মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ফাইল চিত্র।
এক জন এসেছেন আরব সাগরের উপকূল থেকে। অন্য জনের সাকিন বঙ্গোপসাগরের উপকূলের কাছাকাছি। নিজের জেলায় প্রথম জনের ফ্রন্ট জয় পেয়েছে ১৪-০। দ্বিতীয় জনের জেলায় তাঁর দল জয়ী হয়েছে ১৬-০!
বিগত বিধানসভার বিরোধী দলনেতা থেকে পরিবর্তনের পরে কেরল ও পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন ভাদাসেরি দামোদর মেনন সতীশন এবং শুভেন্দু অধিকারী। সচরাচর এক বিধানসভার বিরোধী দলনেতা থেকে পরবর্তী বিধানসভায় সরকার পক্ষের পরিষদীয় নেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার নজির বিশেষ নেই। দক্ষিণ ও পূর্ব ভারতের দুই রাজ্যে অনেকটা একই রকম পথ পেরিয়ে এসেছেন কংগ্রেস ও বিজেপির নতুন সরকারের দুই মুখ্যমন্ত্রী।
পেশায় আইনজীবী সতীশনের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার রাস্তা মসৃণ ছিল না। ভোটের আগেও নয়, পরেও নয়। তবে পিনারাই বিজয়নের এলডিএফ সরকারের বিরুদ্ধে বিধানসভার ভিতরে ও বাইরে লড়াকু নেতা হিসেবে কংগ্রেস এবং ইউডিএফের নিচু তলার কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে প্রবল জনপ্রিয় ছিলেন সতীশন। সেই কারণেই বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পরে কেরলের কংগ্রেস বিধায়কদের অধিকাংশ এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেণুগোপালকে মুখ্যমন্ত্রী করার পক্ষে মত দিলেও রাজ্য থেকে দলের বহু নেতা-কর্মী রাহুল গান্ধীকে মেল পাঠিয়েছিলেন সতীশনের জন্য। ইউডিএফের শরিকেরাও তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত পারাভুরের বিধায়ক সতীশনকেই বেছে নিয়েছে কংগ্রেস হাই কম্যান্ড।
একই ভাবে ২০২১ সালে পর্যুদস্ত হওয়ার পরে বঙ্গে বিজেপির গত পাঁচ বছরের লড়াইয়ে সামনের সারিতে ছিলেন শুভেন্দু। বিধানসভার মধ্যে পাঁচ বার নিলম্বিত (সাসপেন্ড) হয়েছেন, যা কোনও বিরোধী দলনেতাকে হতে হয়নি! বিধানসভার বাইরেও জেলায় জেলায় দৌড়ে দলকে ঘুরে দাঁড় করানোর লড়াইয়ের প্রধান মুখ ছিলেন তিনি। তার পরে বিধানসভা নির্বাচনে একই সঙ্গে নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর থেকে প্রার্থী হয়ে জোড়া কেন্দ্র থেকেই জিতেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের ঘাঁটি ভবানীপুরে তাঁকে হারিয়ে ‘প্রাক্তন’ করেছেন। পরপর দু’বার দু’টি আলাদা কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রীকে কেউ হারিয়ে দিচ্ছেন, এই কৃতিত্ব শুভেন্দু ছাড়া কারও নেই! এর পরে মুখ্যমন্ত্রীর আসন তাঁর হাতে তুলে দেওয়া বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে প্রায় অবধারিতই ছিল। এই ক্ষেত্রে সতীশনের চেয়ে এগিয়েই গিয়েছেন শুভেন্দু।
নিজের জয়ের পাশাপাশি শুভেন্দুর জেলা পূর্ব মেদিনীপুরে সব বিধানসভা আসনে বিজেপি জিতেছে এ বার। আর মধ্য কেরলের এর্নাকুলম জেলার সব আসনে জয়ী হয়েছে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ। মুখ্যমন্ত্রী সতীশন তাঁর নতুন মন্ত্রিসভায় নিজের জেলা এর্নাকুলম থেকে আরও তিন সদস্য এনেছেন। কংগ্রেসের রোজ়ি জন যুব কল্যাণ ও দক্ষতা উন্নয়ন, কেরল কংগ্রেস ( জেকব)-এর অনুপ জেকব খাদ্য ও সরবরাহ এবং ক্রেতা সুরক্ষা, মুসলিম লিগের আব্দুল গফুর শিল্প ও ওয়াকফ দফতরের মন্ত্রী হয়েছেন। বাংলায় শুভেন্দুর মন্ত্রিসভাতেও পূর্ব মেদিনীপুর থেকে এক জন পূর্ণ ও তিন জন প্রতিমন্ত্রী মিলে মোট চার জন জায়গা পেয়েছেন।
সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পরে পদক্ষেপেও অদ্ভুত মিল দুই মুখ্যমন্ত্রীর! পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যসচিব করা হয়েছে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার সময়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (সিইও) মনোজ আগরওয়ালকে। একই ভাবে কেরলে এসআইআর-এর দায়িত্ব পালনকারী সিইও রতন ইউ কেলকরকে মুখ্যমন্ত্রীর সচিব করা হয়েছে। দুই মুখ্যমন্ত্রীই দুই আইএএস-এর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। এবং দুই মুখ্যমন্ত্রীকেই মাথায় রাখতে হচ্ছে নিজেদের রাজ্যের বেহাল কোষাগারের কথা। দু’জনেই দিল্লি গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা করেছেন।
শুভেন্দু বলছেন, ‘‘দুর্নীতি-মুক্ত প্রশাসন ও ভয়মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য। কাটমানি, সিন্ডিকেট-রাজ, দালাল-চক্র, এ সব আর চলবে না। নজরদারির ব্যবস্থা থাকবে।’’ সতীশনও বলছেন, ‘‘দুর্নীতি এবং গা-জোয়ারির বাইরে গিয়ে উন্নয়নের কাজ করবে নতুন সরকার।’’ বিপরীতমুখী দুই দলের এই দুই মুখ্যমন্ত্রীর দেখা হয়ে যেতে পারে দিল্লিতে নীতি আয়োগের আসন্ন বৈঠকে!
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে