বদলের একুশে মেলালেন বহু অঙ্ক

নানা রকম দায়ে মন্ত্রিসভা বহরে ফুলেফেঁপে উঠলেও এক ঢিলে অনেক পাখি মারার চেষ্টা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। শিবসেনার বিরূপ মতিগতি দেখেও তাদের অনন্ত গীতেকে ভারী শিল্পে রেখে দিয়ে মন্ত্রক বণ্টন সেরে ফেললেন নতুন ২১ জন মন্ত্রী শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন শরিকি বা কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছেই নতি স্বীকার করতে নারাজ বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা এই সরকার।

Advertisement

দিগন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১০ নভেম্বর ২০১৪ ০৩:২৪
Share:

নানা রকম দায়ে মন্ত্রিসভা বহরে ফুলেফেঁপে উঠলেও এক ঢিলে অনেক পাখি মারার চেষ্টা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

Advertisement

শিবসেনার বিরূপ মতিগতি দেখেও তাদের অনন্ত গীতেকে ভারী শিল্পে রেখে দিয়ে মন্ত্রক বণ্টন সেরে ফেললেন নতুন ২১ জন মন্ত্রী শপথ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিলেন শরিকি বা কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছেই নতি স্বীকার করতে নারাজ বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা এই সরকার। গত পাঁচ মাস যাঁরা মন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন, তাঁদের কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন ভাবে বেশ কিছু মন্ত্রকের বিলি বাঁটোয়ারা করলেন মোদী। তাতে কারও গুরুত্ব কমেছে। কারও বা বেড়েছে। কারও কারও চাপ কমানো হলেও ব্যতিক্রম অরুণ জেটলি। মন্ত্রিসভার ‘অঘোষিত’ দু’নম্বর ব্যক্তিটির হাত থেকে প্রতিরক্ষার বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে তা মনোহর পর্রীকরকে দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রকে জেটলি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পেলেন যশবন্ত সিন্হার পুত্র জয়ন্ত সিন্হাকে। কিন্তু অর্থের সঙ্গে এখন আবার তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের বাড়তি দায়িত্ব চাপল জেটলির উপরে। যাঁর সঙ্গে বরাবরই সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক বেশ ভাল।

তবে এ দিন ২১ জন নতুন মুখকে মন্ত্রিসভায় সামিল করার সময় মোদী সুচিন্তিত ভাবে প্রথমেই যে কাজটি করেছেন, তা হল প্রধান চার মূর্তিকে বেছে নেওয়া। মনোহর পর্রীকর, সুরেশ প্রভু, জগৎপ্রকাশ নড্ডা ও চৌধুরি বীরেন্দ্র সিংহ।

Advertisement

মোদী মন্ত্রিসভার এই চারটি মূর্তির মধ্যে গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মনোহর পর্রীকরই যে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠতে চলেছেন, সেই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আজ শপথ গ্রহণের আগে পর্রীকর শিবির থেকে এমনও রটে যে, প্রতিরক্ষা নয়, রাজনাথ সিংহকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ভার পেতে চলেছেন তিনি। পরে রাজনাথ শিবির অবশ্য তা খণ্ডন করে। কিন্তু রাইসিনা হিলের শীর্ষ চারে পর্রীকরকে নিয়ে আসতেই তাঁকে গোয়া থেকে দিল্লির টিকিট দিয়েছেন মোদী। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির উপর থেকে গুরুভার কমাতে প্রতিরক্ষাই দেওয়া হয়েছে তাঁকে।

পর্রীকরের পরেই যিনি মন্ত্রিসভায় আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠতে চলেছেন, তিনি সুরেশ প্রভু। সাতসকালেই শিবসেনা থেকে তাঁকে ইস্তফা দিইয়ে বিজেপিতে এনেছেন মোদী। এত দিন শিবসেনায় থাকলেও আসলে হয়ে উঠেছিলেন মোদীর ঘনিষ্ঠদের এক জন। জি-২০ সংক্রান্ত কাজের জন্য সাউথ ব্লকে তাঁকে একটি দফতরও দেওয়া হয়েছে। জল্পনা মতো রেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রক তুলে দেওয়া হয়েছে তাঁর হাতে। রবিশঙ্করের হাতে শুধু টেলিকম রেখে সদানন্দ গৌড়াকে আইন মন্ত্রকটি দেওয়া হয়েছে রেলের বদলে। কার্যত অবনমন হল গৌড়ার। কারণ, বিজেপির অনেকেই বলে থাকেন, মন্ত্রী যিনিই হোন, আইন মন্ত্রকটা কার্যত জেটলিই দেখেন।

আর রয়েছেন নড্ডা। অমিত শাহের সঙ্গে সভাপতি পদের দৌড়েও ছিলেন হিমাচলের এই মন্ত্রী। নিতিন গডকড়ী জমানায় দলের কেন্দ্রীয় টিমে আসার পর থেকে সাংগঠনিক শক্তির পরিচয় দিয়েছেন। আর লোকসভা ভোটের সময় কংগ্রেস থেকে আসা হরিয়ানার জাঠ নেতা বীরেন্দ্র সিংহের মতো অভিজ্ঞ নেতাকেও পূর্ণমন্ত্রী করে নিয়ে এসে মোদী বার্তা দিলেন, অন্য দল থেকে এসেও বিজেপিতে যোগ্য মর্যাদা পাওয়া যায়। হর্ষ বর্ধনকে মন্ত্রিত্ব থেকে মুক্ত করে দিল্লির আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ফের তাঁকে দলের মুখ করার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর হাতে থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রক পেয়েছেন নড্ডা। হর্ষ বর্ধনের হাতে আপাতত বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও ভূবিজ্ঞান।

কিন্তু এই চার মূর্তিকে পূর্ণমন্ত্রী করার সময় প্রধানমন্ত্রী আরও যে দু’টি বিষয় নজরে রেখেছেন, সেটি হল তাঁদের যোগ্যতা ও স্বচ্ছ ভাবমূর্তি। সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই চার জনই অভিজ্ঞ এবং ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল। কিন্তু বিজেপির শীর্ষ নেতারা বলছেন, “মন্ত্রিসভায় বাকিদের বেছে নেওয়ার সময়ও মোদী স্বচ্ছ ভাবমূর্তির বিষয়টি মাথায় রেখেছেন। কিন্তু এই চার জন ছাড়াও বাকি যে ১৭ জনকে (এর মধ্যে তিন জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী) মন্ত্রিসভায় সামিল করা হয়েছে, তাঁদের বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও অনেক বিষয় খেয়াল রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী।”

এক, সুরেশ প্রভুকে বিজেপিতে সামিল করিয়ে মন্ত্রী করায় শিবসেনার জন্য মাত্র একটি মন্ত্রক রেখেছিলেন মোদী। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতেও বলা হয়েছে, অনিল দেশাই আসেননি বলে শপথ নিতে পারেননি। শিবসেনার অনন্ত গীতেকে ভারী শিল্প মন্ত্রকে রেখে দিলেও শরিকদের মোদী স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, স্তাবকতা, চাপের রাজনীতি বা জোট-বাধ্যবাধকতা নয়, মোদী সরকারে যোগ্যতাই শেষ কথা। জয়ললিতার চাপে অটলবিহারী বাজপেয়ী, করুণানিধির চাপে সনিয়া গাঁধী যে ভাবে মাথা নোয়াতেন, সে পথে হাঁটবেন না তিনি।

দুই, কিছু বর্ষীয়ান অভিজ্ঞ মুখ রাখা হলেও গোটা মন্ত্রিসভাকে ধীরে ধীরে তারুণ্যে মুড়ে দিতে চাইছেন প্রধানমন্ত্রী। পর্রীকর, সুরেশ প্রভু, নড্ডা থেকে মন্ত্রিসভার নতুন মুখের সিংহভাগই ষাটের নীচে। বাবুল সুপ্রিয়, রাজ্যবর্ধন রাঠৌর, জয়ন্ত সিন্হার মতো নবীন মুখকেও তাই প্রতিমন্ত্রী করে নিয়ে এসেছেন মোদী।

তিন, অন্য দল থেকে এসে বিজেপিতে যোগ দিলেও তাঁরা যে বিজেপিতে অচ্ছুত নন, সেটিও মোদী আজ বুঝিয়ে দিয়েছেন। ক্যাবিনেট মন্ত্রী হিসেবে হরিয়ানার জাঠ নেতা বীরেন্দ্র সিংহ তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। প্রায় চার দশক কংগ্রেসে থাকার পরে ভোটের মুখে বিজেপিতে আসা এই নেতাকে মন্ত্রিসভায় গুরুত্ব দিয়ে বিরোধী দলের উপরেই পাল্টা চাপ তৈরি করলেন তিনি। একই ভাবে আরজেডি থেকে বিজেপিতে এসে ভোটে লালুর মেয়ে মিসাকে হারিয়েছেন রামকৃপাল যাদব। তাঁকেও প্রতিমন্ত্রী করা হল।

চার, মোদী যতই অখণ্ড ভারতের কথা বলুন, শেষমেশ অবশ্য আঞ্চলিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতে হল প্রধানমন্ত্রীকে। এ দিন বিহার থেকে ৩ জন, উত্তরপ্রদেশ থেকে ৪ জন, রাজস্থান-মহারাষ্ট্র-গুজরাত থেকে ২ জন করে এবং হিমাচল, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, পঞ্জাব, ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানা, পশ্চিমবঙ্গ ও গোয়া থেকে এক জন করে মন্ত্রী করতে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রত্যাশা পূরণের জন্যই নয়, অদূর ভবিষ্যতে দলের সম্প্রসারণের যে রণকৌশল তৈরি করেছে মোদী-অমিত জুটি, তার অঙ্গ হিসেবেই ঢেলে সাজলেন মন্ত্রিসভা।

পাঁচ, সামনেই কয়েক রাজ্যে বিধানসভা ভোট। সে কথা মাথায় রেখে জাতপাতের সমীকরণকেও সমান ভাবে মাথায় রাখতে হয়েছে মোদীকে। বিজেপিকে ‘উচ্চ বর্ণের দল’ বলে যে তকমা দেওয়া হয়, মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেই গণ্ডিও পেরোতে চাইলেন তিনি। বিহারের যাদব (রামকৃপাল), ভূমিহার (গিরিরাজ সিংহ), ঠাকুর (রাজীবপ্রতাপ রুডি), উত্তরপ্রদেশ থেকে কুর্মি (সাধ্বী নিরঞ্জন জ্যোতি, নতুনদের মধ্যে একমাত্র মহিলা), দলিত (রামশঙ্কর কাথেরিয়া), পঞ্জাবের দলিত নেতা বিজয় সাঁপলা, মহারাষ্ট্রের ওবিসি নেতা হংসরাজ অহীরকে মন্ত্রী করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

নতুন প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে হরিভাই পার্থীভাই চৌধুরি পেয়েছেন স্বরাষ্ট্র, সাঁবরলাল জাঠ জলসম্পদ, মোহনভাই কুন্দরিয়া কৃষি, গিরিরাজ সিংহ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, হংসরাজ গঙ্গারাম অহীর সার ও রসায়ন, রামশঙ্কর কথেরিয়া মানবসম্পদ উন্নয়ন, ওয়াই এস চৌধুরি বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, রাজ্যবর্ধন সিংহ রাঠৌর তথ্য ও সম্প্রচার এবং বিজয় সাঁপলা সামাজিক ন্যায়।

পরশু বিদেশ সফরে যাওয়ার আগে আগামিকালই নতুন মন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি সরকারের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তাঁদের সবিস্তার জানাবেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement