মুম্বই মনতাজ

অভিমানে কাঁদে শৈশব, আমেন

‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনে’র মতোন আন্টির আড্ডার ছেলেটির নাম হল গিয়ে ‘ছোটন’। কোনও মানে হয়, প্রভু? চোখ মেলে চেয়ে দেখুন, একটু ভাল করে তাকিয়ে দেখুন ওর চোখের দিকে, হাসি অথবা ওর হাড় জাগা গালের রেখার দিকে! যদিও, শ্রীমান ভূমিষ্ঠ হয়েছেন গত শতকের নাভিশ্বাসের সময়। কিন্তু ওকে কি ‘ছোটন’ ডাকা যায়? ‘ছোটন’ শুনলেই কেমন মনে হয় কচি-কাঁচা, নিষ্পাপ এবং সরল একটি শিশু। চোখে রাজ্যের প্রশ্ন।

Advertisement

মিলন মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:১৯
Share:

‘কানা ছেলের নাম পদ্মলোচনে’র মতোন আন্টির আড্ডার ছেলেটির নাম হল গিয়ে ‘ছোটন’। কোনও মানে হয়, প্রভু? চোখ মেলে চেয়ে দেখুন, একটু ভাল করে তাকিয়ে দেখুন ওর চোখের দিকে, হাসি অথবা ওর হাড় জাগা গালের রেখার দিকে! যদিও, শ্রীমান ভূমিষ্ঠ হয়েছেন গত শতকের নাভিশ্বাসের সময়। কিন্তু ওকে কি ‘ছোটন’ ডাকা যায়? ‘ছোটন’ শুনলেই কেমন মনে হয় কচি-কাঁচা, নিষ্পাপ এবং সরল একটি শিশু। চোখে রাজ্যের প্রশ্ন। স্বপ্ন ঢলোঢলো। তারই আনাচে-কানাচে হয়তো ছোট্ট একটু দুষ্টুমি খেলা করছে। অথচ, আমাদের এই ছোটনের চোখে কোনও জিজ্ঞাসা নেই। নেই কৌতুহল বা বিস্ময়। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সের অভিজ্ঞ পুরুষ মানুষটি বড়জোর জিজ্ঞেস করতে পারে, ‘কতটা চাই? নওটাঁক, না পাওসের?’ অথবা ‘সোডা লাগবে নাকি?’’

Advertisement

তার পর আপনার অর্ডার মাফিক ভেতরের ঘর থেকে দিশি মদ এনে দেবে গেলাসে করেই। কড়ায়-গণ্ডায় হিসেব মিলিয়ে দেবে ‘আন্টির’ হাতে। ভারসোবা অ়ঞ্চলে এই ‘আন্টির আড্ডা’ স্বনামধন্য। আন্নিবাঈয়ের ঠেক। হপ্তায় দু’দিন দূরদুরান্ত থেকে ফিরে আসবে ছোটন ভোররাতের লোকাল ট্রেনে। রাজ জাগায় চোখ লাল। কোমরে, বুকে, পেটে সাপের মতো জড়ানো থাকবে রবারের নল বা পাইপ। পাইপের ভেতরে সদ্য ভাটিতে পাওয়া স্পেশাল চোলাই। সেই সময় ওর চোখ সতর্ক, তীক্ষ্ণ। সপ্তাহের সেই সকাল দুটোয় ছোটনের চোখে লেগে থাকে আতঙ্ক। ন্যায়-অন্যায়ের খবর ও রাখে না। শুধু জানে, পুলিশের অন্য নাম বাঘ। ছুলে আঠারো রকমের ঘা হয় সারা গায়ে। সেই ঘায়ের ওপর পড়বে আন্টির বড় চাপড় লাথি জুতো। খেতে পাওয়া যাবে না দু’বেলা। মাঝ রাতে মদের খদ্দেরদের ভিড় শেষ হলে আন্টিকে লুকিয়ে নাকি ‘পাওসে’র গিলে ফেলে। ‘পাওসের’ মানে এক পোয়া। ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ চোলাই ব্যবসায় সের ছটাকের হিসেব চল আছে। লাঠির বাড়ি, লাথি জুতো হজমের গা –ব্যথায় এক আধ গেলাস মদে নাকি ঘুমটা হয়। তা ছাড়া, তা কত দূরে থেকে বয়ে বয়ে নিয়ে আসি ওসব। আপনাদের কেমন মাল দিলুম, একটু চেখে দেখবে না, সায়েব!’’ বয়স্ক চোখে হাসে আর বলে’!

