Bengali Language

লেখায় আঁকা আঁকায় লেখা

বর্ণ, শব্দ, হরফ নিয়ে এক সময়ে অনেক চর্চা করে গিয়েছেন শিল্পীরা। বাংলা ভাষার সেই অক্ষরশিল্পের সন্ধানে।

নবনীতা দত্ত

শেষ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:২০
Share:

শান্তিনিকেতনে নামফলকে। ছবি: প্রসেনজিৎ মাহাতো।

এক সময়ে বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদ, কলকাতার দোকানগুলোর সাইনবোর্ডে, দেওয়াললিখনে বাংলা হরফের নানা শৈল্পিক রূপ দেখা যেত। এখনও শান্তিনিকেতনে বাড়ির নামফলকে অক্ষরবিন্যাস যেন মায়াজাল বিস্তার করে। কোথাও রোমান হরফে বাংলা লেখা, কোথাও আবার দেবনাগরী হরফের ছায়া, তার সঙ্গে মিশে গিয়েছে পটচিত্রের রেখা। একটা অক্ষর, তার মাত্রা, ই-কার, এ-কারের টান কেমন হবে, এ সব মিলিয়েই তৈরি হত এক-একটা শব্দ, বাক্য, লেখা। এ দেশের লিপি থেকে জাপানি শ্যোদো হয়ে এই অক্ষরশিল্প বারবার ঘুরেফিরে এসেছে আমাদের লেখায়। তার মধ্যে যেমন রয়েছে ক্যালিগ্রাফি, তেমনই লেটারিং। গ্রিক শব্দ ক্যালোস মানে সুন্দর আর গ্রাফিন মানে লেখা জুড়ে তৈরি এই শব্দ। পরে নন্দলাল বসু এর একটা নামকরণ করেছিলেন ‘লেখাঙ্কন’।

‘রঠ’ সিল।

কাটাকুটি থেকে চারুলিপি

এই অক্ষরশিল্পের চর্চা নিরন্তর দেখা গিয়েছে বাংলা সাহিত্য, চলচ্চিত্র ও শিল্পজগতে। জাপান ভ্রমণের সময়ে এই অক্ষরচিত্রের সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবিগুরুর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি দেখলে তার নমুনা পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ লেখার পরে যে সব অংশ কেটে দিতেন, সেই কাটাকুটিতে ফুটে উঠত ফুল-পাতার নকশা। প্রতিমা দেবী ‘গুরুদেবের ছবি’ প্রবন্ধে লিখছেন, ‘কাটাকুটির খেলা একদিন চিত্রজগতের দ্বারে এসে ঘা দিল।’ কবিগুরুর আঁকাআঁকির চর্চা শুরুর মাহেন্দ্রক্ষণ বলেও ধরা যেতে পারে তা।

রবীন্দ্রনাথের লেখায়।

জাপান ভ্রমণের সময়ে সেখান থেকে কিছু তুলি-কালিও সঙ্গে এনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। তাঁর ব্যবহৃত যে মোটা ও সরু তুলি রবীন্দ্রভবনে পাওয়া যায়, সম্ভবত সেগুলো চিন-জাপানের। ওকাকুরার উপহার দেওয়া আট পাপড়ির পদ্ম আকৃতির ধাতব তুলিদানিও রয়েছে সেখানে। এই তুলি-কালি দিয়ে ক্যালিগ্রাফির অভ্যাস ধরে রেখেছিলেন তিনি। পূর্ব এশিয়ায় ক্যালিগ্রাফি চর্চার পাশাপাশি শিল্পীদের যে ‘রাক্কান’ বা ‘সিল’ ব্যবহারের চল দেখা যেত, নিজের নাম ও পদবির আদ্যক্ষর দিয়ে তৈরি অমন সিল ব্যবহার করতেন রবীন্দ্রনাথও। ‘র’ ও ‘ঠ’ লেখা সেই ‘সিল’-এর কমলা-লাল ছাপ দেখা যায় তাঁর নিজের বইপত্রে। কবিগুরুর আখরচিত্র এখনও সংরক্ষিত রয়েছে জাপানের সংগ্রহশালায়। সেখানে কখনও রেশম কাপড়ে ধরা পড়ে তুলি-কালিতে লেখা ‘অসতো মা সদ্‌গময়’, কখনও আবার ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়’।

বর্ণে নয়, ছবির ক-খ-গ-ঘ

‘ক বর্গের ক-খ দু’টি বড় মেজো ভাই/ ত বর্গের ত-থ দু’টি বলাই কানাই’... বাংলা বর্ণমালার ছবি নিয়ে দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের রেখাক্ষর-বর্ণমালার কাজ উল্লেখযোগ্য। পরে এই শিল্পচর্চা শান্তিনিকেতনেও শুরু হয়। শিল্পী বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায় জাপান থেকে এই শিল্পকলা শিখে এসেছিলেন।পরে সেই লেখাঙ্কন অভ্যাসে কালীঘাটের পটের রেখা, লোকশিল্পের রেখা নিয়ে মিশিয়েছিলেন এই হরফশিল্পে। বিনোদবিহারীর কাছ থেকে আবার ক্যালিগ্রাফির পাঠ নেন সত্যজিৎ রায়। তাঁর তৈরি বিভিন্ন বইয়ের প্রচ্ছদে তার নিদর্শন পাওয়া যায়। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘ইন্দ্রাণী’র প্রচ্ছদে যেমন ই, ন, ণ-এর শুঁড় গোল পাকিয়ে চক্রবলয়ের আকার দিয়েছেন। জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র লেখা দেখে মনে হয় যেন স্বাক্ষর। সেখানে আবার ধ-এর মাথা উল্টো দিকে ঘোরানো। অক্ষর নিয়ে এমন নানান পরীক্ষানিরীক্ষা দেখা যায় তাঁর কাজে। বাংলা হরফে দেবনাগরী, তিব্বতি, আরবি স্ক্রিপ্টের ধরন মিশিয়েছিলেন সত্যজিৎ। বাংলা অক্ষর নিয়ে তাঁর এই কাজের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় দেবাশীষ দেবের ‘রং তুলির সত্যজিৎ’-এ।

শিল্পী দেবাশীষ দেব বললেন, “আমরা আর্ট কলেজে অক্ষরশিল্প নিয়ে রীতিমতো চর্চা করতাম। ক, খ, গ, ঘ বাংলার বর্ণমালাকে আমরা অক্ষর হিসেবে দেখতাম না, এক-একটা বর্ণকে ছবির মতো দেখতে শিখেছিলাম। ফলে সেটা ভেঙে-গড়ে নানা রকম আখর ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা থাকত। এক সময়ে ক্যালিগ্রাফির উপরে কত সুন্দর সুন্দর কাজ হত। বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়, পূর্ণেন্দু পত্রী, খালেদ চৌধুরীর কত কাজ আছে এর উপরে। আর একটা হত লেটারিং। যেটা সত্যজিৎ রায় করতেন। ‘সন্দেশ’-এ কাজ করার সময়ে তাঁর কাজ দেখে শিখেছিলাম, কী ভাবে অক্ষরগুলো ভেঙে-গড়ে নতুন অবয়ব তৈরি করতে হয়।” ‘সন্দেশ’-এর কভারে এমন কত শব্দ উল্টেপাল্টে গিয়েছে ছবির আকারে। কখনও ‘সন্দেশ’ শব্দটিই এমন ভাবে লেখা হয়েছে, দেখে মনে হয় যেন একটা হাতি। ‘স’-এর মাথা সেখানে হাতির শুঁড়। কখনও আবার সেটা হয়ে যেত ঘোড়া বা সিংহের মতো।

লেটারিং-এর ব্যবহার সত্যজিতের সিনেমাতেও দেখা গিয়েছে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র টাইটেল কার্ডে চোখ রাখলে দেখা যায়, সেখানে বাংলা হরফগুলো ফুটে উঠছে তিব্বতি স্ক্রিপ্টের আঙ্গিকে। বৌদ্ধ গুম্ফাগুলোয় যে ভাবে ‘ওঁ মণি পদ্মে হুঁ’ লেখা থাকে, সেই টানেই তৈরি পুরো টাইটেল কার্ড। আবার ‘সোনার কেল্লা’-য় সেই হরফই পাল্টে যাচ্ছে শিশুহাতের শিক্ষানবিশ টানে।

টিনটিনের বইয়ের বাংলা ভাষায় অনূদিত সংস্করণেও এমন লেটারিং-এর কাজ দেখা যায়। এক সময়ে আনন্দমেলার গল্পের নামও এমন লেখাঙ্কনে ফুটিয়ে তোলা হত। শীর্ষ লেটারিং-এ অক্ষরশিল্পের প্রয়োগ দেখা যায় নারায়ণ দেবনাথের কাজেও। এই লেখাঙ্কনের চর্চায় খুব বেশি আড়ম্বর ছিল না, কল্পনাশক্তিতে ভর করেই ডানা মেলত বর্ণমালা। একটা তুলি বা পাখির পালক দিয়েই কতশত লেখা ফুটে উঠত কাগজে, কাপড়ে।

তুলি-কালি থেকে নিবের টানে

প্রথম দিকে তুলি দিয়েই অক্ষরশিল্পের অভ্যাস করতেন শিল্পীরা। ক্রো কুইল নিবের ব্যবহারও দেখা যায় অনেক শিল্পীর কাজে। তবে এই নিব আয়ত্তে আনা খুব সহজ ছিল না। দীর্ঘ অভ্যাস ও অধ্যবসায়ে তা হাতে আসত। পরে ফাউন্টেন পেনের নিবেও লেখার অভ্যাস চালিয়ে গিয়েছেন অনেকে। এখন অবশ্য ক্যালিগ্রাফি কলমের সেট কিনতে পাওয়া যায়। সেখানে সরু, মোটাদাগ পড়বে, এমন হরেক কলম দিয়ে বাক্স সাজানো থাকে।

ক্যালিগ্রাফির আয়োজন আড়েবহরে বাড়লেও তার চর্চা এখন প্রায় দেখাই যায় না। অক্ষর নিয়ে এমন মজার খেলা বিস্মৃতপ্রায়। অথচ এক সময়ে শিশুমনের বিকাশের জন্য হাতে লেখার এই অভ্যাস ছিল অবসরযাপনের অংশ। চিঠিপত্র, কবিতা লেখার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জুড়ে ছিল এই অক্ষরচর্চা। জাপানি কবিরা পুরো কবিতাই লিখতেন এমন লেখাঙ্কনে, সেখানে এক একটা বর্ণ, শব্দ যেন এক-একটা ছবি। তাঁরা মৃত্যুর আগে শেষ কবিতাটি লিখে রাখতেন রেশম কাপড়ে, যাতে তাঁর প্রয়াণের পরেও তাঁর লেখাঙ্কনে বেঁচে থাকে তাঁর স্পর্শ।

হাতে লেখা অক্ষরের সঙ্গে যেমন জুড়ে থাকে লেখকের স্পর্শ, তেমন জুড়ে থাকে সেই ভাষার আঘ্রাণও। তাই ভাষাদিবসে আত্মবিস্মৃতির অপবাদ ঘুচিয়ে তুলি-কলম নিয়ে বসে পড়লে মন্দ হয় না। ল্যাপটপের ফন্টে বদ্ধ জীবনে কলমের টানে নিজের নামটাই না হয় লিখে দেখুন...


ছবি: নিলয়কুমার দে,

মডেল: রাইমা গুপ্ত,

মেকআপ: প্রিয়া গুপ্ত

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন

এটি একটি প্রিমিয়াম খবর…

  • প্রতিদিন ২০০’রও বেশি এমন প্রিমিয়াম খবর

  • সঙ্গে আনন্দবাজার পত্রিকার ই -পেপার পড়ার সুযোগ

  • সময়মতো পড়ুন, ‘সেভ আর্টিকল-এ ক্লিক করে

সাবস্ক্রাইব করুন