উত্তরবঙ্গের জঙ্গলমহলে

উত্তরবঙ্গের জঙ্গলমহলের অনুভব কেবল তরাই সমমনস্ক মানুষ জন পেতে পারেন, যাঁরা নিরালা নিরুচ্চার হাতড়ে চলে আসেন দূরে কোথাও—যেখানে জঙ্গল চিরে চলা ছোট নদীটির সাঁকো বা পাতা থেকে পাতার শরীরে লেগে থাকে বনজ ঘ্রাণ, ফিসফিসানি। লিখছেন মধুছন্দা মিত্র ঘোষ।উত্তরবঙ্গের জঙ্গলমহলের অনুভব কেবল তরাই সমমনস্ক মানুষ জন পেতে পারেন, যাঁরা নিরালা নিরুচ্চার হাতড়ে চলে আসেন দূরে কোথাও—যেখানে জঙ্গল চিরে চলা ছোট নদীটির সাঁকো বা পাতা থেকে পাতার শরীরে লেগে থাকে বনজ ঘ্রাণ, ফিসফিসানি। লিখছেন মধুছন্দা মিত্র ঘোষ।

Advertisement
শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০১৬ ০০:৩৪
Share:

প্রকৃতিকে খুব কাছ থেকে একান্তে পেতে, পাহাড় ঘেরা রোমাঞ্চে এক চিলতে নিসর্গ টান। আর কী—এমন পরিবেশে আরণ্যক নির্জনতায় খানিক অবকাশ। এই জন্যই তো আসা সবুজের ঘেরাটোপে। যেখানে প্রকৃতির হাটখোলা দুয়ার—ডুয়ার্স। যাত্রাপথের রমণীয় পরিক্রমায় শুধুই অনন্ত শ্যামলিমা। ইতিমধ্যে শিলিগুড়ি থেকে সেবক রোড ধরে পেরিয়ে এসেছি মহানন্দা অভয়ারণ্যের বুক চেরা সেবক রোড ধরে তিস্তা নদীর সেতু, সেবক কালীবাড়ি, মংপং, ডামডিম, ওদলাবাড়ি, মালবাজার প্রভৃতি একের পর এক জনপদ। কত যে নদী-নালা-ঝোরার সঙ্গে পরিচয় হল। তিস্তা, পঞ্চনই, নন্দীখোলা, গণেশ, চেল, লিস, ঘেঁষ, শঙ্খি ঝোরা, মাল, সুখা ঝোরা, নেওড়া ইত্যাদি। বর্ষার মরসুমে এই সব আপাত শুষ্ক নদীগুলিই টইটুম্বুর হয়ে থাকে। ডুয়ার্স মানেই অনন্ত সবুজের ছাড়পত্র। পথের দু’পাশে একের পর এক দিগন্ত বিস্তৃত চা বাগান—ওয়াশাবাড়ি, সোনালি টি এস্টেট, রাজা টি এস্টেট, বাগরাকোট টি এস্টেট, রানিচেরা টি এস্টেট, ডানকান টি এস্টেট। আরও কত ছোট বড় মাঝারি টি এস্টেট পথের দু’ধারে চোখকে নিরাময় দিচ্ছিল। ডুয়ার্সের এই চাবাগানগুলিতে মহিলা শ্রমিকদের দুটি পাতা একটি কুঁড়ি তোলার ব্যস্ততা।

Advertisement

খুনিয়া জঙ্গল

Advertisement

এল এইচ ৩১ বি পারাপার করে বাঁয়ে সরস্বতী জঙ্গল থেকে ডান হাতি গরুমারা জঙ্গলে ঢুকে গেল এক দঙ্গল বুনো হাতি। ওরা এমনই যায়। ক্যামেরা তাক করতে না করতেই জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের আড়ালে। শুধু দেখে গেলাম ওদের গদাই লস্করি চালের দাপট। মূর্তি নদীর সাঁকো পেরোতেই ও পাশে গা ছমছমে খুনিয়া জঙ্গল। গহীন অরণ্য জুড়ে রয়েছে নিঃসীম আদিমতা। সেই সবজে মাধুর্যকে কেবল উপভোগ করে নিতে হয়। চিনে চিনে নিতে হয় তার নিজস্বতাকে। এমনই খেই হারানো দৃশ্যাবলী টপকে হঠাৎই দেখা দিতে পারে সোনাঝরা রোদ গায়ে মেখে এক চিলতে ফাঁকা জমিতে খেলে বেরানো একদল চিতল। সঙ্গের শাবকদের উদভ্রান্ত ছুটোছুটিও মা চিতলদের প্রশ্রয়।

অর্জুন, বয়েরা, সেগুন, শালের দামালতায় খুনিয়া জঙ্গলের তাবৎ পথ ছায়াচ্ছন্ন। জঙ্গলের জটিলতা সামলে বনদফতরের জিপ কখনও পিচ রাস্তা কখনও মেঠো পথে। গাছের সারি ক্রমশ ফিকে হয়ে আসতেই তিনতলা নজরমিনার। ক্যামেরা বিলকূল সজাগ থাকলেও হয়তো দুর্ভাগ্যক্রমে, সে দিনই কিচ্ছুটি নজরে পড়ে না। পাখির কুজনে ভরে থাকে সমস্ত পরিবহ। অনর্গল বাতাসে মিশে থাকে নানান প্রজাতির পাখির রকমারি ডাক।

মনোযোগটুকু অটুট রেখে গণ্ডার দর্শনের অভিলাষ, চাঙ্গা করে রাখে নির্বাচিত এই সফরনামা। এই গরুমারা-খুনিয়া রেঞ্জের বেশ কয়েকটি গণ্ডার প্রতিপালিত হচ্ছে বনবিভাগের সঠিক তত্ত্বাবধানে। খুনিয়া বিট অফিসের গেটে গণ্ডারের ছবি আঁকা ‘সেভ ওয়াইল্ড’ লেখা নোটিস বোর্ড টাঙানো আছে। ওই নোটিস বোর্ডের সামনেই মোবাইলে তুলে রাখি নিজস্বী। বনবিভাগের অনুমোদিত গাইডের কাছে জেনে নিই গণ্ডারের রোজকার খাবারের মেনু হল, কচি ঘাস, চেপটি, নল, মালসা, ইকড়া, খয়ের গাছের ছাল। গণ্ডারের খড়্গ যখন খুব চিড়বিড় করে, তখন তারা নাকি শাল গাছের গুড়িতে ওই শক্ত খড়্গ ঘষতে থাকে। আর তাতেই তাদের সাময়িক আরাম অনুভূত হয়।

সমগ্র খুনিয়া জঙ্গলের উপস্থিতি মূর্তি নদীর অববাহিকা ঘেঁষা লাটাগুড়ি-চালসা-মূর্তি-ধুপঝোরা-বাতাবাড়ি-রমসই-কালিকাপূর-নেওড়া অ়ঞ্চল। চাপড়ামারি থেকে গরুমারা জঙ্গল যেতে মাঝে পড়বে খুনিয়া জঙ্গলের গহন সবুজ। খুনিয়া জঙ্গল থেকে চাপড়ামারি জঙ্গলের দূরত্ব মেরেকেটে এক কিলোমিটার মতো হবে। পশ্চিম ও পূর্ব ডুয়ার্সের মধ্যে সেতু হিসেবে রয়েছে খুনিয়া মোড়। এই খুনিয়া মোড় থেকে একটা পথ চলে গেছে বিন্দু ও ঝালং। বিন্দু হল এই অঞ্চলের শেষ জনপদ। তারপরই ভুটান সীমান্ত। খুনিয়া মোড় থেকে অন্য পথ গেছে বাতাবাড়ি জঙ্গল বসতি। তৃতীয় পথটি গেছে মালবাজার। এবং চতুর্থটি জলদাপাড়া।