ঘরে, আমাদের শিশুটি কন্যাটির দেখাশোনা, টুকটাক কাজের জন্যে একটি এমন ছেলের দরকার ছিল। কিন্তু প্রভু, গিন্নি আমার বুদ্ধিমতি! ঠিকই বলেছেন—একটা মাতাল, বয়ে যাওয়া রাস্তার ছেলেকে তো আর ঘরে তুলে এনে রাখতে পারি না!!....

Advertisement

তুমি এই ধরাতলে এসেছ, দে দেবতা, দু’হাজার বছর আগে। দিন কয়েক পরেই তোমার জন্মদিন পালিত হবে বিশ্বময়। এক বছরের পুরনো খোলস ছেড়ে আমরা নতুন পোশাকে, নতুন ভাবে দিন শুরু করব সামনের সপ্তাহ থেকে। অথচ, সহস্র শিশু-বালকরা রাস্তায় রাস্তায় জীর্ণ, মিলন পোশাকে পৌষের শীতের সঙ্গে আপসের চেষ্টা করছে! বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই, আহমেদাবাদের হর্ষদের কথাই ধরা যাক।

রোগা-পটকা শরীরে ওর চেয়ে ওজনে যথেষ্ট ভারী যন্ত্রটি কাঁধে ঝুলিয়ে যখন প্যাঁ-পোঁ করত, গান ধরত সরু গলায়—কবেকার সেই ফিল্মের গান,

‘সতায়ে ভুখ তো ইমান ডগমগাতা হ্যায়’—তখন ভাবতুম বাহ। ছেলেটি এই বয়েসেই বেশ গায়-বাজায়। বোনটিও গলা মেলাত। ওর নাম জানা হয়নি। দুজনের হাড়-জিরজিরে চেহারায় ক্ষুধার্ত কণ্ঠার হাড় কাঁপত। গলার শিরা-উপশিরাগুলো বিচ্ছিরি কেঁচোর মতো ফুলে, ফেঁপে উঠত। গান থামত না ওদের। দম ফুরিয়ে গেলে দুটি ভাইবোন এক সঙ্গে হাঁপাত। গান তবু থামত না। যতক্ষণ না, দু’পাশের বাড়িগুলো থেকে আমরা খুচরো সিকি-আধুলি ছুড়ে ফেলতুম। হে প্রভু, বেশ কিছুদিন পর চেনা গলা শুনে বাইরে এলুম। দেখি হারমোনিয়ামটি নেই। বাঁ-হাতে কান চেপে ধরে, চোখবুজে, বিকৃত মুখ করে গান গাইছে হর্ষদ এবং ওর ছোট বোন। গলা ফেটে যাচ্ছে চিৎকারের চোটে। সব্বাইকে শোনাতে হবে তো? বয়ঃসন্ধির জন্যেই হয়তো গলা ভাঙছে। কণ্ঠস্বরে সেই মিষ্টতা নেই। সুর গেছে হারিয়ে। জিজ্ঞেস করলুম, ‘‘কী রে হর্ষদ! কোথায় ছিলি অ্যাদ্দিন! হারমোনিয়াম কই তোর?’’

হেসে হেসেই বলে দিল, হিমালয়ের সন্ন্যাসীর মতোন, বেঁচে দিতে হল বাবুজি। বোনটার ‘মায়ের দয়া’ হল কিনা? দেখুন না, একটা চোখ কানা হয়ে গেছে, বেচারির। রোজগার বন্ধ ছিল, তাই বেচে দিলুম। দিয়ে বড় মুশকিল হয়েছে এখন। শুকনো গান শুনিয়ে আর তেমন পয়সা জোটে না। সুরও ঠিক ধরে রাখতে পারি না। দোবেলা দুজনের ভরপেট খাবার জোটাতে প্রাণপণ চেঁচাতে হয়।’’

পুরোনো, চেনা মুখ দেখে ভরসা পেল যেন। আর একটু কাছে এসে বলল, দেখুন না, জামা ছিড়ে গেছে। বোনটির শুধু গেঞ্জিতে শীত মানে না, সন্ধের পর সারারাত কাঁপে। দিন না, বাবুজি পুরোনো ফেলে দেবার মতো জামা-টামা—’’

হে বিশ্বপিতা চার পাঁচ দিন পরেই ঝলমলে নতুন পোশাক পরে আমরা তোমার বন্দনা গাইব—‘উই উইশ ইউ এ মেরি ক্রিসমাস—’’

এই ‘‘উই’’ কারা, ‘‘ইউ’’ কে বা কারা? হর্ষদরা ‘আমাদের’ বা ‘তোমাদের’ দলের কেউ নয়? এমন সব উৎসবের মরশুমে আর ক’দিন বদেই কি এই দলছুট শিশুপ্রাণ তাদের ছোট্ট অকিঞ্চিৎকর শরীর ছিন্ন-ভিন্ন-জীর্ণ বস্ত্রে কোনও রকমে দায়সারা আবৃত করে নতুন বছরকে আবাহন করবে? আমাদের সব্বাইকে শুনিয়ে বলবে—‘‘হ্যাপি নিউ ইয়ার!’’

পৌরাণিক যুগে বালখিল্যদের সংখ্যা ছিল ষাট হাজার। এ যুগের বালখিল্যরা তার চেয়েও বেশি। কত বেশি? কে বলবে? এই পথেঘাটে অভিমন্যুদের নাম, ঠিকানা, সংখ্যার ঠিক ঠিক খবর কে রাখে। ভারতের লোকসংখ্যা গণনায় এদের নাম নেই। থাকতে নেই। কারণ এরা পরগাছা। তাবৎ ‘জনসংখ্যার’র চোখেই তো এরা প্রায় ! উপদ্রবে’র সামিল। কারণ, এরা সব কোনও ভয়ঙ্কর রসিকের আশ্চর্য রসিকতার মতোন ভূমিষ্ঠ হয়। মুখে কথা ফুটতে না ফুটতেই ‘রসিকতা’ ফুরলো নটে গাছটি মুড়োলোর কায়দায় উধাও হয়ে যায়। অথবা এক লাফে কেউ কুড়ি, কেউ পঁচিশ, কেউ চল্লিশ পেরিয়ে ‘বয়স্ক’ হয়ে যায়। এই সব আগাছা-পরগাছাদের দরকারটা কী ছিল, হে প্রভু, তোমার এই জগৎসংসারে? দরকার যদি ছিলই, তবে কিছু ঘুড়ি-টুড়ি, লাল-নীল বেলুন খেলনা পুতুলেরা সব গেল কোথায়?

আন্ধেরি স্টেশনের রেলপুলে, অজস্র পায়ের ভিড় চার-পাঁচ বছরের একটি শরীর—যার খুব স্বাভাবিক নিয়মেই দুটো হাত, দুটো পা, দুটি চোখ আছে—সে কেন এক দেড় বছরের আর একটি ল্যাদা শিশুকে চার টানটান করা পায়ের ওপরে উপুড়ে করে শুইয়ে রাখবে? মাথা নিচু হয়ে চিবুক ঠেকে থাকবে তার বুকে!

ল্যাদা শিশুটি তার কোলে হিসি করে কেঁদে-কেটে নেতিয়ে বা ঘুমিয়ে পড়লেও তার কিছু এসে যাবে না। সে শুধু তার রুগ্ন, অপুষ্ট ডান হাতটি মরা গাছ অথবা অকেজো যন্ত্রের মতো পেতে রাখবে ইস্পাতের কঠিন ফুলের ওপরে! এই সব অপ্রয়োজনীয়, গোলমেলে ভাবনার জবাব মেলে না বলেই তো মধ্যবিত্ত আদিখ্যেতা বা রাগ নড়েচড়ে মাথার ভিতরে। ইচ্ছে করে, ছেলেটির কান ধরে তুলে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলি, ‘‘কী, কী হচ্ছে কী এখানে, দুষ্টু কোথাকার। দুধ খেয়ে, বই বগলে ইস্কুলে চলে যাও! এটা কি তোমার ভিক্ষে চাওয়ার বয়েস, যাও।’’

ছেলেটি একটু কাঁদে। তারপর চোখ মুছে ল্যাদা বাচ্চাটিকে ওদের মায়ের কোলে তুলে দেয়। স্নান করে সাবান মেখে, যে কোনও স্কুলের ধবধবে ইউনিফর্ম তুলে নেয়। চুল আঁচড়ায়। পেট ভরে এক বাটি দুধ খেয়ে, বইপত্তর গুছিয়ে মাকে প্রণাম করে। বলে,

‘‘যাই মা।’’

মা ছেলের চিবুক ছুঁয়ে চুমু খায়। বলে,‘‘যাই বলতে নেই, বাছা। এসো। বিদ্বান হও। বড় হও। মনে রেখো, তুমি দেশের ভবিষ্যৎ।’’

একবিংশ শতাব্দীর চক্রব্যুহে প্রবিষ্ট অভিমন্যুদের আমারও বলতে, শুনতে প্রাণ চায় এই রকম সব অসম্ভব-সম্ভব কথা। কিন্তু ছোট মুখে বড় কথা মানায় না, হে ঈশ্বর। তাই মুখ লুকিয়ে নিজের কোটরে ফিরে আসি। সেখানেও পালাবার পথ নেই। নিজের মেয়ে কোলে উঠে জিজ্ঞেস করে,

‘‘আব্বা, রোটি দে’! আম্মা, রোটি দে’ মানে কী বাবা? ওদের আব্বা-আম্মা কেন ওদের রুটি দেয় না, বাবা?

শিশুদের সব কৌতুহল বা প্রশ্নের জবাব হয় না। ফলে, তাড়াতাড়ি খাটে শুইয়ে পাশ ফিরিয়ে দিই মেয়েকে। আলত চাপড়ে ঘুম পাড়ানি গান শোনাই—

‘‘ঘুম রে আয়, শিয়ালে বেগুন খায়।

এক শিয়ালে রান্ধে-বাড়ে, দুই শিয়ালে খায়

আমার ঠাকুর জগন্নাথ দোলায় চড়ে যায়

দোলায় চড়ে যেতে রে, পাট-কাপড়খান পায়—’’

অনেক দূরে, কোনও অচেনা পাহাড় থেকে কান্নার শব্দ গুমরে গুমরে আমার শ্রুতির পর্দায় আঘাত করে। পাহাড়ের গুহার মুখে সেই আদ্যিকালের বুড়োটি একটা প্রাচীন শ্যাওলা ধরা প্রকাণ্ড পাথরের ওপরে পা ঝুলিয়ে বসে থাকে। বসে বসে কাঁদে। তার চার পাশে খেলনা, পুতুল, নানা রঙের ঘুড়ি চকোলেট, লজেন্স, অজস্র বেলুন….

বুড়ো একা একা কপাল চাপড়ে কাঁদে আর ডাকে, ওরে তোরা আয়! আমার কাছে আয়।

বুড়োটির নাম ‘‘শৈশব’’। কচি বয়েস থেকে যে সব মানবসন্তান আমাদের অলক্ষে, বাৎসল্যবিহীন আগাছা-পরিগাছার মতোন অযত্নে ‘‘বয়স্ক’’ হয়েছে তাদের সমষ্টিগত হারানো, অপরিচিত শৈশব। অতি বৃদ্ধ‘শৈশব’ অভিমান ভরে হাপুস নয়নে ডাকে,

‘‘এই দ্যাখ না। তোদের জন্যে কত্তো সব জিনিস নিয়ে সেই কবে থেকে বসে আছি একা একা—’’

আসে না ওরা। বড়ো ব্যস্ত। শুধু দিনযাপনের, প্রাণ ধারণের গ্লানি সামলাতে ব্যতিব্যস্ত ওরা সবাই।

হে নবীন যুগের মানুষ। তুমি এসো নবীন বাতাস নিয়ে আমাদের জীবনে। এসো ‘‘অখ্যাত জনের নির্বাক মনের। মর্মের বেদনা যত করিও উদ্ধার/প্রাণহীন এ দেশেতে গানহীন যেথা চারিধার/রসে পূর্ণ করি দাও তুমি!! আর, ওই বেলুন, খেলনা, বই, ঘুড়ি সমস্ত নিয়ে এসো এ যুগের সব বাসন্তী, জোসেফ ছোটনদের জন্যে! আজকের কালকের লক্ষ লক্ষ নাম-না-দানা অভিমন্যুদের জন্যেও!!

আমেন।।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement