পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে চির যুযুধান দুই পক্ষ এ বার একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতায় নামতে চলেছে। রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতার দাবিতে কে কত বেশি আন্তরিক, প্রতিযোগিতা সেটা নিয়েই।
সেপ্টেম্বরের শেষে দিল্লি সরকারের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্যের ক্ষমতা শীর্ষক একটি আলোচনাচক্রে যোগ দিতে দিল্লি আসছেন পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ, আপ নেতা অরবিন্দ কেজরীবালকে মাঝে রেখে একই মঞ্চ ভাগ করে নেবেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সিপিএম পলিটব্যুরো নেতা মানিক সরকার। রাজনৈতিক শিবিরের বক্তব্য, এই বৈঠকে আগে এক অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার কৌশল নিচ্ছে দুই পক্ষই। বিহার নির্বাচনের ঘনঘটা সামলে যদি সময় করতে পারেন তা হলে এই বৈঠকে যোগ দিতে আসবেন নীতীশ কুমারও।
গত মাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিল্লি সফরের সময়েই আসন্ন সম্মেলনটির রূপরেখা তৈরি হয়। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে এই রূপরেখাটি তৈরি হয় মূলত তৃণমূলনেত্রীর সঙ্গে তাঁর বাসভবনে অরবিন্দের বৈঠকের মাধ্যমে। স্থির হয়, অ-বিজেপি-অকংগ্রেসি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের নিয়ে একটি বৈঠক করা হবে। এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল মূলত দু’টি। খোদ নরেন্দ্র মোদীর ডেরায় বসে, বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারের উপর চাপ তৈরি করা। রাজ্যগুলির আর্থিক দাবিদাওয়া এবং অধিকারের প্রশ্নে কেন্দ্রকে চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করানো। পাশাপাশি, আরও একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ধর্মানিরপেক্ষ সমমনস্ক আঞ্চলিক দলগুলিকে একই ছাতার তলায় নিয়ে আসার চেষ্টা করা। ভবিষ্যতে কোনও রাজনৈতিক জোট তৈরি করার একটা ড্রেস রিহার্সাল সেরে নেওয়ার পরামর্শই নবীন রাজনৈতিক নেতা কেজরীবালকে দিয়েছিলেন অগ্রজা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
সূত্রের খবর, মমতা-কেজরীবাল বৈঠকের সময় কিন্তু আসন্ন সম্মেলনে সিপিএম থাকবে কি থাকবে না, তা নিয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে তখন কোনও উচ্চবাচ্যও করেননি আপ নেতা। কিন্তু মমতা কলকাতা ফিরে যাওয়ার পর সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরির সঙ্গে বেশ কয়েক বার আলোচনা হয় কেজরীবালের। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে আম আদমি পার্টির সরকার সংঘর্ষের পথে গেলে, সিপিএম তাকে নীতিগত ভাবে সমর্থন করার নীতি ইতিমধ্যে নিয়ে ফেলেছিল। এর পর মানিক সরকার নিজে দেখা করেন কেজরীবালের সঙ্গে। স্থির হয়, অন্যান্য মুখ্যমন্ত্রীর পাশাপাশি তিনিও থাকবেন ২৯ তারিখের বৈঠকে।
বিষয়টিকে কী ভাবে দেখছে যুযুধান দুই পক্ষ? সিপিএমের এক শীর্ষ সূত্রের বক্তব্য, এটি কোনও রাজনৈতিক দলের সম্মেলন নয়, দিল্লি সরকার আয়োজিত মুখ্যমন্ত্রী সম্মেলনে। যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মুখ্যমন্ত্রী এমন বৈঠকে যেতেই পারেন। এর আগেও প্রধানমন্ত্রীর ডাকা মুখ্যমন্ত্রী সম্মেলনে বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী (তাঁরা বিভিন্ন দলের হলেও) বিজ্ঞানভবনে একইসঙ্গে উপস্থিত থেকেছেন। পাশাপাশি, আরও একটি যুক্তিও দিচ্ছে রাজ্য সিপিএমের একটি বড় অংশ। সিপিএমের দাবি, অন্যান্য আঞ্চলিক দলের বহু আগে থেকেই রাজ্যের হাতে অধিক ক্ষমতার দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছিলেন বাম নেতৃত্ব। তাঁদের দাবি, বহু দশক আগে যখন এটি নিয়ে পার্টি কংগ্রেসের দলিল তৈরি হয়, তখন অন্য কোনও রাজনৈতিক দল বিষয়টি নিয়ে আন্দোলন দূরস্থান, রা-ও কাড়েনি। ফলে এই বিষয়ে মমতা বা কেজরীবালকে ফাঁকা মঞ্চ ছেড়ে দিয়ে চলে আসা মুর্খামি হবে।
অন্য দিকে তৃণমূল শিবির অবশ্য মনে করছে, কে বা কারা সে দিন বৈঠকে উপস্থিত থাকছেন সেটা কোনও বিষয়টি নয়। কারণ, সাম্প্রতিক অতীতে আঞ্চলিক দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। তা কখনও ফলপ্রসূ হচ্ছে, কখনও নয়। উদাহরণস্বরূপ গত মাসে দিল্লিতে মমতার নেতৃত্বে শরদ পওয়ারের বাড়িতে বৈঠকের কথাও তুলে ধরছে তৃণমূল। তৃণমূলের লোকসভার নেতা সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘কেজরীবাল যে কেন্দ্র-বিরোধিতার রাজনীতি করছেন এবং আগামী দিনে এ ব্যাপারে আঞ্চলিক দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছেন, তার ভিতটা গত মাসে এসে তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই। রাজ্য সরকার যেমন বহু ব্যাপারে কেন্দ্র মুখাপেক্ষী সে ভাবেই কেন্দ্রকেও অনেক বিষয়ে রাজ্যের উপর নির্ভরশীল থাকতে হয়। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতার দিকটিই আমাদের নেত্রী বার বার কেন্দ্রকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছেন।’’