খুনিয়ার নজরমিনারটির নাম চন্দ্রচূড় ওয়াচ টাওয়ার। যদিও এটি খুনিয়াওয়াচটাওয়ার নামেই সমাধিক পরিচিত। এক সময় জঙ্গলের মধ্যে খুনিয়া বস্তিতে বেশ কিছু পরিবার থাকত। অবশ্য তাদের পরে জঙ্গলের বাইরে পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছে। এখন খুনিয়া জঙ্গলের ভেতর কোনও বসতি নেই। এমনকী পর্যটকদের জন্যও কোনও থাকার ব্যবস্থা নেই। তবে যেটা আছে, তা হল গহীন জঙ্গলের এন্তার হাতছানি।

চন্দ্রচূড় নজরমিনার থেকে সবুজের বর্ণময়তার মধ্যে হাতি ও বাইসন দেখা বেশ সহজসাধ্য বলা যেতে পারে। চোখে পড়তে পারে একাকী বাইসন আপনমনে ঘাস খাচ্ছে। সাধারণত বাইসন দলবদ্ধ হয়ে থাকে। তবে দলছুট বাইসনদের বলা হয় মূলজারিয়া। বাইসন এমনিতেই আপাত নিরীহ তৃণজীবি প্রাণী হলেও দলছুট মূলজারিয়া খুব ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে। হাতি, বাইসন—এরা চাঁদনি রাতে সঙ্গম উপভোগ করে। তবে ওই চূড়ান্ত সঙ্গম মুহূর্তে ওরা যদি কোনও মতে বুঝতে পারে দূর থেকে কেউ লক্ষ করছে বা ক্যামেরায় ছবি তুলে রাখার ষড়যন্ত্র করছে, তা হলে ওরা কিন্তু দারুণ ক্ষেপে যায়। আর ওরা যদি একবার ক্ষেপে যায় তা হলেই সর্বনাশ। ওরা যে তখন কী পারে আর কী পারে না বোঝাই দুষ্কর।

নলবনে হাতির উচ্চতা সমান ঘাসজমিতে হয়তো কিছু একটা আনাগোনা আচমকা টের পেলেও দূর থেকে ঠিক ঠাহর হচ্ছে না হয়তো। কিছু পরে সেটা স্পষ্ট হল এক শৃঙ্গি গণ্ডার দম্পতি। খেয়ালে হেলেদুলে হয়তো আরও একটু দৃষ্টির নাগালে এল। খানিক পরেই দার্শনিক ঔদাসিন্যে একদিক ওদিক দেখল। থমকে দাঁড়াল কয়েক মুহূর্ত। আবার চরম উদাসীনতা দেখিয়ে আস্তে আস্তে ফিরে গেল ওপাশে ঘাসের আড়ালে।

গারুচিরা জঙ্গল

বেবাক অরণ্য চিরে বয়ে চলেছে দুটি পাহাড়ি নদী। সুক্তিখোলা ও খাগড়াখোলা, নিঃসীম সেই অরণ্য মাঝে কয়েক ঘর বসতি নিয়ে সারুচিরা। সেই চেনা পথ, চেনা জঙ্গলপথ উত্তরবঙ্গের দলগাঁও স্টেশন থেকে ষোলো কিলোমিটার দূরত্বে গারুচিরা, এক নিপাট বনজ ঠেক। বসবাসকারী মানুষজন অধিকাংশই নেপালি। কিছু মাত্র গুঞ্জরণকে সম্বল করে এক কোণে একটি নজরমিনার নিয়ে আড্ডার নিরলস আমেজ মেখে আমাদের আজগুবি সেই নিশিযাপন গারুচিরা ইকো ক্যাম্পে। যেখানে কেবল প্রকৃতিই সয়ম্বরা। বনআবাস থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরত্বে আছে মাকরাপাড়া কালীমন্দির। মন্দিরটি ভুটানের হোমটু নামের এক পাহাড়ের গায়েই। মন্দিরের পাশে সফেদ রঙা সবুজে ভুটানের সীমান্ত নির্দেশিত। কালীমন্দিরের একটু পেছনে গোমুট পাহাড় শীর্ষে রয়েছে এক বৌদ্ধ গুম্ফা। এক কালে এই বৌদ্ধগুম্ফায় যেতে হত চারশোরও বেশি সিঁড়ি টপকে। এখন যদিও ঢালাও পিচরাস্তা।

মাকড়পাড়া চা বাগানে প্রায়ই হাতির আনাগোনা। নাগরিক এ সভ্যতাকে সামান্য সময়ের জন্য অব্যহতি দিয়ে এই সব অরণ্যযাপনের অভিজ্ঞতাকে সুচারু রূপে জীবনের সঙ্গে যোগ করে হাতি দেখার উৎসুকতা গাঢ় হয়। বাংলোর চৌহদ্দির মধ্যে একটা সেগুন কাঠের নজরমিনার আছে। রাতে সেখান থেকে হাতি দেখার অভিজ্ঞতা তারিফ ছড়ায়। চা গাছের গোড়ায় বনসুম নামে এক প্রকার কচি ঘাস জন্মায়। হাতি দঙ্গলের উকিঝুঁকি তারই খোঁজে। আর এই দলে অবশ্যম্ভাবি কিছু দাঁতালও থাকবেই। চা বাগান দাপিয়ে ওরা ফিরেও যায়।

এ সব অঞ্চলে এক বার এসে পড়লে গন্তব্য থাকে না কোনও। তিরতির বয়ে চলা খাগড়াকোলা নদীর এক্কেবারে দোরগোড়ায় বান্দাপানি অরণ্য। রাত্রিবাসের জন্য মজুদ একটা দু’কামরার ইন্সপেকশন বাংলোও রয়েছে সেখানে। অদূরেই কয়েক ঘর বসতি নিয়ে বান্দাপানিগঞ্জ। আবারও জঙ্গলঘেরা মসৃণ সড়কপথ। তারপরই রেতি নদী। রেতি নদীকে পাশে রেখে পৌঁছে যাই সেগুন, জারুল, চিলনি, লাপচে গাছের বনজ ঘ্রাণ মাখা রেতি জঙ্গল। গাঢ় হয় নীরবতা। ছায়ারোদের প্রস্তাবে এই জঙ্গলও নিয়মমাফিক।

জঙ্গলের গোপন আড়ম্বরকে সঙ্গে নিয়ে পৌঁছে যাই কালাপানি নামের আরও এক জঙ্গলে। এখানকার কালী নদীর নিকষ কালো রঙা জল ঢেকে নিই মায়াকাজলে। এখানের মাটিও আশ্চর্যরকমের কালো। ধুন্ধুমার সেই কালাপানি জঙ্গলের জংলিপনায় বিকীর্ণ ওই কালো নদী। একটা থমথমে জঙ্গল মাহাত্ম্য ঘাই মারছে আদরমাখা ঢংয়ে।

চাপড়ামারি জঙ্গল

অবিরাম পাখির কুজন পরিবেশের নির্জনতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অরণ্যের গা ছমছমে রুদ্ধশ্বাসকে হাতিয়ার করে এ জঙ্গলপথে চলাফেরা। জঙ্গলে ঢুকতে হয় বনবিভাগের অনুমতি সাপেক্ষে বনবিভাগের গাড়িতে। পায়ে হাঁটা নৈব নৈব চ। অরণ্যের ভাঁজে ভাঁজে ছায়া। কখনও রোদের আরাম।

চিরতির বয়ে যাচ্ছে মূর্তি নদীর চেনা বহমানতা। মূর্তি নদীর সেতু পেরোতেই ক্রমশ ঝুঁকে এল দু’পাশে থোকা থোকা অরণ্য। ডান পাশে একটা কাঠ চেরাইয়ের কারখানা। জঙ্গলের কাঠ এখানে নিলাম করে বিক্রি হয়। খুনিয়া মোড় পাড় হয়ে আবারও জঙ্গল। প্রায় এখান থেকেই শুরু হয়ে গেল। চাপড়ামারি ওয়াইল্ড লাইভ স্যাংচুয়ারি এলাকা। অর্জুন বহেড়া শাল সেগুনের গুমোট ভারে পথ কিছুটা ছায়াচ্ছন্ন। ঘন গাছের প্রাচীর নিয়েই হঠাৎ মোরাম বিছানো পথটা চলে গেছে দোতলা বনবিশ্রামের কাছটিতে। এখানে এক রাত কাটাতে পারলে মানচিত্রে নির্ঘাত রদবদল ঘটতে বাধ্য।

অরণ্যচেরা যাত্রাপথে প্রায়শই চোখে পড়বে যত্রতত্র ময়ূরের ঝাঁক। শেষ বিকেলের রোদের ঝলক ওদের পেখমে যেন রঙিন আশ্বাস। ও জঙ্গলে রয়েছে গাউর, হাতি, চিতা, হরিণ ছাড়াও রয়েছে রকমারি প্রজাতির পাখপাখালি। ময়না, পাহাড়ি ময়না, বুলবুলি, কাঠঠোকরা, ঈগল, ঘুঘু, গ্রীন পায়রা আর জলা জায়গায় ফ্লেরিক্যান, বক, ব্ল্যাক পাইরিজ এমন হাজার খানেক পাখি। শীতের মরসুম পড়তে না পড়তেই চলে আসে ব্রাহ্মণী হাঁস, হর্নবিল, ড্রঙ্গো, গুইসলিং টিল, স্পুনবিল, হোয়াইট ব্রেস্টেড ওয়াটার হর্ন প্রভৃতি পরিযায়ী পক্ষিকূল। চাপড়ামারির তাবৎ জলা তখন ভরা থাকে ওদের দখলে।

চাপড়ামারির তিনতলার নজরমিনারটির নাম ‘ঈগল’। সামনের জলাশয়টিতে পাখিদের আনন্দ ও মৌরসীপাট্টা। প্রাকৃতিক এই জলাশয়টিকে খনন করে আরও খানিক বড় করা হয়েছে। জলে প্রচুর মাছ। পনকৌরি ছোঁ মেরে মাছ মুখে উড়ে গেল। এমন কত ছোট ছোট দৃশ্য। প্রসারিত দৃষ্টি আগলে সে মান্যগণ্য পরিখাজলে বিকেল ঘনায়। সূর্য পাটে যাওয়ার সময় হল বুঝি।

ভেসে যাচ্ছে অসমাপ্ত দিনলিপি। দীর্ঘ এই প্রকৃতিপাঠ প্রবণতায় ঘনঘটা নেই। শুধু চারপাশে জঙ্গলের ভূমিকা। চমকে দিয়ে এক জঙ্গল হরিণ এল জল খেতে। ফিরেও গেল তারপরই এল গাউর দম্পতি। ওদের একজনের পিঠে সারাটা সময় একটা সাদা বক বসে খুঁটে খুঁটে পোকা খাচ্ছে। গাউর দুটো জলে নেমে পড়ল। খানিক গা ভিজিয়ে আবার উঠে এল। ক্রমে আরও ছয়টি গাউর ওপাশে সল্টলিকে লবণ চাটতে এল। ওদের মধ্যে দুটো তো একদম বাচ্ছা। খানিক দূরে বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে কয়েকটি সম্বর। কয়েকটি আবার মিলিয়ে গেল হরিয়ালির বাঁকে। কৌতুহলী চোখ ধ্বস্ত করে সময়।

নিজস্ব ভূবন কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সীমাহীন নীরবতা শিখে, জেগে উঠি। নিসর্গ আর সৃষ্টির প্রহরে। এ ভাবেই আজন্মকাল।

