প্রধানমন্ত্রীর দফতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৈঠক চলছে। অর্থ মন্ত্রকের তিনটি প্রধান দফতরের যুগ্মসচিবরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সামনে তুলে ধরছেন অর্থনীতির চ্যালেঞ্জগুলির কথা। কেন রাজকোষ ঘাটতি বাড়ছে, সরকারি আয় বাড়াতে কোথায় সমস্যা হচ্ছে, তা মন দিয়ে শুনছেন প্রধানমন্ত্রী।
ঘটনা গত কালের। আর তার সূত্রেই নর্থ ও সাউথ ব্লকে গুঞ্জন, মনমোহন সিংহের জমানাতেও বাজেটের আগে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এত দীর্ঘ বৈঠক দেখা যায়নি। এমন নয় যে, অরুণ জেটলির বাজেটে নাক গলাচ্ছেন মোদী। বাজেটের বিষয়ে তিনি অর্থমন্ত্রীকে পুরো স্বাধীনতাই দিয়ে রেখেছেন। কিন্তু প্রথম বাজেটের আগে প্রধানমন্ত্রীকে সরকারের আর্থিক নীতি নিয়ে মাথা ঘামাতেই হচ্ছে। কারণ, অর্থনীতির যাবতীয় সূচক বলছে, মোদী সরকারের সামনে এখন কঠিন পরীক্ষা। অথচ বিপুল ভোটে জিতে আসা নরেন্দ্র মোদী ও তাঁর সরকারের কাছে বিরাট প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে মানুষের মনে। সেই প্রত্যাশা পূরণে ১০ জুলাই অরুণ জেটলি যে বাজেট পেশ করবেন, তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সকলে। এই বাজেটই হতে চলেছে মোদী সরকারের প্রথম ‘হাতেকলমে পরীক্ষা’।
অর্থ মন্ত্রকের এক কর্তা বলেন, “এটা নরেন্দ্র মোদীর সরকারের প্রথম বাজেট। একে জেটলির বাজেট বলে ধরে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেন না। প্রণব মুখোপাধ্যায় অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন বাজেটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিংহের ভূমিকা খুবই কম থাকত। এখন পরিস্থিতি অনেকটা নরসিংহ রাও জমানার মতো, যখন মনমোহন ছিলেন অর্থমন্ত্রী।” জেটলির বাজেটে আসলে তাই নরেন্দ্র মোদীর চিন্তাভাবনাই ফুটে উঠবে বলে অর্থ মন্ত্রকের কর্তাদের দাবি।
প্রধানমন্ত্রী আগেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর সরকার দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ শিকেয় তুলে জনমোহিনী নীতি নেওয়ার পথে হাঁটবে না। অর্থনীতির হাল শোধরাতে তেতো ওষুধ দিতেও পিছপা হবেন না তিনি। মঙ্গলবার সন্ধেয় এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী জেটলিও সে কথাই বলেছেন। তাঁর সাবধানবাণী, আর্থিক বৃদ্ধির হার যেখানে মাত্র ৫ শতাংশ এবং মূল্যবৃদ্ধি ও রাজকোষ ঘাটতি, দুটিই যথেষ্ট বেশি, সেখানে সব কিছু ভুলে জনমোহিনী নীতি নেওয়া সম্ভব নয়। জেটলি বলেন, “জনমোহিনী নীতি এমন একটা ফাঁদ, যেখান থেকে বের হওয়া খুব কঠিন।” অর্থমন্ত্রীর ব্যাখ্যা, সব ভুলে জনমোহিনী নীতির পিছনে অর্থ ঢাললে রাজকোষে চাপ বাড়বে। অর্থমন্ত্রীকে বেশি হারে কর চাপাতে হবে। ফলে মানুষের হাতে খরচ করার জন্য অর্থ কম থাকবে। তাতে কোনও লাভ হয় না। ইরাকে সমস্যার ফলে তেলের দাম বৃদ্ধি এবং অনাবৃষ্টি যে তাঁর চিন্তা বাড়িয়েছে, সে কথাও মেনে নিয়েছেন জেটলি।
অর্থ মন্ত্রকের কর্তাদের ব্যাখ্যা, অর্থমন্ত্রীকে উন্নয়ন খাতে ব্যয়বরাদ্দ সামান্য হলেও বাড়াতেই হবে। গরিবি হঠাও থেকে শহরের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার মতো যে সব পরিকল্পনার কথা মোদী সরকার ঘোষণা করেছে, তাতে বিপুল অর্থ প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পে খুব বেশি বরাদ্দ বাড়াতে গেলে রাজকোষ ঘাটতি লাগামের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা। স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার আর্থিক গবেষণা বিভাগের রিপোর্টে অনুমান, বাজেটে রাজকোষ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ৪.৪ শতাংশ রাখা হতে পারে। অর্থ মন্ত্রক সূত্রের ইঙ্গিত, খরার আশঙ্কা থাকায় খাদ্যে ভর্তুকি কমানো কঠিন হলেও তেলের উপর ভর্তুকি কমানোর দিকে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বাজেটে। কমানো হবে অপ্রয়োজনীয় খরচ। পি চিদম্বরম অন্তর্বর্তী বাজেটে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার বিলগ্নিকরণ থেকে ৩৬ হাজার কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছিলেন। জেটলি সেই লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়াতে পারেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঙ্গলবারের বৈঠকে অর্থ মন্ত্রকের রাজস্ব, ব্যয় ও অর্থ বিষয়ক দফতরের যুগ্মসচিবরা হাজির ছিলেন। প্রতিটি বিষয়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে ‘পাওয়ার-পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন’ দেখানো হয়। কর সংক্রান্ত নীতিও ব্যাখ্যা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর দফতরে বৈঠকের পরে অর্থ মন্ত্রকের কর্তারা মনে করছেন, অরুণ জেটলির বাজেটে এমন কিছু থাকবে না, যা নরেন্দ্র
মোদী চান না বা তাঁর পছন্দ নয়। মনমোহন জমানায় প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাজেটে কর সংক্রান্ত কড়া সিদ্ধান্ত লগ্নিকারী ও শিল্পপতিদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছিল। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে চান। আবার আম জনতার মন ভোলাতে খয়রাতির নীতিও নিতে চান না। বাজেটে সেই ভাবনারই প্রতিচ্ছবি দেখা যাবে বলে মনে করছেন অর্থ মন্ত্রকের কর্তারা।