কন্যাভ্রূণ হত্যার সঙ্গেই বাড়বে নারী নির্যাতনের ঘটনা, মানেকার প্রস্তাবে শঙ্কা

হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের সামনে অনেক ক্ষণ ধরে ঘুরঘুর করছিলেন ভদ্রলোক। পোশাকআশাকে যথেষ্ট কেতাদুরস্ত। কিছু ক্ষণ পরে আল্ট্রাসোনোগ্রাফির ঘর থেকে এক জনকে বেরোতে দেখেই তার পিছন পিছন যেতে দেখা গেল তাঁকে। শেষে হাসপাতালের শৌচাগারে গিয়ে দু’জনের দেখা। সেখান থেকেই ওই ভদ্রলোক জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রীর গর্ভে যে সন্তান আছে তা ছেলে না কি মেয়ে!

Advertisement

উজ্জ্বল চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ১৭:১২
Share:

হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের সামনে অনেক ক্ষণ ধরে ঘুরঘুর করছিলেন ভদ্রলোক। পোশাকআশাকে যথেষ্ট কেতাদুরস্ত। কিছু ক্ষণ পরে আল্ট্রাসোনোগ্রাফির ঘর থেকে এক জনকে বেরোতে দেখেই তার পিছন পিছন যেতে দেখা গেল তাঁকে। শেষে হাসপাতালের শৌচাগারে গিয়ে দু’জনের দেখা। সেখান থেকেই ওই ভদ্রলোক জানতে পারেন, তাঁর স্ত্রীর গর্ভে যে সন্তান আছে তা ছেলে না কি মেয়ে!

Advertisement

এ চিত্র শুধু কলকাতার কোনও নামী হাসপাতালের নয়! বর‌ং গোটা দেশের।

আসলে এটা একটা চক্র। স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত একটা শ্রেণি এ ভাবেই ‘প্রি-ন্যাটাল ডায়াগনস্টিক টেস্ট অ্যাক্ট’কে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য দফতর কখনও কখনও কড়া হয়েছে। তবে তা জ্বলে ওঠার আগেই মিইয়ে গিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্তাদের যুক্তি, ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ হচ্ছে কি হচ্ছে না তা দেখার প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তাঁদের হাতে নেই। আর এ সবের মধ্যেই কমে গিয়েছে দেশে নারী-পুরুষের অনুপাত।

Advertisement

কন্যাভ্রূণ হত্যা ঠেকাতে এ বার তাই নয়া দাওয়াইয়ের কথা শোনালেন কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুকল্যাণমন্ত্রী মানেকা গাঁধী। তাঁর মতে, গর্ভবতী মাকে তাঁর গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে জানিয়ে দেওয়া উচিত। সেই তথ্য নথিভুক্ত করে যাঁদের গর্ভে কন্যাভ্রূণ রয়েছে তাঁদের উপর বিশেষ নজরদারি রাখতে হবে। আদৌ তাঁরা শেষ পর্যন্ত সুস্থ সন্তানের জন্ম দিলেন কি না, তাও দেখা উচিত। তবে, তাঁর এই প্রস্তাব গোটা দেশ জুড়ে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটা অংশের মতে, এই আইন চালু হলে দেশে কন্যাভ্রূণ হত্যার ঘটনা আরও বাড়বে।

এই সংক্রান্ত খবর
আইন পাল্টে ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণের পক্ষে সওয়াল মানেকার

Advertisement

‌বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতেও গর্ভস্থ ভ্রূণের লিঙ্গ নিয়ে কিছু জানানো হয় না বাবা-মাকে। তবে তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। আদৌ তাঁরা আগত ভবিষ্যতের লিঙ্গ জানতে আগ্রহী কি না? সেই মতোই জানানো হয়। কিন্তু, এ ক্ষেত্রে মন্ত্রী তো সকলকে জানিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন! বিশিষ্ট স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ গৌতম খাস্তগীরের মতে, সেটা কোনও ভাবেই সম্ভব নয়। কারণ পরিকাঠামোগত ভাবে এ দেশ এখনও সেই জায়গায় পৌঁছয়নি। তিনি জানান, গর্ভাবস্থার একটি নির্দিষ্ট সময়ের পরে আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করলেই জানা যায় ভ্রূণের লিঙ্গ। গর্ভবতী মহিলাদের সাধারণত তিন বার আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করা হয়। গর্ভাবস্থার ৭ থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যে প্রথম বার। সেই সময়ে শুধু বোঝা যায় গর্ভে একটি, দু’টি না তিনটি সন্তান রয়েছে। দ্বিতীয় বার আল্ট্রাসোনোগ্রাফিটি করা হয় গর্ভাবস্থার ১৬ থেকে ২০ সপ্তাহের মধ্যে। এই সময়ে ভ্রূণের বৃদ্ধি এবং তার লিঙ্গ নির্ধারণ করা যায়। সাধারণত শেষ এবং তৃতীয় আল্ট্রাসোনোগ্রাফিটি করা হয় গর্ভাবস্থার আট মাসের মাথায়। ২৮ থেকে ৩২ সপ্তাহের মধ্যে করা ওই আল্ট্রাসোনোগ্রাফি থেকে শিশুর বৃদ্ধি যেমন বোঝা যায়, তেমনই নির্ধারণ করা যায় তার লিঙ্গও।

তবে, তিন ক্ষেত্রেই ভাল যন্ত্র এবং অভিজ্ঞ চিকিত্সকের প্রয়োজন। গৌতমবাবু বলেন, ‘‘আমাদের দেশের সব হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমের আল্ট্রাসোনোগ্রাফি যন্ত্রগুলি অতটা ভাল নয়। পাশাপাশি, সব জায়গাতেই অভিজ্ঞ এবং কাজ জানা চিকিত্সকও নেই। কাজেই লিঙ্গ নির্ধারণের ব্যাপারে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। আর সেই ভুল থেকে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে!’’ একই কথা বলছেন, দীর্ঘ দিন রাজ্যের বিভিন্ন জেলা হাসপাতালে কাজ করা স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ সাত্যকি হালদার। তাঁর কথায়, ‘‘সব হাসপাতালে যন্ত্রপাতিগুলি একই রকমের নয়। ভাল-মন্দ মিশিয়ে। এমনকী, রেডিওলজিস্টদের দক্ষতাও সব ক্ষেত্রে সমান হয় না। ভারতের মতো দেশের সমাজ ব্যবস্থায় এখনই এমন নিয়ম চালু করলে সমস্যায় পড়তে হবে।’’

পাশাপাশি, অন্য আশঙ্কার কথাও বলছেন অনেকে। লিঙ্গ নির্ধারণের ব্যাপারটি আইনসিদ্ধ হয়ে গেলে, কন্যাভ্রূণ হত্যার সঙ্গে নারীর উপর অত্যাচারের ঘটনাও বাড়বে। কী ভাবে? রাজ্যের মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন সুনন্দা মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘এক জন গর্ভবতী মহিলার পরিবার ১৬ সপ্তাহ পর জানতে পারল তাঁর গর্ভে কন্যাভ্রূণ রয়েছে। তার পর সেই নারীর উপর এমন শারীরিক অত্যাচার শুরু হল যাতে তাঁর গর্ভপাত হয়ে যায়। এই ঘটনাকে যদি কেউ স্বাভাবিক গর্ভপাত বলে চালিয়ে দিতে চান, তা হলে সরকার কী ভাবে তাঁকে ধরবে? সেই পরিকাঠামো সরকারের নেই।’’ সুনন্দাদেবীর কথা সমর্থন করছেন গৌতমবাবুও। তাঁর কথায়, ‘‘লিঙ্গ জেনে যাওয়ার পরে গর্ভবতী নারীর উপর অত্যাচার বেড়ে যেতে পারে। কারণ, যে পরিবার কন্যাসন্তান চায় না, তারা কন্যাভ্রণের কথা জানতে পেরে তা নষ্ট করতে উদ্গ্রীব হয়ে উঠতে পারে। আর সে কারণেই হয়তো গর্ভবতী নারীর পেটে সজোরে আঘাত করা হল। যার জেরে গর্ভপাত হয়ে গেল ওই নারীর। এ ঘটনার পর যদি কেউ দাবি করেন, বেসামাল হয়ে ওই নারী পড়ে যাওয়াতেই এই ঘটনা ঘটেছে, তবে তা প্রমাণ করার পরিকাঠামো আছে কি সরকারের? এমনকী, গর্ভাবস্থার এমন ‘অ্যাডভান্স স্টেজ’-এ ওই গর্ভবতী মায়ের মারা যাওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।’’ তবে, মানেকা গাঁধী যে তাঁর এই পরামর্শের মাধ্যমে কন্যাভ্রূণ হত্যাবিরোধী একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন তা মেনে নিচ্ছেন সুনন্দাদেবী। পাশাপাশি, প্রস্তাবটি যে বাস্তবসম্মত নয় তা-ও জানিয়েছেন তিনি।

বিশিষ্ট সমাজকর্মী মিরাতুন নাহার-ও মন্ত্রীর এই পরামর্শের বিরুদ্ধে। তাঁর কথায়, ‘‘খুব কৌশলে মানেকা গাঁধী ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণকে আইনসিদ্ধ করতে চাইছেন। কন্যাভ্রূণকে রক্ষা নয়, লিঙ্গ নির্ধারণকে আইনসিদ্ধ করার মাধ্যমে আবার কন্যাভ্রূণ হত্যার সুযোগ তৈরি করে দিয়ে পুরুষ প্রাধান্যের পথই খুলতে চাইছেন তিনি। এক জন মানবী হয়ে মানেকার এই প্রস্তাব অত্যন্ত নিন্দাজনক।’’

তবে, কন্যাভ্রূণ হত্যা ঠেকানো কী ভাবে সম্ভব?

গৌতমবাবু একটা সম্ভাবনার কথা শুনিয়েছেন। তাঁর মতে, সকলের জন্য বাধ্যতামূলক না করে যাঁরা স্বেচ্ছায় লিঙ্গ নির্ধারণ করাতে চান তাঁদেরকে সেই অনুমতি দেওয়া হোক। তাঁদের কেউ যদি ভবিষ্যতে গর্ভপাত করাতে চান বা করিয়েছেন বলে জানা যায়, তখন তাঁদের বিরুদ্ধে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কেন ওই পরিবার এমনটি করল সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত। এমনকী, ওই পরিবারের পারিবারিক ইতিহাস বিবেচনা করে একটা রাস্তা হয়তো বের করা যেতে পারে। কেন কী কারণে এমনটা তারা করেছে, সেটা জানা জরুরি। এটা সমাজ বিজ্ঞানের অংশও বটে।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement