জাহাঙ্গির খান। —ফাইল চিত্র।
অবশেষে গ্রেফতার জাহাঙ্গির খান। সূত্র মারফত জানা গিয়েছে, ফলতার এই তৃণমূল নেতাকে নেপাল সীমান্ত থেকে গ্রেফতার করেছে রাজ্য পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ)। পুলিশ সূত্রে খবর, গ্রেফতার করে তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। ওই সূত্র মারফত এ-ও জানা গিয়েছে যে, নেপাল সীমান্ত দিয়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গির। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সেখানে পৌঁছে যান এসটিএফ-এর আধিকারিকেরা। পাকড়াও করা হয় ফলতার পরাজিত তৃণমূল প্রার্থীকে।
গত ২১ মে ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে পুনর্নির্বাচন হয়েছিল। নির্বাচনের ৪৮ ঘণ্টা আগে ভোটের লড়াই থেকে সরে দাঁড়ান জাহাঙ্গির। সাংবাদিক বৈঠক করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল সোনার ফলতার। তাই আমাদের সম্মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী (শুভেন্দু অধিকারী) ফলতার উন্নয়নের জন্য স্পেশ্যাল প্যাকেজ দিচ্ছেন। সেই জন্য আমি ২১ মে যে পুনর্নির্বাচন আছে, সেই লড়াই থেকে আমি নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলাম।’’ ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ালেও ইভিএমে তৃণমূলের প্রতীকের পাশে জাহাঙ্গিরের নাম ছিল। গত ২৪ মে নির্বাচনের ফল বেরোলে দেখা যায়, ফলতায় ১ লক্ষ ৯ হাজারেরও বেশি ভোটে জয়ী হয়েছে বিজেপি। ৪০ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে সিপিএম। আর ৭৭৮৩টি ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে নির্বাচনী দৌড় শেষ করেন জাহাঙ্গির। ভোটের ফলপ্রকাশের পর থেকেই কার্যত বেপাত্তা ছিলেন তিনি। বাড়ি বা দলীয় কার্যালয়, কোথাও তাঁকে দেখা যায়নি।
২০১৯ সালে জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছিল। সেই মামলায় রক্ষাকবচ পান অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ফলতার ওই তৃণমূল নেতা। এর পাশাপাশি, ফলতা বিধানসভার পুনর্নির্বাচনের আগে হাই কোর্ট থেকে আর একটি রক্ষাকবচ পেয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির। কিন্তু গত ২৬ মে জাহাঙ্গিরকে দেওয়া সমস্ত রক্ষাকবচই প্রত্যাহার করে নেয় কলকাতা হাই কোর্ট। ফলে জাহাঙ্গিরকে গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে আর কোনও আইনি বাধা ছিল না পুলিশের।
গত ২৯ এপ্রিল ছিল রাজ্যের শেষ দফা বিধানসভা ভোট। ওই দিন ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের বেশ কিছু বুথে অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। ইভিএমে আতর, কালি, টেপ লাগানোর মতো অভিযোগ পায় কমিশন। পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন স্বয়ং শুভেন্দু অধিকারী। তৎকালীন বিদায়ী বিরোধী দলনেতা জানান, ফলতার খবর পেয়ে তাঁর মনে হয়েছে কমিশনের উচিত ওই কেন্দ্রে আবার ভোট করানো। ঘটনাক্রমে কমিশন পুনর্নির্বাচনেরই সিদ্ধান্ত নেয়। তার পর ৪ মে বাকি ২৯৩ আসনের ফলঘোষণা হয়ে যায়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে প্রথম বার ক্ষমতা দখল করে বিজেপি।
জাহাঙ্গিরের ‘ঝুকেগা নেহি’ সংলাপ ঘিরে সরগরম হয়েছিল রাজ্য রাজনীতি। ফলতার নির্বাচনের আগে জাহাঙ্গিরের বাড়িতে হানা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ। নেতৃত্বে ছিলেন উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার এবং এ রাজ্যের অন্যতম পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল। ভোটারদের হুমকি দিলে ফল ভাল হবে না, মোটামুটি এটাই জাহাঙ্গিরের পরিচিতদের বুঝিয়ে গিয়েছিলেন যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যের ‘এনকাউন্টার স্পেশ্যালিস্ট’। ওই ঘটনার পরে ওই পুলিশ পর্যবেক্ষকের এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল। জাহাঙ্গির বলেছিলেন, ওই পুলিশ আধিকারিক ‘সিংহম’ হলে তাঁরাও এক এক জন ‘পুষ্পা’। নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতমূলক আচরণের সামনে তাঁরা ঝুঁকবেন না।
কার্যক্ষেত্রে অবশ্য ঝুঁকতেই হয় জাহাঙ্গিরকে। ভোটের ময়দান ছেড়েই চলে যান তিনি। বিজেপি এবং স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, জাহাঙ্গির এবং তাঁর দল বহু দিন ধরে ভোটারদের ভয় দেখাতেন। তৃণমূলকে ভোট না-দিলে হুমকি দিতেন। জাহাঙ্গির নির্বাচনী লড়াই থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় স্থানীয়দের অনেকেই জানিয়েছিলেন যে, তাঁরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছেন। এ বার তাঁরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন। সেই জাহাঙ্গির গ্রেফতার হওয়ার পর ফলতাবাসী কী ভাবছেন, তা অবশ্য এখনও জানা যায়নি।