গান আর সাজগোজের পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ ছিলেন আশা ভোঁসলে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
তাঁর গান উচ্ছ্বল,রঙিন। আর তিনি? তিনিও কি রঙিন, উচ্ছ্বল, উজ্জ্বল নন? জীবনে যত ঝড়ঝাপটা আসুক, যত বড় চ্যালেঞ্জই সামলাতে হোক, আশা ভোঁসলে নিজের বাইরের আবরণটি তাঁর গানের মতোই ঝলমলে রাখতে চেয়েছেন বরাবর। আর সেই চাওয়াকে বাস্তব রূপ দিয়ে সাহায্য করেছে তাঁর সাজ। গান আর সাজের এক পূর্ণাঙ্গ ‘প্যাকেজ’ তিনি!
গায়িকা আশাকে তাঁর সাজগোজ বাদ দিয়ে ভাবা যায় না মোটেই। গোটা দুনিয়া যখন গায়ক-গায়িকাকে ‘প্রেজেন্টেবল’ করার কথা ভাবতে শুরু করেছে, আশা তার অনেক আগে থেকে স্রোতের উল্টো দিকে হেঁটেছেন। সময় নিয়ে সেজেছেন গান গাওয়ার জন্য। মঞ্চে উঠলে একরকম সাজ। স্টুডিয়োয় গান গাইতে গেলে আর এক রকম। কপালে বড় গোল টিপ। চুলে ফুল ( বেশির ভাগ সময় সেই ফুল শাড়ির রঙের সঙ্গে মিলিয়ে)। গলায় হয় মুক্তো নয় সোনার বা পাথরের ভারী গয়না। কাজল, ফাউন্ডেশন, লাইনার, মাস্কারা, লিপস্টিক— কিছু বাদ দেননি। কেউ কেউ সেই সাজকে ‘চড়া’ বলে কটাক্ষ করেছেন, কিন্তু বাকিরা আশার সাজের সঙ্গে ওই কণ্ঠের গানকে জুড়তে পেরেছেন। যিনি ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’ গাইছেন, তাঁর অঙ্গে আর যা-ই হোক আটপৌরে সাজ মানায় না।
সে কালে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, গীতা দত্ত, লতা মঙ্গেশকরেরা যদিও সেই আটপৌরে সাজেই স্বচ্ছন্দ ছিলেন। মাঠা-পাড় শাড়ি, সাদা ব্লাউজ়, টেনে বাঁধা চুল, হালকা গয়না আর প্রায় মেকআপহীন মুখ। আশাও সাদা শাড়ি পরছেন। কিন্তু তাতে থেকেছে চওড়া রঙিন পাড়। নয়তো ঝলমলে জরি বা চুমকির বর্ডার। অথচ কোথাও মনে হয়নি তিনি সাজতে জানেন না। বরং বার বার মনে হয়েছে, তিনি জানেন কোথায় থামতে হয়।
হয়তো চওড়া লাল পাড় কোনও কাঞ্জিভরম পরলেন মঞ্চে গান গাইবার জন্য। তার সঙ্গে হাতে পরে নিলেন একটা চওড়া ব্রেসলেট। তার থেকে ঝালরের মতো ঝুলছে অসংখ্য মুক্তোর মালা। এক হাতে মাইক নিয়ে যখন আর এক হাত তুলে গান গাইছেন, তখন সেই মুক্তোর ঝালরের দোলা নিপাট লালপেড়ে সাদা শাড়িকেও করে তুলছে ঝলমলে ফ্যাশন। শোনা যায়, মঞ্চে গান গাওয়ার মাঝে গ্রিন রুমে গিয়ে পোশাক পরিবর্তনও করে আসতেন আশা!
সিল্কের শাড়ি পরতে ভালবাসতেন। নানা রঙের নানা ধরনের সিল্কের শাড়ি ছিল তাঁর সংগ্রহে। চান্দেরি, পৈঠানী, সম্বলপুরী, ইক্কত, বেনারসি, কাঞ্জিভরম, অসম সিল্ক— সব রকম। তা বলে শুধু সিল্কের শাড়িতেই নিজেকে আটকে রাখেননি। নানা রঙের জমকালো শিফন, জর্জেটের বেনারসি, অরগ্যাঞ্জা, লখনউ চিকনও পরেছেন। যখন যে শাড়ির ফ্যাশন, মঞ্চে, অনুষ্ঠানে, পার্টিতে তেমন শাড়িতে দেখা মিলেছে আশার। শুধু কি তাই! মনীশ মলহোত্রের মতো পোশাকশিল্পীর হয়ে বলিউডের নায়িকাদের পাশে খ্যাতনামী সংস্থার ফ্যাশন উইকে র্যাম্পেও হেঁটেছেন আশা।
শাড়ির বাইরে অন্য পোশাক পরেননি তা নয়, তবে সে ক্কচিৎ-কদাচিৎ। এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘ছেলে আমাকে বলেছিল, আমাকে শাড়ি পরলে দেখতে ভাল লাগে। তাই শাড়িই পরতাম বেশি। তবে বাইরে যাওয়ার সময় প্লেনে ট্রাভেল করার সময় ট্রাউজ়ার পরতাম। কয়েক বার চুড়িদারও পরছি। তবে ওই ছেলের কথা মাথায় থাকত।’’
ঘোর রক্ষণশীল বাড়ির মেয়ে। দিদি, বোন সকলেই গান করেছেন। আশা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘‘ আমি ওঁদের থেকে আলাদা হতে চেয়েছিলাম, যাতে আমাকে আলাদা করে চেনা যায়।’’ আশা গানের কথা বলেছিলেন। তবে সাজেও তিনি সে ভাবেই আলাদা হয়েছিলেন।