চুকচুকি নজরমিনার পক্ষী-বীক্ষণ কেন্দ্র

লাটাগুড়ির রিসর্ট থেকে গাড়িতে হাইওয়ে ধরে প্রায় এক কিমি মত এলে চুকচুকি বিট। আরও ধীরে নৈঃশব্দ নামে। ঘিরে ধরে বলয়ের মতো করে। বিকেলের হাওয়ায় তখন বনের ঘ্রাণ। ঝিঁঝিঁ পোকাদের অক্লান্ত একটানা ডাক ভরে রাখি মোবাইল রেকর্ডিং এর অ্যাপসে। মাঝে মাঝে পাখিদের কুজন। কখনও এই প্রাকৃতিক শব্দতরঙ্গ চিরে হাইওয়ে দিয়ে গাড়ির হুস শব্দের জের। ব্যাস। এ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই, হট্ট নেই, কোলাহল নেই।

চুকচুকি পাখিমিনারকে পাখি দেখার মোক্ষম ঠেক বলা যেতে পারে। যারা পাখির ছবি দেখতে ভালবাসেন তাদের পক্ষে দারুণ পছন্দের স্পট। এখান থেকে স্থানীয় নানান পাখি ছাড়াও পরিযায়ী পাখিদেরও বিস্তর আনাগোনা। হাতির পিঠে চড়ে অন্য অভিজ্ঞতার শরিক হয়েও চলে আসা যায় চুকচুকি ওয়াচ টাওয়ারে। পাখির ডানার রং মেখে সকাল বিকেল হয় এ তল্লাটে। ইন্ডিয়ান হর্ন বিল, ড্রঙ্গো, ময়ূর, স্কারেল্ট মিনিভেট, স্পুনবিল, ফ্লাই ক্যাচার, এশিয়ান প্যারাডাইস সান ক্যাচার, ব্রাহ্মণী হাঁস, কাঠঠোকরা ইত্যাদি হরেক পাখিদের মুক্তাঞ্চল চুকচুকি। পাখির ডানায় কথা জমে।

জলদাপাড়া জঙ্গল

শাল, সেগুন, খয়ের, টুন, বহেড়া লালি গাছের একান্ত বনানী নিয়ে জলদাপাড়া। প্রায় দেড় শতাধিত এক শৃঙ্গি গণ্ডারের অবাধ রাজ্যপাট। অন্য বন্যপ্রাণ তো আছেই। মাদারিহাট মোড় থেকে খয়েরবাড়ি নেচারপার্ক। ও হলং বাংলোর প্রবেশপথ। এই মাদারিহাট থেকে আরও চব্বিশ কিলোমিটার ভেতরে টোটোপাড়াতে রয়েছে আদিম ও এককালে বিচ্ছিন্ন উপজাতি টোটোদের বাস।

তোর্সা নদীর সেতু জলদাপাড়া ও চিলাপাতা অরণ্যকে ভাগ করেছে। এই নদীর জল যখন কম থাকে দুই অরণ্য এপাড় ওপাড় করে বন্যপ্রাণীর দল। জঙ্গলের মেঠো পথ ধরে দফায় দফায় জঙ্গল সাফারি। আর আমাদের সজাগ ক্যামেরা ও অনুসন্ধানী চোখ। প্রায় সাত কিলোমিটার পথ সাঁতরে হলং বনবাংলো। সামনে তিরতির বয়ে চলা হলং নদী। হলং বাংলোর পাশেই রাইডিং পয়েন্ট থেকে হাতির পিঠে জঙ্গলদর্শন। নিবিড় বন আরও নিবিড় হয়। সরকারি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাতি ও তাদের মাহুতদের কাছে গণ্ডার দর্শন করানো পর্যটকদের সফল প্রাপ্তি। নেশাতুর প্রকৃতি আষ্ঠেপৃষ্ঠে বাঁধে প্রকৃতিপাগল পর্যটকদের।

গরুমারা জঙ্গল

বন আবাসের চোখের পাতায় টুপটাপ সবজে ইস্তাহার। ভোরের গা থেকে তখনও মোছেনি অন্ধকার। ‘গরুমারা প্রকৃতি পরিচিত প্রাঙ্গণ-এর বুকিং কাউন্টার থেকে অরণ্যপ্রবেশের পারমিট রিসর্ট মালিকই জোগাড় করে রেখেছিলেন। পারমিট দেখাতেই অরণ্যপ্রবেশের ছাড়পত্র মিলল। তারপরই ঘিরে ধরল দুই পাশের আদিম নিরন্ধ্র জঙ্গল। বশ্যতা না মানা বন্য সোঁদা গন্ধ। গাছের ফাঁকে গলে ধরে পড়া তির্যক অল্প আলো, কুয়াশা আমেজ। মূর্তি, জলঢাকা, ইনডং, গরাতি, বামনিঝোরা—এ সব নদীগুলিরই প্লাবিত ভূখণ্ড জুড়ে গড়ে উঠেছে গরুমারা জাতীয় উদ্যান। সরকারি ভাবে এই জঙ্গল জাতীয় উদ্যানের শিরোপা পেয়েছে ১৯৭৬ সালে। গরুমারা পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চম জাতীয় উদ্যান। হাতি, গাউর, সম্বর, চিতল, হগ ডিয়ার, বার্কিং ডিয়ার, বন্য শুয়োর, চিতা, বাইসন, বাঁদর, কাঁকর ইত্যাদি প্রাণীদের নির্ভিক চারণভূমি। জঙ্গলের তাবৎ গাছগাছালির শাখাপ্রশাখায় অজস্র প্রজাতির পাখপাখালির নিশ্চিন্ত আস্তানা। ময়ূর, হাড়গিলে, টিয়া, ময়না, চন্দনা, হাট্টাটি, গো বক, কোর্টে বক, ফুলটুসি, তোতা, ধনেশ, গৌরতোতা, চকাচিক, বনমোরগ, ঘুঘু, গ্রিন পায়রা। হরিতাল, মোহনচূড়া, নীলকণ্ঠ ইত্যাদি রকমারি পাখিদের সাজানো সংসার। আরও আছে নানা প্রজাতির সরীসৃপ। এ ছাড়া কীটপতঙ্গ, পোকামাকড়, প্রজাপতি, ঝিঁঝি—সুরম্য এই অরণ্যভূমে যে যার ভূমিকায়।

সেই থম ধরা গহীন অরণ্যে শাল, চিলৌনি, বহেড়া, ওদাল, রানিচাপ, জিওর, কাটুস, চিক, লালি, সিধা, অর্জুন, জারুল, গাওয়ার, হরতুকি, গামার, লাটৌর, সেগুন, খয়ের, শিরিষ, শিমূল এর বৃক্ষরাজি। আবার কোথাও ফাঁকা জমিতে ঔষধি গাছও বপন করা হয়েছে। একদিকে যেমন হাতির বসবাস উপযোগী হাতির পিঠ ছোঁয়া এলিফ্যান্ট গ্রাসের জঙ্গল রয়েছে, তেমনই চেপটি, মালসা, ইকড়া, ধাড়া, কাশিয়া, নল, পুরান্ডি, খাগরা প্রভৃতির জঙ্গলও রয়েছে। আবার হরিণ ও গণ্ডারের বিচরণক্ষেত্রের জন্য বিস্তীর্ণ তৃণক্ষেত্র।

থামি গরুমারা বনবিশ্রামাগারের সবুজ রঙা কাঠের বাড়িটির সামনে। খানিক ব্যবধানে বনকর্মীদের একসার কোয়াটার। এক পাসে পিলখানা অর্থাৎ হাতিদের বিশ্রামাগার। এই হাতিরা অবশ্যই সবাই পোষ্য। কয়েক পা এগিয়ে কাঠের তৈরি এক নজরমিনার, ‘রাইনো অবজারভার পয়েন্ট’। নজরমিনারটির গা ঘেঁষে খাদ। নীচ দিয়ে বয়ে চলেছে ইনডং নদী। ওপাড়ের ঘাসজমিতে গণ্ডার, গাউরদের রমণীয় বিচরণভূমি। বনবাংলোর চত্বরে বেশ কিছু বড়ে গাছের গায়ে বনদফতর সেই গাছের বৈজ্ঞানিক নাম চিহ্নিত করে রেখেছে, ওদাল, টুন, ভ্যান্ডা, লুসনি, লুসিয়া, ফিলিফরমিস এ রকম হরেক নাম।

