কেউ নাটক লেখেন, কেউ আবার ভীষণ ভাল ছবি আঁকেন। কারও অভিনয় দেখে হাততালিতে ফেটে পড়ে অডিটোরিয়াম। তারপর এক দিন সকলকেই জায়গা ছেড়ে দিতে হয় সময়ের নিয়মে। কেউ খবর রাখে না কোথায় হারিয়ে যান সেই সব প্রতিভাবান মানুষ। বহু শিল্পীই দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করতে করতে এক দিন কার্যত অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় কোনও সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় মারা যান।
দিল্লির বুকেই এমন কিছু ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের। ধাক্কা দিয়েছিল বেশ কয়েকটি নাটকের দলকেও। এই সব দুঃস্থ শিল্পীর জন্য কিছু করার কথা সকলেই ভাবছিলেন। এ বার নিঃশব্দে শিল্পের জন্য কাজ করে যাওয়া দুঃস্থ শিল্পীদের চিকিৎসার খরচ বহনের জন্য এগিয়ে এল দিল্লির বেঙ্গল আস্যোসিয়েশন। হাতে হাত মিলিয়ে এই কর্মযজ্ঞে যোগ দিয়েছেন গ্রিনরুম থিয়েটার-সহ রাজধানীর অন্যান্য নাট্যদলের কর্মীরা। দিল্লির দুঃস্থ বাঙালি শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সাহায্যার্থে নাট্যোৎসবের আয়োজন করেছে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন। প্রতি মাসের একটি নির্দিষ্ট দিনে নিয়মিত মুক্তধারা মঞ্চে দিল্লির নাটকের দলগুলির একটি করে নাটক দেখানো হবে। টিকিট পিছু ২০০ টাকা সাহায্য চাওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া, যার যেমন ইচ্ছা আর্থিক সাহায্যও করতে পারেন। নাটকের টিকিট এবং অনুদান থেকে যে আয় হবে, তা একটি তহবিলে জমা হবে। এই তহবিল থেকেই দুঃস্থ শিল্পী ও সংস্কৃতি-কর্মীদের সাহায্যার্থে খরচ করা হবে। ১০ লক্ষ টাকার তহবিল তৈরির করার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন। একসময় মহানায়ক উত্তমকুমার টালিগঞ্জের দুঃস্থ শিল্পীদের জন্য এমনই একটি তহবিল গড়ায় উদ্যোগী হয়েছিলেন। সেই উদ্যোগই অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনকে, জানালেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক তপন সেনগুপ্ত।
প্রায় ২৪ লক্ষ বাঙালির বাস রাজধানীতে। কয়েক কোটি টাকা খরচ হয় দিল্লির ৭০০টি দুর্গাপুজোয়। কিন্তু ৩০০-৫০০ টাকা খরচ করে বাংলা নাটক দেখার কথা ভাবলে অনেকেই পিছিয়ে যান। তাই দিল্লিতে বাংলা শিল্প ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার সাধনায় যাঁরা ব্রতী, তাঁদের লড়াইটা অনেক বেশি। এমনিতেই যাঁরা শিল্পসাধনা করেন, তাঁদের সিংহভাগ লক্ষীর কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হন। এ দিকে চিকিৎসার খরচ যে ভাবে বেড়েছে, তাতে উচ্চবিত্তরাই নাজেহাল হয়ে পড়ছেন। দুঃস্থ শিল্পীদের অবস্থা আরও করুণ।
কলকাতার অভিনেতা চন্দন সেনের ক্যান্সারের চিকিৎসার বিশাল ব্যয়ভার বহন করার জন্য সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন অভিনেতার শুভানুধ্যায়ীরা। তাঁর মতো নামী শিল্পীদেরও চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনের জন্য আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন। যে শিল্পী দিনের পর দিন তাঁর অভিনয়ের মাধ্যমে শিল্পমনস্কদের মনের খোরাক জুগিয়েছেন, আনন্দ দিয়েছেন, তাঁরও অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন। কিছু দিন আগেই এক নামী মডেলকে রাস্তার ধারে মানসিক ভাবে অসুস্থ অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। অনাহারে তিনি তখন মৃতপ্রায়। তাঁর সাহায্যে অবশ্য এগিয়ে এসেছিল একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। বলিউডের অভিনেত্রী অন্তরা মালির বাবা ও একসময়ের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার জগদীশ মালিকেও একই অবস্থায় রাস্তার ধারে পাওয়া গিয়েছিল। একসময়ে এঁরাই নিজেদের শিল্পকলা দিয়ে মাতিয়ে রাখতেন দর্শককে। লাইট, ক্যামেরা আর অ্যাকশনের চোখ ধাঁধানো গ্ল্যামারের শেষে তাঁদের স্থান হয়েছিল রাস্তার ফুটপাথে। যাঁরা নিঃশব্দে শিল্পের জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিচ্ছেন তাঁদের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ।
‘গ্রিনরুম থিয়েটার’-এর কর্ণধার অঞ্জন কাঞ্জিলাল জানান, চোখের সামনে দু’-তিন জন দুঃস্থ শিল্পী-পরিবারের মর্মান্তিক হাল দেখার পরই তাঁরা এ বিষয়ে কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন। তাই বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন তাঁরা। এগিয়ে এসেছে দিল্লির আর একটি নাটকের দল ‘আমরা কজন’। সেই দলের রবিশঙ্করও বলছেন, দিল্লির পুরনো নাট্যদলের অনেক বর্ষীয়ান অভিনেতা বা নাট্যকর্মীকে চোখের সামনে অর্থের অভাবে তিলে তিলে ক্ষয়ে যেতে দেখেও এত দিন কেউ কিছু করে উঠতে পারেননি। নাটকের দল ‘স্বপ্ন এখন’-এর শমীক রায় বলেন, দিল্লিতে বাংলা নাটক করে রোজগার করা বেশ কঠিন। তাই যাঁরা শুধু নাটক নিয়ে থাকেন তাঁদের পক্ষে সংসার চালানোই দুঃসাধ্য। চিকিৎসার বিশাল খরচ চালানো আরও কঠিন। বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের তপনবাবু বলেন, ‘‘দিল্লির বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠী নিজেদের নাটক প্রদর্শনের সুযোগ পাবে। আবার সংগৃহীত অর্থ এক দিন বিশেষ প্রয়োজনে আর এক জনের জীবনরক্ষায় কাজে লাগবে।’’