এক দিনে জোড়া বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে গত কাল রাতেই প্রধান বিরোধী দলের নেতা তথা এআইএইউডিএফ প্রধান বদরুদ্দিন আজমলের সঙ্গে বৈঠকে বসলেন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ। বিজেপি ঢেউ তথা হিমন্ত-ম্যাজিক ঠেকাতে দু’দলের নির্বাচনী মিত্রতার আভাস মিললেও তা নিয়ে সারা দিনে সরাসরি মুখ খোলেননি কোনও পক্ষই। তবে আজ সন্ধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই বৈঠক নিতান্তই সরকারি স্তরের বৈঠক। জল্পনার কোনও অবকাশ নেই। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ডেপুটেশন দিতেই এসেছিলেন বদরুদ্দিন আজমল।
আসলে টিওয়া এবং ডিমা হাসাও—দু’টি স্বশাসিত পরিষদই কার্যত কংগ্রেসের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল বিজেপি। সৌজন্যে হিমন্তের কূটনীতি। অসমে রাজ্য সভার নির্বাচন হোক কিংবা মেঘালয়ের সাংবিধানিক সংকট, দলভাঙানো বা ‘যেন তেন প্রকারেণ’ উদ্ভুত সঙ্কট সামাল দিতে কংগ্রেস হাইকম্যান্ডের বরাবরের আস্থাভাজন ছিলেন হিমন্ত। সেই ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ বেহাত হওয়াই শুধু নয়, তা কংগ্রেসের দিকেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ভুগছে রাজ্য কংগ্রেস।
গত কাল সকাল অবধি জানা ছিল, টিওয়া স্বশাসিত পরিষদের ৩০টির মধ্যে ১৫টি আসনে জয়লাভ করা কংগ্রেসই বোর্ড গঠন করবে। গত ২২ অগস্ট ঘোষিত ফল অনুযায়ী, কংগ্রেস মরিগাঁও জেলায় ১৯টির মধ্যে ৭টি ও নগাঁওয়ে ১১টির মধ্যে ৮টি আসনে জেতে। পাশাপাশি, রমাকান্ত দেউড়ির নেতৃত্বে টিওয়া ঐক্য মঞ্চ ১০টি, বিজেপি তিনটি ও অগপ দু’টি আসন পায়। বার বার বিজেপির কাছে ধাক্কা খাওয়ার পরে স্বাভাবিক ভাবেই এই জয় ছিল কংগ্রেসের ক্ষতে প্রলেপ।
কিন্তু শেষরক্ষা আর হল কই! শেষ বেলায়, বোর্ড গঠনের আগেই বিজেপির চালে, বা বলা ভাল হিমন্তের কৌশলী হস্তক্ষেপে টিওয়া স্বশাসিত পরিষদ কংগ্রেসের হাত থেকে শেষ মুহূর্তে বেরিয়ে গেল। তারা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বোর্ড গড়তে ব্যর্থ হল স্রেফ হিমন্তের কারণে। হিমন্ত বিশ্ব শর্মা কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পরেই, তাঁর ঘনিষ্ঠ টিওয়া স্বশাসিত পরিষদের তিন বিজয়ী প্রার্থী কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। ফলে কংগ্রেস নেতৃত্ব টিওয়া স্বশাসিত পরিষদ গঠনে উদ্যোগী হয়নি। বিষয়টি নিয়ে চেপে বসে ছিলেন তরুণ গগৈ সরকার। তার বিরুদ্ধে ১৩ জন বিরোধী-সদস্য গত মাসে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। আদালতের নির্দেশেই গত কাল বোর্ড গঠনের দিন ঠিক হয়। বিজেপি ও অগপ কংগ্রেস বিরোধী টিয়া ঐক্য মঞ্চকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেয়। শেষ অবধি ১৮ জন সদস্যের সমর্থন নিয়ে রমাকান্ত দেউড়ির নেতৃত্বে কংগ্রেস বিরোধী জোটই বোর্ড গড়ে। দেউড়ি বলেন, ‘‘মানুষই পরিবর্তন চাইছিলেন।’’ ২০১৪ সাল অবধি কংগ্রেসে থাকা দেউড়ি গত বছরই কংগ্রেস ছেড়ে ঐক্য মঞ্চ গড়েন। তিনি ফের পরিষদের নতুন মুখ্য কার্যনির্বাহী সদস্য নিযুক্ত হয়েছেন।
অন্য দিকে, ২০১৩ সালে উত্তর কাছার পার্বত্য স্বশাসিত পরিষদে একটিও আসন না পাওয়া বিজেপি এ বার কংগ্রেসের হাত থেকে সেই পরিষদও ছিনিয়ে নিতে তৈরি। আগেই তারা সাতজন নির্বাচিত নির্দল সদস্যকে দলে টেনেছিল। এ বার আট কংগ্রেস সদস্য ও আরও একজন নির্দল সদস্যকে দলে টেনে ২৮টির মধ্যে ১৬টি আসন দখল করে নিয়েছে। ফলে তাদের ক্ষমতায় আসা নিশ্চিত। বর্তমান মুখ্য কার্যবাহী সদস্য দেবজিৎ থাওসেন নিজেই ২০০৭ সালে বিজেপি প্রার্থী হিসেবে জিতেছিলেন। সে বার বিজেপি ৯টি আসন পেয়েছিল। ২০১৩ সালে তিনি কংগ্রেসের হয়ে দাঁড়ান। কংগ্রেস ১০টি আসন পায়। বাকি সব আসনে জেতেন নির্দলরা। থাওসেনের মতে, ‘‘অতি গোপনে ঘর গুছিয়েছে বিজেপি।’’ উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা অবধি সব সদস্যদের সঙ্গে আর্থিক সঙ্কট, বকেয়া বেতন প্রসঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। কিন্তু দলবদল নিয়ে কিছুই টের পাননি! হিমন্তের কথায়, ‘‘দুই পরিষদের ক্ষমতার হাত বদল আসন্ন পরিবর্তনেরই শুভ ইঙ্গিত। পরিষদের মানুষ কংগ্রেসি দুর্নীতিতে বীতশ্রদ্ধ। কংগ্রেসের পতন আসন্ন।’’
শেষ পর্যন্ত বিজেপির ‘আগ্রাসন’-এর সামনে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে হালে পানি পেতে এআইইউডিএফ-এর সঙ্গে হাত মেলানো ভিন্ন কংগ্রেসের কাছে গদি রক্ষার অন্য উপায় নেই। মুখে সে কথা না স্বীকার না করলেও মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ ও প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অঞ্জন দত্তও বদরুদ্দিন আজমলকে সন্ধির বার্তা দেওয়ার পক্ষেই মত দেন বলে দলীয় সূত্রে খবর। এই পরিস্থিতিতে গত কাল রাতে এআইইউডিএফ প্রধান, সাংসদ আজমল, বিধায়ক রফিকুল ইসলাম, হাফিজ রশিদ আহমেদ কাশিমি ও আবদুর রহিম খান তরুণ গগৈয়ের কয়নাধারার বাড়িতে হাজির হন। সেখানে ছিলেন এআইসিসির সাধারণ সম্পাদক অবিনাশ পাণ্ডে, অঞ্জন দত্ত, শিল্প-বাণিজ্য মন্ত্রী সিদ্দেক আহমেদ, বিধায়ক দেবব্রত শইকিয়া প্রমুখ।
রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পরে আজমল অবশ্য দাবি করেন, এআইইউডিএফের হয়ে নয়, জমিয়তের হয়ে ডি-ভোটার, এনআরসির মতো কিছু জরুরি বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে এসেছিলেন। বিজেপির সঙ্গে মিত্রতার প্রসঙ্গ উড়িয়ে দিলেও কংগ্রেসের সঙ্গে মিত্রতার প্রসঙ্গটি তিনি সময় ও পরিস্থিতির উপরে ছেড়ে দেন। আজমল বলেন, ‘‘রাজ্যে আমি বিজেপি ও কংগ্রেসের বিরোধী। এর পরেও কংগ্রেস যদি মিত্রতার হাত বাড়ায় তবে দলের বিভিন্ন কমিটি তা বিচার করে দেখবে।’’ অবশ্য, হাগ্রামা মহিলারির নেতৃত্বাধীন বিপিএফের সঙ্গে মিত্রতার বিষয়ে তিনি আগ্রহ দেখান।
অঞ্জনবাবু বলেন, ‘‘একজন সাংসদ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। সব কথা সংবাদ মাধ্যমে বলা চলে না। আর, অন্য কোনও দলের সঙ্গে জোট বাঁধার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হাইকম্যান্ডই নেবে।’’ অবশ্য সিদ্দেক আহমেদ সরাসরিই বলেন, ‘‘আমি ব্যক্তিগত ভাবে চাই কংগ্রেসের সঙ্গে এআইইউডিএফের জোট হোক। আগেকার ভুল বোঝাবুঝিগুলি মিটে গিয়েছে। যদি পরিস্থিতি অনুকূল হয় তবে জোট হতেই পারে।’’