তাই চি ওয়াকিং কী, এতেই কমবে মেদ, বাড়বে আয়ুও। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
হাঁটা ভাল না ধ্যান করা? হাঁটতে হাঁটতে যদি ধ্যান করেন? অথবা ধ্যানমগ্ন হয়ে হাঁটেন? তাই কখনও হয় নাকি! হাঁটা মানে চলমানতা, আর ধ্যান মানে নিবিষ্ট চিত্তে বসে মনের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা। দু’টি বিষয় কি এক? এক নয় অবশ্যই, তবে মিলিয়ে দিলে ক্ষতি কী! এই মিলমিশের কাজটি করেছেন চিনা প্রশিক্ষকেরা। সে বহু বছর আগেই। চিনা মার্শাল আর্টের এক বিশেষ পদ্ধতি হল ‘চলমান ধ্যান’, বা বলা ভাল ধ্যানমগ্ন হয়ে হাঁটা। গোটা বিশ্ব এখন সে পদ্ধতিকেই চেনে ‘তাই চি ওয়াকিং’ নামে। চিনা সেনাদের আত্মরক্ষা ও শারীরিক প্রশিক্ষণের একটি অংশ হল তাই চি। সেটি কিছু বিশেষ জটিল ব্যায়ামের সমষ্টি। তবে ‘তাই চি ওয়াকিং’ তার চেয়ে খানিক আলাদা। এখানে ব্যায়াম করতে হয় না। শুধু হাঁটতে হয়। সে সঙ্গেও মনঃসংযোগও করতে হয়।
বিশ্ব জুড়েই আলোচনায় ‘তাই চি ওয়াকিং’। চিনের সুপ্রাচীন এই শারীরচর্চার পদ্ধতি নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে। আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, ভারতের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কম্পলিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেল্থ-সহ আরও অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা সংস্থা তাই চি ওয়াকিং নিয়ে গবেষণা করছে। গবেষকেরা দাবি করেছেন, হাঁটার এই বিশেষ পদ্ধতিতে কোনও শারীরিক পরিশ্রম হয় না। কেবল মনঃসংযোগের প্রয়োজন হয়। তাই একে ‘মুভিং মেডিটেশন’ বলা হয়।
ঠিক কেমন তাই চি ওয়াকিং?
৫ হাজার বছরের প্রাচীন পদ্ধতিতে রয়েছে দীর্ঘায়ু হওয়ার গোপন সূত্র
তাই চি-র অর্থ, শরীরের সমস্ত শক্তিকে ব্যবহার করার ভঙ্গি। চিনা মার্শাল আর্টে 'তাই চি চুয়ান'-এর এক বিশেষ ভঙ্গিমা। এর শিকড় 'চি গং' নামক এক প্রাচীন শক্তি অনুশীলনের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে এর পদ্ধতিতে অনেক বদল আনা হয়েছে। ১৬৭০ সালের দিকে তাই চি ওয়াকিং এখনকার সময়ের উপযোগী করে অভ্যাস করানো হয়।
দশ মিনিটের ধ্যান মনকে শান্ত করতে পারে। কিন্তু ব্যস্ত জীবনে শরীর, মনের জন্য আলাদা করে সময় বার করতে পারেন না অনেকেই। সে সমস্যার সহজ সমাধান তাই চি ওয়াকিং। প্রাচীন চিনে আত্মরক্ষা ও শারীরিক প্রশিক্ষণের জন্য তা ব্যবহৃত হত। পরবর্তীতে বিভিন্ন রোগ নিরাময় ও আয়ু বৃদ্ধিতে এর প্রয়োগ করা হতে থাকে। গবেষণা বলে, তাই চি ওয়াকিং নিয়ম মেনে করলে নীরোগ শরীরে বাঁচা যায়। এতে দীর্ঘায়ু হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি।
