—ফাইল চিত্র।
লোকসভায় শুরু হয়ে গেল ‘অপারেশন লোটাস’। অর্থাৎ লোকসভায় তৃণমূল সাংসদদের ভাঙানোর রাজনীতি। আজ এই কথাই জানিয়ে তৃণমূলের লোকসভার এক প্রবীণ সাংসদ দাবি করেছেন, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের দফতর থেকে তাঁর কাছে ফোন গিয়েছিল এ বিষয়ে কথা বলতে। শুধু তিনিই নন, অন্তত জনা পনেরো তৃণমূল সাংসদের সঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে বলে রাজনৈতিক সূত্রের খবর। তৃণমূলের প্রবীণ সাংসদটির বক্তব্য, “বিজেপি ভয় দেখানো এবং লোভ দেখানো, এই দু’টি নীতিই একই সঙ্গে অবলম্বন করে চলছে।” অর্থাৎ তাঁর মতে, বিভিন্ন দুর্নীতি-অনিয়মের প্রসঙ্গ তুলে ইডি ও সিবিআই-এর ভয় দেখানো যেমন হচ্ছে, অন্য দিকে শাসক দলের পক্ষ নেওয়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট টোপও দেওয়া হচ্ছে। তিনি নিজে কি বিজেপির হাত ধরতে রাজি হয়েছেন? সেই বিষয়টি স্পষ্ট করেননি প্রবীণ সাংসদ। বলেছেন, “আমার সঙ্গে সকলেরই ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব-পরিচয় রয়েছে। কথা হয়েছে এই পর্যন্ত। বিজেপি এবং আমাদের রাজনৈতিক আদর্শ আলাদা।”
তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায় সরাসরিই বলেছেন, বিধানসভার ঘটনার পুনরাবৃত্তি লোকসভার ক্ষেত্রেও ঘটতে চলেছে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন। সুখেন্দুর কথায়, ‘‘৬০ জন বিধায়ক আলাদা গোষ্ঠী তৈরি করে স্পিকারের কাছে স্বীকৃতি চেয়েছেন, এটা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ইতিহাসে অভূতপূর্ব ঘটনা। এবং আমার আশঙ্কা, এই একই ঘটনা লোকসভার ক্ষেত্রেও ঘটতে চলেছে। কারণ, আমার জানাশোনা, লোকসভার কিছু সহকর্মী যা বললেন, বা অন্যান্য সূত্র থেকে যা খবর পাচ্ছি, তাতে খুব দ্রুত লোকসভাতেও বিধানসভার ঘটনার পুনরাবৃত্তিঘটতে চলেছে।’’
পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভায় বিপুল জয় পেয়েই ক্ষান্ত দেয়নি বিজেপি। তারা তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যেও সফল ভাবে ভাঙন ধরিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কোণঠাসা এবং তাঁকে দলের মধ্যে সংখ্যালঘু করে দিতে পেরেছে বলে রাজনৈতিক শিবির মনে করছে। এ বার সংসদীয় রাজনীতিতে যদি তৃণমূলের লোকসভার সাংসদদের দুই-তৃতীয়াংশকে নিজেদের দিকে বিজেপি নিতে পারে, তা হলে সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে যে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের দরকার হবে, তা পাওয়ার লক্ষ্যে এক ধাপ এগোতে পারবে তারা। ২০২৯-এর নির্বাচনে যাওয়ার আগে লোকসভার আসন বাড়ানো এবং ‘এক দেশ এক ভোট’ সংক্রান্ত বিল পাশ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অগ্রাধিকারের মধ্যে পড়ে বলে জানা গিয়েছে। এই ব্যাপারে তাঁদের পাশে থাকার জন্য তৃণমূলের পাশাপাশি তামিলনাড়ুর নির্বাচনের পরে কংগ্রেসের উপরে প্রবল ক্ষুব্ধ ডিএমকের সঙ্গেও বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব কথা বলছেন।
প্রশ্ন হল, কোন মডেলটি কার্যকর করতে চাওয়া হচ্ছে ‘অপারেশন লোটাস’-এর মাধ্যমে? তৃণমূলের ক্ষেত্রে দু’টি স্পষ্ট পথ রয়েছে, যার মধ্যে যে কোনও একটিকে বেছে নেওয়া হতে পারে। লোকসভায় তৃণমূলের মোট সাংসদ সংখ্যা এই মুহূর্তে ২৭ জন। তাঁদের মধ্যে ১৮ জন যদি তৃণমূল ত্যাগ করে সরাসরি বিজেপিতে যোগ দেন, তা হলে আর কোনও জটিলতাই থাকে না, দলত্যাগ-বিরোধী আইন এড়ানো যায়। আপ নেতা রাঘব চড্ডা যে ভাবে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সাংসদকে নিয়ে বেরিয়ে এসে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন সরাসরি। এটি হল প্রথম পথ। দ্বিতীয় পথ হল ‘বেঙ্গল মডেল’, অর্থাৎ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যে ভাবে একঝাঁক বিধায়ক মমতা ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে অগ্রাহ্য করে নিজেদের সমান্তরাল তৃণমূল গঠন করেছেন। সে ক্ষেত্রে বিজেপিতে যোগ না দিয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ তৃণমূল সাংসদ যদি বিজেপির হাতে তামাক খান, অর্থাৎ তাদের আনা বিলে শাসক দলের পক্ষে ভোট দেন, তা হলে সেটিও স্বাগত মোদী-অমিত শাহের কাছে।
বিজেপি শীর্ষ সূত্রের খবর, তৃণমূল এবং ডিএমকের সঙ্গে এই নিয়ে এক দফা সন্তোষজনক বৈঠক হয়েছে। বলা হচ্ছে, আসন্ন বাদল অধিবেশনে মহিলাদের আসন সংরক্ষণের মোড়কে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস এবং ‘এক দেশ এক ভোট’ সংক্রান্ত বিল তাঁরা আনবেন এবং তাতে ডিএমকে এবং তৃণমূলের সমর্থন পেতে সমস্যা হবে না বলে আত্মবিশ্বাসী বিজেপি সরকার। প্রসঙ্গত, দেড় মাসে আগেই মহিলাদের সংরক্ষণ এবং আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিলটি আনতে গিয়ে বিরোধীদের সম্মিলিত প্রতিরোধে ভোটাভুটিতে হেরে যায় মোদী সরকার। সেই প্রতিরোধে অন্যতম সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিল এই তৃণমূলই!
তবে পশ্চিমবঙ্গে ভোটের পরে পরিস্থিতি যে সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে, তা স্পষ্ট। রাজনৈতিক শিবিরে জল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছে, সংসদের আসন্ন বাদল অধিবেশনে বা তার আগেই তৃণমূলের সংসদীয় দলে চিড় প্রকাশ্যে অথবা আনুষ্ঠানিক ভাবে দেখা যাবে কি না। রাজনৈতিক সূত্রের বক্তব্য, লোকসভায় তৃণমূলের বেশ কিছু সাংসদ রয়েছেন, যাঁদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ছেড়ে বিজেপির দিকে হেলে পড়ার সম্ভাবনা নেই। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, মালা রায়, সাজদা আহমেদের মতো সাংসদেরা। এর বাইরে কিছুটা রাজনৈতিক ধোঁয়াশা রয়েছে চলতি পরিস্থিতির সাপেক্ষে।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে