আনুষ্ঠানিক ভাবে শপথ নিয়ে এখনও সরকার গড়েননি নরেন্দ্র মোদী। তার আগেই সরকারি অনুদানে চলা সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীন দুই কমিটি থেকে ইস্তফা দিয়ে এক নতুন দৃষ্টান্ত গড়লেন কংগ্রেস সভানেত্রী সনিয়া গাঁধী।
নেহরু স্মৃতি পাঠাগার এবং নেহরু জন্ম সার্ধশতবার্ষিকী উদ্যাপন কমিটির সদস্যপদ থেকে গত কাল ইস্তফা দিয়েছেন সনিয়া। পদাধিকার বলে যে দুই কমিটির চেয়ারম্যান হলেন প্রধানমন্ত্রী। যার অর্থ, ক’দিন বাদে নরেন্দ্র মোদীই ওই দুই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন। রাজনৈতিক নেতৃত্বের মতে, মোদী যাতে তাঁর নিজের পছন্দ মতো কমিটি গড়তে পারেন, সে জন্যই ইস্তফা দিয়েছেন সনিয়া। সদস্যপদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে মোদীর এক্তিয়ারকেই মর্যাদা দিলেন কংগ্রেস সভানেত্রী।
অবশ্য এই ইস্তফার অন্য একটি অর্থ খোঁজাও চলছে। অনেকেই মনে করছেন, মোদীর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ এড়াতেই এই পদক্ষেপ করেছেন সনিয়া। যাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর মুখোমুখি সাক্ষাৎ যথাসম্ভব কম হয়! যদিও কংগ্রেস নেতৃত্ব এই ধরনের কোনও সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিচ্ছেন। দলের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য শাকিল আহমেদ আজ বলেন, “কংগ্রেস সভানেত্রী ষোলো আনা প্রশাসনিক সংস্কৃতি মেনে চলতেই অভ্যস্ত। তাঁর ইস্তফা দেওয়ার ঘটনা অন্যদেরও অনুসরণ করা উচিত।”
সরকার বদলের পর পদ আঁকড়ে থাকার নজির এ দেশে কম নেই। আর সে কথা মাথায় রেখেই রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের বক্তব্য, নিজে ইস্তফা দিয়ে এ বার দলের নেতা-নেত্রীদেরও বার্তা দিলেন সনিয়া।
যাতে ইউপিএ জমানায় কংগ্রেসের সৌজন্যে যাঁরা এ ধরনের বিভিন্ন কমিটিতে স্থান পেয়েছেন, তাঁরাও যেন সংশ্লিষ্ট পদ থেকে ইস্তফা দেন। কংগ্রেস জমানায় নিযুক্ত রাজ্যপালদেরও এই পথ অনুসরণ করা উচিত বলে মনে করেন অনেকেই।
সনিয়া একাই যে এ ভাবে সরে দাঁড়ানোর পথে হেঁটেছেন, তা অবশ্য নয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গাঁধীও ইতিমধ্যেই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। নেহরু স্মৃতি পাঠাগার কমিটি এবং প্রসার ভারতীর সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন দশ জনপথের ঘনিষ্ঠ সুমন দুবে-ও।
জাতীয় মহিলা কমিশনের চেয়ারম্যান মমতা শর্মাও সোমবার ইস্তফা দেবেন বলে জানিয়েছেন।
কিন্তু এঁদের মধ্যে সনিয়ার ইস্তফা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এর নেপথ্যে একটা তিক্ত অভিজ্ঞতাও রয়েছে সনিয়ার। ১৯৯৮ সালে সক্রিয় রাজনীতিতে পা রাখার পরেপরেই নেহরু-গাঁধী পরিবারের নামে বিভিন্ন অছি পরিষদের সদস্যপদ নিয়ে একাধিক বার বিব্রত হয়েছেন কংগ্রেস সভানেত্রী। বাজপেয়ী সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের দায়িত্বে থেকে সনিয়ার ছোট জা তথা গাঁধী পরিবারের পুত্রবধূ মানেকা গাঁধী ওই সব অছি পরিষদের হিসেবপত্র নিয়ে তদন্ত-তল্লাশি শুরু করে তাঁকে বিপাকে ফেলার চেষ্টা চালিয়েছিলেন। যদিও তা হয়নি। আবার ২০০১ সালে ইন্দিরা গাঁধী ন্যাশনাল সেন্টার অব আর্টসের সভানেত্রী পদ থেকে এক প্রকার চাপ তৈরি করেই তাঁকে সরিয়ে দেন কমিটির দুই সদস্য, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নরসিংহ রাও এবং আইনজীবী এল এম সিঙ্ঘভি।
প্রসঙ্গত, জাতীয় উন্নয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে আগেই ইস্তফা দিয়েছেন সনিয়া। এ বার অন্য দু’টি কমিটি থেকেও তিনি ইস্তফা দিলেন। তবে এর পরেও জওহরলাল নেহরু স্মৃতি তহবিল এবং তিন মূর্তি ভবনে নেহরু মিউজিয়ামের সভানেত্রীর পদে থাকবেন তিনি। কারণ, ওই দুই প্রতিষ্ঠান সরাসরি সরকার থেকে কোনও অনুদান পায় না।
কংগ্রেসের একটি সূত্র বলছে, সনিয়া এ বার আগেভাগে ইস্তফা দেওয়ার নেপথ্যে সম্ভবত সুমন দুবে-রও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। প্রয়াত রাজীব গাঁধীর এই বন্ধু দশ জনপথের অন্যতম পরামর্শদাতা।
গাঁধী পরিবারের সঙ্গে তাঁর যথেষ্ট সুসম্পর্ক রয়েছে। সুমন নিজে প্রসার ভারতী এবং নেহরু স্মৃতি পাঠাগার কমিটির সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পাশাপাশি সনিয়াকে সরে দাঁড়ানোর পরামর্শও দিয়েছেন বলে অনেকের ধারণা।
কিন্তু প্রশ্ন হল, কংগ্রেস নিযুক্ত রাজ্যপালদের কী হবে? কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার পরামর্শে রাষ্ট্রপতি রাজ্যপালদের নিয়োগ করেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের বাছাই করা হয় রাজনৈতিক স্তরেই। সেই কারণেই ২০০৪ সালে কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসে সবার প্রথমে রাজস্থানের রাজ্যপালের পদ থেকে মদনলাল খুরানাকে সরিয়ে দিয়েছিল কংগ্রেস। এ বারও বিজেপির সরকার গঠনের আগেই একাধিক রাজ্যপালের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। কিন্তু শীলা দীক্ষিতরা কি সনিয়ার পথ অনুসরণ করবেন? দুই কমিটির সদস্যপদ থেকে সনিয়ার ইস্তফার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নটাও আজ উঠে গেল রাজনীতিতে।