তাই চি-র নিয়মকানুন
তাই চি-র জন্য জরুরি শান্ত পরিবেশ আর হালকা পোশাক। খালি পায়ে তাই চি অভ্যাস করা ভাল। তাই চি ওয়াকিংয়ের কিছু নিয়ম আছে। সেটি সাধারণ হাঁটার মতো নয়।
তাই চি হাঁটতে হয় নিয়ম মেনে।
প্রথমে শরীর সোজা রেখে গভীর ভাবে শ্বাস নিতে ও ছাড়তে হবে। দুই হাত শরীরের দু’পাশে থাকবে। কাঁধ আলগা রাখতে হবে। শরীরে কোনও প্রকার চাপ দিলে হবে না।
আরামদায়ক অবস্থায় পৌঁছোলে ও মন স্থির হলে প্রথমে যে কোনও এক পা সামনে বাড়িয়ে দিতে হবে। তা করতে হবে খুব ধীর গতিতে। যদি ডান পা বাড়িয়ে দেন, তা হলে প্রথমে ডান পায়ের গোড়ালি মাটি স্পর্শ করবে, পুরো পায়ের পাতা নয়। শরীরের ওজন হালকা করে গোড়ালির উপর দিতে হবে।
তার পর সম্পূর্ণ পায়ের পাতা মাটি স্পর্শ করবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, শরীরের সম্পূর্ণ ওজন যেন পায়ের উপর না পড়ে। স্বাভাবিক ভাবে হাঁটার সময়ে দুই পায়ের উপরেই শরীরের পুরো ভর দেওয়া হয়। কিন্তু তাই চি আলাদা। যে পা এগিয়ে দিচ্ছেন সে পায়ের উপর ভর দেওয়া যাবে না।
এর পর সে ভঙ্গিমায় কিছু ক্ষণ থেকে আবার একই ভাবে বাঁ পা বাড়িয়ে দিন। প্রথমে গোড়ালি মাটি স্পর্শ করবে, তার পর পায়ের পাতা।
গবেষকেরা জানাচ্ছেন, ধীরগতিতে এক পা, এক পা করে হাঁটতে হবে। এ ক্ষেত্রে শরীরের ভর যেহেতু পায়ের উপর সবটা পড়ছে না, তাই সেই ভর অভিকর্ষজ বলের ক্রিয়ায় উপরের দিকে ঠেলে উঠবে। আর এ পদ্ধতিতেই শরীরের সমস্ত কলকব্জা সক্রিয় হয়ে উঠবে। রক্তসঞ্চালনের গতি বাড়বে, হার্ট সঠিক ভাবে কাজ করবে, স্নায়ুর কার্যক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়ে। স্নায়ু মারফত তরঙ্গ মস্তিষ্কে পৌঁছবে এবং সেখানকার কোষ-স্নায়ুগুলিকেও সক্রিয় করে তুলবে। তাই চি ওয়াকিং করলে মানসিক চাপ তো কমেই, ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিনাশের ঝুঁকিও কমে।
তাই চি ওয়াকিং শুধু হাঁটার কোনও পদ্ধতি নয়, এটি রোগ নিরাময়ের উপযোগী এক বিশেষ চিকিৎসাপদ্ধতিও। জটিল কোনও রোগ সারাতে এর প্রয়োগ প্রাচীনকালেও হত। বয়সের কারণে যাঁদের পা কাঁপে, ভারসাম্য বজায় রাখতে সমস্যা হয় এবং পড়ে গিয়ে হাড় ভাঙার ভয় থাকে, তাঁদের জন্য তাই চি ওয়াকিং আদর্শ। স্ট্রোকের পর শরীরের পুনর্গঠন করতে বা অ্যালঝাইমার্স অথবা পারকিনসন্সের মতো রোগে আক্রান্ত রোগীদের স্নায়ু ও পেশির সমন্বয় ফেরাতে চিকিৎসকেরা তাই চি ওয়াকিংয়ের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।