কখনও একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর ডিএনএ তুলে গাল পাড়া, কখনও বিরোধী জোটের তিন মাথাকে ‘থ্রি ইডিয়টস’ বলা, চ়ড়-থাপ্পড়ের উপমা টানা। এমনকী বিরোধী নেতার মেয়ে সম্পর্কেও বেফাঁস শব্দ ব্যবহারের অভিযোগ উঠছে তাঁর বিরুদ্ধে। প্রতিপক্ষ শিবির থেকেও যে আক্রমণ উড়ে আসছে না, এমন নয়। কিন্তু বিরোধীরা বলছেন, বিহারে বিধানসভা ভোটের প্রচারে গিয়ে নরেন্দ্র মোদী যে সব ভাষা ব্যবহার করছেন, তার পাশে বিরোধী আক্রমণ নস্যি! কংগ্রেসের প্রশ্ন, এতে কি প্রধানমন্ত্রী পদের কোনও সম্মান অবশিষ্ট থাকছে?
আজ ছিল তৃতীয় দফার ভোট। সেই ভোটপর্ব মিটতেই মোদীর ভাষা নিয়ে সরব হয়েছেন লালু প্রসাদ ও নীতীশ কুমার। গত কাল জেডিইউ-আরজেডি-কংগ্রেস জোটকে ঘুরিয়ে ‘থ্রি ইডিয়েটস’ বলেছিলেন মোদী। এবং সেই সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘রোজ সন্ধ্যায় প্রচার শেষে লালু-নীতীশ একসঙ্গে বসেন। ইনি বলেন আজ আমি প্রধানমন্ত্রীকে চার চাঁটা মেরেছি। উনি বলেন আমি পাঁচ চাঁটা মেরেছি! কিন্তু প্রধানমন্ত্রীকে চাঁটা মারলে কি বিহারের ভাগ্য ফিরবে?’’
উত্তরে নীতীশ বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী যে ভাষা ব্যবহার করছেন, তাতে আমি খুশি। ওঁর মুখোশটা খুলে যাচ্ছে।’’ তবে সুর আরও চড়িয়েছে কংগ্রেস। তাদের বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় মোদী বলছেন, একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে চাঁটি মারছেন! এই মন্তব্যের কী বার্তা যাবে আন্তর্জাতিক মহলে? আজ সাংবাদিক বৈঠকে কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র রণদীপ সিংহ সুরজেওয়ালা বলেন, ‘‘অতীতে জওহরলাল নেহরু থেকে শুরু করে বিশ্বনাথপ্রতাপ সিংহ বা অটলবিহারী বাজপেয়ী কখনও রাজনৈতিক আক্রমণে এ ধরনের শব্দ ব্যবহার করেননি। বরং বাজপেয়ীজি বক্তৃতায় সুন্দর শব্দচয়নের জন্য পরিচিত ছিলেন। মোদী শালীনতার সব সীমা পার করে গিয়েছেন।’’ রণদীপের মতে, ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদীকে নিয়ে কংগ্রেসের চিন্তা নেই। কিন্তু এই ধরনের ভাষা ব্যবহার করে মোদী যে ভাবে প্রধানমন্ত্রী পদের মর্যাদা খাটো করছেন, সেটাই উদ্বেগের বিষয়।
কেউ কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখের ভাষা কেমন হওয়া উচিত, এ ব্যাপারে সংবিধানে কোনও ণত্ব-ষত্বের উল্লেখ নেই ঠিকই। কিন্তু অদৃশ্য একটা লক্ষ্মণরেখাও থাকা দরকার। মোদী সেটাই পেরিয়ে যাচ্ছেন বলে বিরোধীদের অভিযোগ। বিহারে ভোট প্রচারের গোড়াতেই মোদী হইচই ফেলেছিলেন নীতীশের ডিএনএ নিয়ে মন্তব্য করে। বেমক্কা সেই মন্তব্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেখে ক্ষত মেরামত করেওছিলেন কিছুটা। কিন্তু ভোটের উত্তাপ বাড়তে ফের শুরু করেন বাছা বাছা শব্দে আক্রমণ। যেমন, সম্প্রতি একটি প্রচারসভায় মোদী বলেছেন, ‘‘লোকসভা ভোটের সময় মেয়েকে ‘সেট’ করতে চেয়েছিলেন লালুজি। এ বার দুই ছেলেকে ‘সেট’ করতে চাইছেন।’’
লালুর মেয়ে মিসা ভারতী প্রার্থী হয়েছিলেন লোকসভা ভোটে। বিধানসভায় লড়ছেন তাঁর দুই ভাই তেজ প্রতাপ ও তেজস্বী প্রতাপ। লালু নিজে আজ মোদীর ‘বিলো দ্য বেল্ট’ আক্রমণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু মিসা সৌজন্যের তোয়াক্কা করেননি। তিনি বলেছেন, ‘‘গাঁধীর জমানা গিয়েছে। এখন ইট মারলে পাথর খেতে হবে! মহিলাদের সম্পর্কে কেমন ভাষা ব্যবহার করতে হয়, প্রধানমন্ত্রী সেটাও জানেন না। গলি মহল্লার গুন্ডা-মাওয়ালিদের মতো ভাষা ব্যবহার করছেন মোদী।’’ বিজেপি নেতাদের যুক্তি, লালু নিজেও কুকথা কিছু কম বলছেন না। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহকে ‘নরখাদক’ বলেছিলেন তিনি। মোদীকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, সর্ষে-মরিচ দিয়ে ‘ভূত’ তাড়ানোর মন্ত্র তাঁর জানা রয়েছে! লালুর দলের পাল্টা অভিযোগ, এ সবের অনেক আগেই লালুকে প্রকাশ্য জনসভায় ‘চারা চোর’ (পশুখাদ্য চোর) বলেছিলেন বিজেপি সভাপতি।
বিহার ভোটের গোড়া থেকেই আপত্তিকর ভাষার অজস্র অভিযোগ জমা পড়েছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরে। তালিকায় লালু-অমিতের সঙ্গে আকবরউদ্দিন ওয়াইসির মতো ওজনদার সংখ্যালঘু নেতার নামও রয়েছে। প্রশ্ন হল, প্রধানমন্ত্রী কেন ওই শব্দ ব্যবহার করছেন? কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক সদস্য আজ একান্তে বলেন, ‘‘মোদী-অমিতরা হয়তো বুঝেছেন, বিহারে জমি হারাচ্ছেন। তাই মরিয়া আক্রমণে নেমে মাথার ঠিক রাখতে পারছেন না। এ-ও হতে পারে, মোদী ভাবছেন, মেঠো আক্রমণে নামলে সহজে মানুষের কাছে পৌঁছনো যাবে।’’ কিন্তু মোদীর বাক্যবাণের চোটে বিজেপি সম্পর্কেই নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হচ্ছে বলে বিরোধী জোটের অনেকের বক্তব্য। সেই কারণে মোদীর অপশব্দগুলিকে প্রচারের অস্ত্র করতে চাইছেন তাঁরা। কাল বিহারে আসছেন রাহুল গাঁধী। তিনি সেই অস্ত্রই প্রয়োগ করবেন বলে মনে করছেন দলের নেতাদের একাংশ।