—প্রতীকী চিত্র।
এক বুক জলে দাঁড়িয়ে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ। কিংবা নদীর ধারে কাদামাটি মেখে সার দিয়ে শুয়ে রয়েছেন জঙ্গলের কোল ঘেঁষে বেঁচে থাকা মানুষগুলো। হাতে প্ল্যাকার্ড, ‘এই জঙ্গল আমাদের, এই মাটি আমাদের’। এই দৃশ্য মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুরের।
দিল্লির মসনদ ছেড়ে বিজেপি নেতৃত্ব এত দিন পশ্চিমবঙ্গ সফরে ব্যস্ত ছিলেন। কাল বাদে পরশু দ্বিতীয় দফার ভোট। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথও কলকাতায় ছিলেন। কিন্তু প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুরে সরকারি কেন-বেতয়া প্রকল্পের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে জনজাতি অধ্যুষিত গ্রামগুলি, কোনও মন্ত্রীর দেখা নেই সেখানে। সেখানে হাজার হাজার মানুষ ঘর হারানোর মুখে, বিশ লক্ষ গাছ কাটা পড়তে চলেছে, জঙ্গল ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিশ্চিত ভাবে মৃত্যুমুখে পড়বে পশু-পাখিরা। কিন্তু সরকারের সে দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই।
কেন-বেতয়া সংযোগ প্রকল্প দেশের নদীর জল-ব্যবস্থাপনার ইতিহাসে এক মাইলফলক। এই প্রকল্পে মধ্যপ্রদেশের কেন নদী ও উত্তরপ্রদেশের বেতয়া নদীর অববাহিকাকে সংযুক্ত করে খরা অধ্যুষিত বুন্দেলখণ্ড এলাকায় জল পৌঁছে দেওয়া হবে। সরকারের বক্তব্য, এতে শুখা বুন্দেলখণ্ড এলাকার কৃষি ও পানীয় জলের অভাব মিটবে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি হবে। এটি কেন্দ্রের সঙ্গে মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ সরকারের একত্রিত উদ্যোগে তৈরি একটি প্রকল্প। প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টা শুনতে ভাল লাগলেও এর জেরে ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে স্থানীয় মানুষ ও প্রকৃতি। নদীপথ বদলে যাওয়ায় গ্রামকে গ্রাম ভেসে যাবে। হাজার হাজার জনজাতি পরিবার ঘরহারা হবে বলে দাবি। বিশ লক্ষ গাছ কাটা পড়বে। পান্না বাঘ্র সংরক্ষণ প্রকল্পে ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ তার মধ্যে তৈরি হবে বাঁধ।
স্থানীয় গ্রামের মহিলারা নদীর ধারে জড়ো হয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। সমাজমাধ্যমে এই দৃশ্য ভাইরাল। এক বিক্ষোভকারীর কথায়, ‘‘আমাদের জঙ্গল, আমাদের মাটি, আমাদের ঘর কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়েই আমরা আন্দোলনে নেমেছি। কোনও সরকারি আধিকারিকের দেখা নেই। আমাদের দাবি মেটানো না হলে আমরা এখান থেকে সরব না। আমাদের উপেক্ষা করা হলে চরম পথ বেছে নেব। দুর্গার মতো, কালীর মতো। ...আমাদের বাচ্চারা ভয়ে ভয়ে বাঁচছে। সরকারের কিছু যায় আসে না আমাদের ঘরেরকী হবে।’’
কয়েক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে বলে ছত্তরপুরের মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিজেপি সরকার। কিন্তু তাঁদের রুজিরুটির কী হবে, নিজের দেশে যে তাঁরা শরণার্থী হতে বসেছেন, সে নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কোনও পক্ষের। একই পরিস্থিতি ওড়িশার রায়গড় জেলার। একটি বেসরকারি সংস্থার বক্সাইট খনির জন্য সিজিমালি পাহাড়ে জঙ্গল কেটে রাস্তা তৈরি হচ্ছে। ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার জন্য প্রায় ৫ হেক্টরজঙ্গল কেটে সাফ করে দেওয়া হবে। স্থানীয় বাসিন্দারা বিক্ষোভদেখিয়ে চলেছেন।
আজ নয়, সেই ২০২৩ সাল থেকে। সে বছর রাজ্য সরকার ওই অঞ্চলে বক্সাইট খনি প্রকল্পের ঘোষণা করেছিল। এ বছর খনি চালু হয়ে যাওয়ার কথা। ১৫৪৯ হেক্টর এলাকা জুড়ে অবস্থিত এই প্রকল্পের ৬৯৯ হেক্টরই জঙ্গল এলাকা। ‘মুখ্যমন্ত্রী মোহন চরণ মাঝি মুর্দাবাদ, বিজেপি সরকার মুর্দাবাদ’ বলে স্লোগান দিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় জনজাতি মানুষ, পুলিশ-প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলে জঙ্গল কাটার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, কিন্তু গত তিন বছর ধরেজবাবে মিলেছে উপেক্ষা, নয়তো পুলিশের লাঠি।
প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর
সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ
সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে