রাষ্ট্রপতি ভবনে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৃহস্পতিবার। ছবি: পিটিআই।
প্রসঙ্গ অসহিষ্ণুতা।
একজন মুখ না খুলেও বলে দিলেন অনেক কথা। অন্য জন সরাসরি প্রসঙ্গ টেনে আনলেন তো বটেই, সেই সঙ্গে অভিযোগের তির নিজেদের দিক থেকে ঘোরাতে একটা গোটা পুস্তিকাই ছাপিয়ে ফেললেন!
প্রথম জন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দ্বিতীয় জন তাঁরই দলের সভাপতি অমিত শাহ।
অসহিষ্ণুতা নিয়ে দেশজোড়া বিতর্কের জেরে বিশিষ্ট জনেদের জাতীয় পুরস্কার ফেরানোর ধারা অব্যাহত। আজও লেখিকা অরুন্ধতী রায় এবং দু’ডজন পরিচালক জাতীয় পুরস্কার ফেরানোর কথা ঘোষণা করেছেন। এ দিনই সহিষ্ণুতা প্রসঙ্গে মুখ খুলেছেন দেশের ভাবী প্রধান বিচারপতি টি এস ঠাকুরও। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ক’দিন আগেই সহিষ্ণুতার বার্তা দেন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তার পরেই অসহিষ্ণুতা নিয়ে মোদী-সরকারের সমালোচনা করে তাঁর দ্বারস্থ হন কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধী।
আজ সেই রাষ্ট্রপতির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর অকুণ্ঠ প্রশংসা করে মোদীর মন্তব্য, ‘‘প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমার সব থেকে বড় লাভ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ।’’ যা শোনার পরে অনেকেই বলছেন, এ আসলে বোঝানো যে, সহিষ্ণুতা নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একমত তিনিও। ঘটনাচক্রে এ দিনই সঙ্ঘ পরিবারও মোদী-সরকারকে বাঁচাতে আসরে নেমে সহিষ্ণুতারই বার্তা দিল। সঙ্ঘ-প্রধান মোহন ভাগবত এ দিন বলেন, ‘‘আমরা সবাই এক। আর বৈচিত্রই আমাদের পরিচিতি।’’
আর মোদীর দলের সভাপতি অমিত শাহ? অসহিষ্ণুতা প্রশ্নে কংগ্রেস নেতৃত্ব ও সমালোচকদের দিকে সরাসরি তোপ দেগে দিলেন! বাদ গেলেন না পুরস্কার-ফেরানো বিশিষ্ট জনেরাও! অসহিষ্ণুতা প্রশ্নে লাগাতার সমালোচনায় বিদ্ধ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব দ্বিমুখী কৌশলকে হাতিয়ার করে আসরে নামলেন বিহার ভোট শেষ হতেই। যদিও সমালোচনা থামেনি। এ দিনই উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতা ফেরার পথে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মোদী-সরকারের নাম না করে বলেন, ‘‘গত দেড়-দু বছর ধরে দেখছি, নানা অছিলায় অনৈতিক মন্তব্য হচ্ছে। এখন কে কী খাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। কাউকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে বলা হচ্ছে। আমার তো মনে হয় এটা অনৈতিক।’’
এ দিন কী বলেছেন প্রধানমন্ত্রী?
রাষ্ট্রপতি ভবনে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে মোদী বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপতি নিজেই একজন বিশ্ববিদ্যালয়। জ্ঞানের সমুদ্র। প্রধানমন্ত্রী হয়ে আমার সবথেকে বড় লাভ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ।’’
কিন্তু মোদীর মুখে রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে কেন বেনজির প্রশস্তিবাক্য?
অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে এ পর্যন্ত ৫০-এরও বেশি বিশিষ্ট জন ফিরিয়েছেন জাতীয় পুরস্কার। সেই তালিকায় নাম তুলে লেখিকা-সমাজকর্মী অরুন্ধতী রায় আজ বলেন, ‘‘যদি স্বাধীন ভাবে মত প্রকাশের অধিকার না থাকে, তা হলে সমাজ মেধার অপুষ্টিতে ভুগবে।’’ ‘জানে ভি দো ইয়ারো’-খ্যাত কুন্দন শাহ, সইদ মির্জা-সহ ২৪ জন পরিচালক এ দিনই জানিয়েছেন, অসহিষ্ণুতার প্রতিবাদে তাঁরা জাতীয় পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন। আবার দেশের ভাবী প্রধান বিচারপতি টি এস ঠাকুর আজ বলেন, ‘‘দেশে সহিষ্ণুতা বজায় রাখা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও স্থিতিশীল রাখতে হবে। তবেই ভারত মহাশক্তি হওয়ার পথে এগোতে পারবে।’’
মোদী-অমিত শাহরা মনে করেন, বিশিষ্ট জনেদের প্রতিবাদের পিছনে রয়েছে কংগ্রেস ও বামপন্থী মতাদর্শ। এঁদের সামনে রেখেই কংগ্রেস মোদী সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে। বিজেপির কৌশল হল, একদিকে মানুষকে বোঝানো, কোনও ঘটনার জন্যই তারা দায়ী নয়। অন্য দিকে প্রচার করা যে, কংগ্রেসই ছয় দশক ধরে অসহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে।
এখন মোদী-সরকারের উন্নয়নের পথে কাঁটা হতে অসহিষ্ণুতার তাস খেলছে।
বিজেপি নেতৃত্বের ব্যাখ্যা, এ দিন প্রণববাবুর প্রশংসা করে মোদী বোঝালেন, সনিয়া তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে নালিশ করলেও তিনি নিজে সহিষ্ণুতারই পক্ষে। রাষ্ট্রপতি প্রথম মুখ খোলার পরেই বিহারের প্রচারে গিয়ে মোদী বলেছিলেন, তিনি রাষ্ট্রপতির দেখানো পথ অনুসরণ করবেন। আজ সরাসরি সহিষ্ণুতার প্রসঙ্গ না তুললেও মোদী বলেন, ‘‘যখনই আমি ওঁর সঙ্গে দেখা করি, উনি সব বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ব্যাখ্যা করে দেন।’’
বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘‘যে রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়ে ক’দিন আগে সনিয়া নালিশ করে এসেছিলেন, সেখানে দাঁড়িয়েই আজ প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিনি ঘন ঘন দেখা করেন। তাঁর থেকে নিরন্তর পরামর্শ নেন। ফলে সনিয়া গাঁধী হাজার নালিশ করেও কিছু হবে না!’’
অসহিষ্ণুতা নিয়ে কংগ্রেসকে পাল্টা নিশানা করতে অমিত শাহ যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন, তার বক্তব্য, ‘কেউ বিভ্রান্ত হচ্ছেন, কাউকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। কেন তথাকথিত বিদ্বজনেরা তখন নীরব আর এখন সরব?’ এই পুস্তিকার একাধিক ঘটনা তুলে বলা হয়েছে, কংগ্রেস জমানাতেও অসহিষ্ণুতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তখন কেউ পুরস্কার ফিরিয়ে দেননি। যার প্রতিবাদ করে কুন্দন শাহ বলেন, ‘‘কংগ্রেসের বিরুদ্ধেও আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছি।’’ কিন্তু বিজেপি নেতা বেঙ্কাইয়া নায়ডুর পাল্টা বক্তব্য, ‘‘কংগ্রেস ও তাদের মদতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ফুলেফঁপে ওঠা বাম চিন্তাধারায় পুষ্ট ব্যক্তিরাই
আজ অসহিষ্ণু!’’