নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও লখনউয়ে, কখনও দিল্লি। রাহুল গাঁধী ছুটছেন রাজস্থান থেকে হিমাচল, উত্তরাখণ্ড থেকে উত্তরপ্রদেশ। কিন্তু দেশের সীমান্ত পেরিয়ে সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি মোদী-বিরোধী প্রচার করে এলেন ব্রিটেনে।
নোট বাতিলের বিরুদ্ধে সংসদের শীতকালীন অধিবেশন অচল করে রেখেছিলেন বিরোধীরা। সংসদ শেষ হলেও, বিরোধীরা হাল ছেড়ে দেননি। মমতা-রাহুল তো বটেই, মায়াবতী-লালুপ্রসাদরাও মোদীর বিরুদ্ধে মাঠে নেমে পড়েছেন। নিজের রাজনৈতিক গড়ে নোট বাতিলের বিরুদ্ধে আমজনতার ক্ষোভকে উস্কে দিয়ে ফায়দা তুলতে কেউ কসুর করছেন না। সিপিএম কি পিছিয়ে রয়েছে!
একেবারেই নয়। দলের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি ব্রিটেনে পাঁচ দিন কাটিয়ে মোদীর বিরুদ্ধে প্রচার করে ফিরেছেন। সেখানে লেস্টারে ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়ান কমিউনিস্ট’ ও ‘ইন্ডিয়ান ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর যৌথ সভায় ইয়েচুরি বলেছেন, যে লক্ষ্য ঘোষণা করে মোদী নোট বাতিল করেছিলেন, তার কোনও কিছুই পূরণ হয়নি। তা সে কালো টাকা বা জাল নোট শেষ করা হোক কিংবা সন্ত্রাসে আর্থিক মদত বন্ধ। ইয়েচুরির দাবি, অধিকাংশ কালো টাকা ব্যাঙ্কে জমা পড়ে গিয়েছে। তাঁর অভিযোগ, দু’হাজার টাকার নোট চালু করে দুর্নীতির পথ আরও সহজ করে দিয়েছেন মোদী। মোদীর বিদেশনীতি এবং আমেরিকার লেজুড়বৃত্তিরও কড়া নিন্দা করেছেন সীতারাম।
পার্টির মধ্যে গুঞ্জন, একসময় ব্রিটেনে বসেই এম এন রায়, রজনী পাম দত্তরা ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সলতে পাকিয়েছিলেন। জ্যোতি বসুও ছিলেন তাঁরই অঙ্গ। ইয়েচুরি কি আবার বিদেশের মাটিতে গিয়েই ভারতে লাল ঝান্ডা ওড়ানোর রাস্তা খুঁজছেন!
এই মুহূর্তে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য সংখ্যার ততটা জোর নেই সিপিএমের। তবে দলে ইয়েচুরি-ঘনিষ্ঠ নেতাদের মনোবাসনা হল, মোদী সরকারের বিরুদ্ধে কংগ্রেস ও আঞ্চলিক দলগুলিকে নিয়ে রামধনু জোট তৈরি হোক। সেখানে অনুঘটকের কাজ করবেন ইয়েচুরি। অতীতে যে ভূমিকা নিতেন হরকিষেণ সিংহ সুরজিৎ— জাতীয় রাজনীতিতে ইয়েচুরির শিক্ষাগুরু। কিন্তু সে সময় পশ্চিমবঙ্গে আঞ্চলিক দলের তালিকায় তৃণমূল কংগ্রেস নামে একটি শাসক দল ছিল না। ফলে সুরজিতেরও বিশেষ কোনও অসুবিধা ছিল না। তিনি কংগ্রেস থেকে বিজেপি, মুলায়ম থেকে দেবগৌড়া, সব দিকেই ভারসাম্য রেখে চলতেন। ইয়েচুরিকে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মেলাতে গেলে প্রকাশ কারাটদের চোখরাঙানি দেখতে হয়। বিরোধী জোটে বসে তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে করমর্দন করতে হলে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট থেকে আওয়াজ ওঠে।
গুরুমাহাত্ম্য প্রচারেও তাই ব্রিটেনকেই বেছে নিয়েছেন সীতারাম ইয়েচুরি। ১৮ ডিসেম্বর সুরজিতের জন্মশতবর্ষ উদযাপন হয়েছিল লেস্টারে। দিল্লিতে সুরজিতের নামে যে পার্টি স্কুল গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে সিপিএম, তাতে দরাজ হাতে অর্থ সাহায্যের জন্য ব্রিটেনের ওই সংগঠনগুলির কাছে অনুরোধ করেন ইয়েচুরি। মিলেছে আশ্বাসও। জন্মশতবর্ষের ওই অনুষ্ঠানেই সুরজিতের সঙ্গে সদ্যপ্রয়াত ফিদেল কাস্ত্রো-র তুলনা টানেন ইয়েচুরি। বলেন, ‘এই ‘দু’জনেই প্রবল ভাবে বিশ্বাস করতেন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনও বিপ্লবই সফল হয় না।’’
ব্রিটেনে সীতারাম ইয়েচুরির মুখে এ কথা শুনে বাংলায় তাঁর দলের অনেকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, সিপিএমের আন্দোলনেও এখন জনগণের দেখা নেই। তা হলে ভারতের মাটিতে বিপ্লবই বা সফল হবে কী ভাবে!