১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল বিষয়টা! চিনি-পরা এনেছিলেন পুলিশকর্তাদের বশে আনার জন্য। এখন সেই চিনি-পরাই তাঁকে বিপাকে ফেলেছে। যে থানায় বসে মামলা লিপিবদ্ধ করছিলেন এত দিন, সেখানেই তিনি এখন বন্দি।
চিনি-পরা খাইয়ে পুলিশকর্তাদের বশে আনার চেষ্টা করেছিলেন হোমগার্ড মদন গুপ্ত। তৃতীয়পক্ষকে ধরে ছুটে গিয়েছিলেন বাঁশকান্দিতে। সেখানকার লিয়াকত আলি ‘মোল্লা লিয়াকত’ নামে পরিচিত। জল-পরা, তেল-পরা নয়, তিনি দেন চিনি-পরা। কাউকে তার মন্ত্রপূত চিনি খাইয়ে দিলেই বশে চলে আসেন ওই ব্যক্তি, এমনই দাবি তাঁর।
মদনও তাঁর কাছ থেকে চিনি-পরা নিয়ে এসেছিলেন। এক বার পুলিশ কর্তাদের খাইয়ে দিলেই হল! কিন্তু এখন খোদ লিয়াকত আলি সঙ্গে থেকেও তাঁকে উদ্ধার করতে পারছেন না। রেহাই পাননি লিয়াকতও।
আদালত দু’জনকেই দু’দিন পুলিশ হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিয়েছে। একই মামলায় ধৃত আরও তিন জনকে জেল-হাজতে পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বাপন লস্কর পেশায় টিভি মেকানিক। তিনিই মোল্লা লিয়াকতের খোঁজ দিয়েছিলেন মদনকে। লোহিত পাল হোমগার্ড হলেও, তাঁর কাজ ছিল টাউন দারোগা নিপু কলিতার জন্য রান্নাবান্না করা। সতীশ সাহনির শিলচর সদর থানার সামনে পানের দোকান। তাঁর দোকান থেকেই পান খান টাউন দারোগা-সহ অন্যান্য পুলিশ কর্তারা।
পুলিশ সুপার রজবীর সিংহ জানান, মদনের প্রস্তাবে সায় দিয়ে লোহিত-সতীশ সেই চিনি রেখে দিয়েছিলেন। সুযোগ পেলেই তা পান বা অন্য কিছুতে মিশিয়ে খাইয়ে দিতেন। তাই ষড়যন্ত্রের শরিক তাঁরাও। চিনি-পরায় শুধুই চিনি রয়েছে বলে ধৃতরা জানালেও পুলিশ সুপারের সন্দেহ, তাতে বিষও মেশানো হতে পারে। তাই এখন সেই চিনি পাঠানো হবে ফরেন্সিক ল্যাবরেটরিতে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধৃতদের বিরুদ্ধে খুনের ষড়যন্ত্রেরই অভিযোগ আনা হয়েছে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তথ্য গোপন করা-সহ আরও কিছু অভিযোগ।
রজবীরবাবু জানান, হোমগার্ড কর্তৃপক্ষকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে। মদনের ব্যাপারে বিস্তারিত খোঁজ করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার বলেন, হোমগার্ড মদন নানা ধরনের অসামাজিক কাজকর্মে জড়িত। শহরের গুন্ডা-মস্তানদের সঙ্গে তাঁর ওঠা-বসা। পুলিশের বিভিন্ন অভিযানের কথা আগেভাগে ফাঁস করে দিতেন।
পুলিশকর্তার কথায়, ‘‘পুলিশকর্তারা এখন কারও কথায় সহজে বিশ্বাস করেন না। আগে অনেক বার বিভিন্ন অফিসারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে মদন এক দিকে তাঁদের শাস্তির মুখে ঠেলতেন। অন্য দিকে নিজে কর্তৃপক্ষের কাছাকাছি গিয়ে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নিতেন। কিন্তু কয়েক দিন ধরে কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাতে গিয়ে উল্টো গালিগালাজ শুনতে হচ্ছিল তাঁকে। সে জন্য বাড়তি রোজগারের জায়গাটাও ক্রমে সঙ্কুচিত হচ্ছিল।’’
তদন্তকারীদের বক্তব্য, সে জন্যই মদন পুলিশকর্তাদের বশে আনতে ঝাড়ফুঁকের শরণ নেন। বাপনের পরামর্শে মোল্লা লিয়াকতের কাছ থেকে চিনি-পরা এনে লোহিত এবং সতীশকে দিলেও বিপাকে পড়ে যান তৃতীয় এক জনকে দিতে গিয়ে।
গত কাল পুলিশেরই এক সূত্র জানিয়েছিলেন, এসপি-কে বশে আনতে মদন চিনি-পরা দিয়েছিলেন তাঁর অফিসের এক মহিলা কর্মীকে। কিন্তু রজবীরবাবু আজ জানান, তাঁকে কখনও নিশানা করা হয়নি। তবে এটা সত্যি, লোহিত-সতীশের মত তৃতীয় একজনকে ওই চিনি দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি ষড়য়ন্ত্রমূলক, তা বুঝতে পেরে এক পুলিশকর্তাকে তা জানিয়ে দিয়েছিলেন ওই তৃতীয় ব্যক্তি। তাঁর নাম প্রকাশে রাজি নন পুলিস সুপার।
কিন্তু একজন হোমগার্ড কী করে এত দিন ধরে লাগাতার সদর থানার টাউন ব্রাঞ্চে কাজ করলেন? রজবীরবাবুর জবাব, তিনি এই জেলায় এসপি-এএসপি হওয়ার আগে থেকে মদন গুপ্ত কাজ করছিল। তিনি এসে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পেয়ে অন্যত্র সরিয়ে নেন। পরে মদন সমস্ত দোষ স্বীকার করে এমনটা আর হবে না বলে মুচলেকা দিয়েছেন। তিনিও তখন সরল বিশ্বাসে তাকে পুরনো জায়গায় ফিরিয়ে নেন।
লিয়াকতের ব্যাপারে পুলিশ সুপার জানান, তাঁর কাছে চিনি-পরার চিনিতে কী কী মেশানো হয়, তা জানতে চাইছেন। ওই চিনির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও জানার চেষ্টা হচ্ছে।
আইপিএস অফিসার রজবীর সিংহ যে ঝাড়ফুঁকে এক শতাংশও বিশ্বাস করেন না, তা জোরগলায় জানান। সঙ্গেও এও খোলসা করেন, তবে মদনদের বিরুদ্ধে কেন এত কঠোর হলেন। পুলিশ সুপার বলেন, ‘‘পুলিশকর্তাদের বশে আনার যে মানসিকতা তাঁর মধ্যে কাজ করেছে, তা বিপজ্জনক। ওই চিনিতে রাসায়নিক পদার্থ মিশিয়ে হত্যারও চেষ্টা করা যেতে পারে। বাকিরা সব জেনেও গোপন রাখা এবং তাতে সায় প্রকাশের জন্য কম দোষী নয়।’’
থানা-পুলিশ, আইন-আদালত বিষয়টিকে যে ভাবেই দেখুক, পুলিশকে চিনি-পরা দিতে গিয়ে হোমগার্ডের গ্রেফতার সাধারণ মানুষের কাছে মজার খোরাক জুগিয়েছে।