সময় বদলায়, রাজ্য বদলায়, বদলায় না ট্র্যাডিশন। ফের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে নাটকের অভিনয় বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠল। অকুস্থল এ বার ত্রিপুরা। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা এক নাট্যদলের নাটকের পরপর দু’টি শো আচমকাই বাতিল করে দেওয়া হল। প্রথমে গত ১৩ ডিসেম্বর খোয়াইয়ের কমলপুর, তার পর আজ রাজধানী আগরতলাতেও বাতিল হয়ে গেল নাটকের শো। গোটা ঘটনার নেপথ্যে ত্রিপুরার শাসক দল সিপিএম কলকাঠি নেড়েছে বলেই অভিযোগ বিরোধীদের।
পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগরের নাট্যগোষ্ঠী ‘নাট্যমুখ’ ত্রিপুরায় এসেছিল তাদের ‘নেমেসিস’ নাটকটি নিয়ে। ইতিমধ্যেই ‘নেমেসিস’ মঞ্চস্থ হয়েছে ধর্মনগর, কৈলাশহর এবং খোয়াইয়ে। নাট্যদলের অভিযোগ, এর পর যত রাজধানী অভিমুখে আসতে চেয়েছে ‘নেমেসিস’, ততই আসতে শুরু করেছে বাধা। পরিচালক অভি চক্রবর্তীর অভিযোগ, গত ১৩ ডিসেম্বর কমলপুরের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নাটকটি শেষ মুহূর্তে মঞ্চস্থ করতে দেননি। আজ আগরতলায় সরকারি মঞ্চ নজরুল কলাক্ষেত্রে মঞ্চস্থ হওয়ার কথা ছিল ‘নেমেসিস’। কোনও ‘অজানা’ কারণে সেই শো-ও বাতিল করে দেওয়া হয়।
কেন তাঁরা এমন আশঙ্কা করছেন?
নাট্যদলের অভিযোগ, রাজ্যের বামপন্থী দর্শকদের একাংশ ‘নেমেসিস’কে মেনে নিতে পারেননি। তাই নিয়মিত নাটকটির বিরূপ সমালোচনা করা হয়েছে। শো বন্ধের মাধ্যমে সেই বিরূপ মনোভাবই চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে তাঁদের মত। ‘নেমেসিস’-এ রয়েছেটা কী? পরিচালক অভি চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘কী ভাবে শাসক গোষ্ঠী একটি শিল্পীকে তথা শিল্পীর শিল্পসত্তাকে নষ্ট করে দেয়, আমাদের নাটক সে কথাই বলার চেষ্টা করেছে।’’ তাঁর মতে, বিশ্বের সর্বত্রই এমন ঘটনা ঘটছে। ইতিহাসের পাতাতেও এ রকম বহু ঘটনা রয়েছে।’’
অবশ্য পশ্চিমবঙ্গের গত দশ-পনেরো বছরের ইতিহাস ঘাঁটলেই ত্রিপুরার মতো ঘটনার নজির একাধিক মিলবে। ‘সংস্কৃতিপ্রেমী’ বলে পরিচিত বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলেই চাপের মুখে বন্ধ হয়েছিল (অধুনা মন্ত্রী) ব্রাত্য বসুর লেখা নাটক ‘উইঙ্কল টুইঙ্কল’-এর শো। নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিল আর এক নাট্যব্যক্তিত্ব, বর্তমানে তৃণমূল সাংসদ অর্পিতা ঘোষের নাটক ‘পশুখামার’ও। আবার তৃণমূল জমানায় কোচবিহারের দিনহাটায় অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত ‘সেতুবন্ধন’ নাটকের শোয়ে ‘মা’ ও ‘মাটি’ শব্দ দু’টির ব্যবহার নিয়ে দর্শকাসন থেকে আপত্তি তুলেছিলেন শাসক দলের কর্মীরা। পাশাপাশি, দুই জমানাতেই শাসকের কোপে পড়েছে বেশ কিছু চলচ্চিত্র। ত্রিপুরার ঘটনা প্রসঙ্গে অনেকে আবার আরও একটু পিছিয়ে উৎপল দত্তের ‘টিনের তলোয়ার’ নাটক নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস সরকারের আপত্তির কথাও মনে করিয়ে দিয়েছেন।
ত্রিপুরা সরকারের বক্তব্য কী?
রাজ্যের তথ্য-সংস্কৃতি মন্ত্রী ভানুলাল সাহা প্রথমে বলেন, ‘‘শুনেছি নাটকটি ক’দিন আগে রাজ্যের অন্যত্র যখন মঞ্চস্থ হয়, তখন কিছু দর্শক আপত্তি তোলেন। তবে আজকে কেন নাটকটি মঞ্চস্থ হল না, তার কারণ আমার জানা নেই।’’ পরে মন্ত্রী নিজেই ফোন করে জানান, ‘‘নজরুল কলাক্ষেত্র কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, মঞ্চটিতে বিদ্যুত্ সংযোগের সমস্যা চলছে। তাই কোনও অনুষ্ঠান করা যাবে না।’’ সরকারি প্রেক্ষাগৃহগুলি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছে রাজ্য সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত একটি সংস্থা। সেই সংস্থার চেয়ারম্যান মিহির দেব তাঁকে এই কথা জানিয়েছেন বলে ভানুবাবুর দাবি।
যদিও এই ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে ভানুবাবু নিজেই বলেন, ‘‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কোনও সাংস্কৃতিক মঞ্চে বা প্রেক্ষাগৃহে কারও বুকিং থাকলে তা কোনও ভাবেই বাতিল করা যায় না। এমনকী সরকারি অনুষ্ঠানের কারণেও তা সম্ভব নয়।’’ ‘নাট্যমুখ’-এর তরফে নজরুল কলাক্ষেত্র ‘বুক’ করা হয়েছিল প্রায় আড়াই মাস আগে। অনেকের প্রশ্ন, প্রেক্ষাগৃহে যদি সত্যিই বিদ্যুৎ সংক্রান্ত সমস্যা থাকে, তা হলে তা এত দিন কেন চেপে রাখা হল? আর তা একেবারে শেষ মুহূর্তেই বা জানানো হল কেন?
‘নেমেসিস’-এর পরিচালকের কথায়, ‘‘ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামা অনুমোদিত নাটকও যদি মঞ্চস্থ করতে না দেওয়া হয় আগরতলায়, তা হলে বোঝাই যাচ্ছে কী সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যে রাজ্যবাসী রয়েছেন!’’ তাঁর দলের এক সহকর্মী বলেন, ‘‘অত্যন্ত দুঃখজনক অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যাচ্ছি। শহরের কোনও নাট্যকর্মীও আমাদের হয়ে কোনও কথা বলতে এগিয়ে এলেন না!’’