জঙ্গলের আরও অন্দরমহলে যাত্রাপ্রসাদ ওয়াচটাওয়ার। রাস্তাটা চলে গেছে বামনী বিটের দিকে। খাদের কিনার ঘেঁষে নজরমিনারটি। নীচে কিছুটা তৃণভূমি। তার পরই বাঁক খেয়ে চলে গেছে মূর্তি নদী। নদীর বক্ষে মাঝে মাঝেই বালির চর। ওপাড়ে আদিগন্ত জঙ্গল। যাত্রাপ্রসাদ নজরমিনারের বেঞ্চে দু’চোখ দূরে প্রসারিত করে অপাঙ্গে চেয়ে থাকি। দিনের আলোয় চিকচিক করছে মূর্তি নদীর রূপোলী জলরেখা। জঙ্গল ফুঁড়ে কালো রঙের নড়াচড়া। ক্রমে সেগুলি আরও স্পষ্ট হয়—গাউর। কাছে দূরে অনেক। দূরে দূরে উংকি দেয় আরও কিছু চিতল। ক্রমে তারাও সংখ্যায় বাড়ে। নুন রাখা চৌবাচ্ছাগুলোর কাছে আনাগোনা করছে কিছু বন্যবরাহ। আমরা অবশ্য উসখুশ করছি গণ্ডার দেখার অভিলাষে।

গাইড ভদ্রলোকের কাছে মৃদু অনুযোগ করছি, গরুমারা জঙ্গলের যে এত নামজাক, যে গণ্ডারের জন্য তাকে কী না না থেকেই বিফল মনোরথে ফিরে যাব। উনি আমাদের অসহিষ্ণু হতে বললেন। হঠাৎই কিছুটা অস্পষ্ট হলেও এক জোড়া গণ্ডার চোখে পড়ল। ওরা কিন্তু সল্প লিংক পর্যন্ত এল না। দূরে জঙ্গলের ঝোঁপে উদয় হয়েই মিনিট কয়েক পর ফিরেও গেল। অবশ্য আমরা তাতেই বেশ উত্তেজিত। ও দিকে সেই গাইড ভদ্রলোকও কিছুটা যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন আমাদের গন্ডার দর্শন করাতে পেরে।

গুমোট জঙ্গলে পথ যত উদোম হয়, অদ্ভুত অচেনা আনন্দ। এই বনআবাস, বৃংহন, ঝিঁঝি ডাক, লতাগুল্মময় ছায়া। শ্বাশদ, বনজ ঘ্রাণ—চেনা হয় সবই। ডুয়ার্সের জঙ্গলের অন্তর্গত চুপিসার, সবুজ মসৃণতা, পরিযায়ী পাখিদের স্বরবিতান—ফেরার তাড়া নেই তেমন। শুধুই পান্থপদাবলি।

মেদলা নজরমিনার

মেদলা ওয়াচ টাওয়ার গরুমারা অভয়ারণ্যেরই অঙ্গ। বনবিভাগের গাড়ি যেখানে নামিয়ে দিল, সেখান থেকে শিশিরভেজা ছায়াপথ ধরে, মোষে টানা রঙিন আচ্ছাদন দেওয়া গাড়িতে পৌঁছতে হয় মেদলা নজরমিনার পর্যন্ত। ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নজরমিনারের এক্কেবারে উপরিতলে পৌঁছলে, চোখের সীমানায় ঘন সবুজের বুনোট। একপাশে বিস্তীর্ণ বালুচর দিয়ে বয়ে যাওয়া এক ক্ষয়াটে নদী। দূরে জঙ্গলে কিছু বাইসনের ঘোরাঘুরি।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement