস্বী
নিজস্বী তোলার হিড়িকে যোগ হল বাথরুমও। নিজের ব্লগে অমিতাভ বচ্চন জানিয়েছেন, বাথরুমে দাঁড়িয়েই তাঁর সঙ্গে নিজস্বী তুলতে চেয়েছিলেন এক ভক্ত। এই ঘটনায় অত্যন্ত বিব্রত অমিতাভ সেই ভক্তকে কাণ্ডজ্ঞানহীন বলতেও ছাড়েননি। বলেছেন, কিছুতেই বুঝতে পারছেন না, ওই ব্যক্তি কী ভাবে ভাবলেন ও রকম প্রস্তাবে রাজি হবেন অমিতাভ!