বাংলার তাঁত আর পশ্চিমি, আধা-পশ্চিমি ফ্যাশনের যুগলবন্দি। —নিজস্ব চিত্র ।
এই প্রচণ্ড গরমে ঘেমেনেয়ে একশা। সাজগোজ, খাওয়াদাওয়া, আমোদ-আহ্লাদ, কোনও কিছুতেই যেন মন নেই, আরাম নেই। কেবল শীতলতার হাতছানি। কিন্তু গরমকালে তো গরম পড়বেই। আর আমাদের এখানে গরম তো চিরকাল প্যাচপেচেই। হ্যাঁ, আবহাওয়ার চরিত্র বদলেছে, তার মেজাজ বেশি গরম থাকে আজকাল। তাই বলে ‘গরম গরম’ করে হা-হুতাশ করার কিছু নেই। এখন তো ঘরে, গাড়িতে এমনকি কিছু বাসেও এসি। তা ভাল কথা। কিন্তু আমাদের ছোটবেলায় গরম মোকাবিলা করতে ঠান্ডা মেশিন কোথায় ছিল? গরমকালে একটু বেলা বাড়তেই ঘরের জানলা বন্ধ করে পর্দা টেনে দেওয়া হত। খড়খড়ি দেওয়া কাঠের জানলা হলে তো কথাই নেই। বাইরে প্রখর তাপপ্রবাহ, ঘরে শীতল আঁধার। অনেক বাড়িতে কাঠের এবং কাচের, দু’রকম জানলাই থাকত। আর সেই সঙ্গে পাখার ঠান্ডা হাওয়া। আমাদের বাড়িতে ছিল ইন্ডিয়া ফ্যান। আজও আমার নন-এসি বসার ঘরে সেই পাখাই হাওয়া দেয়। সেই ফ্যান কোম্পানি যদিও বহু দিন আগেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সেই সময় সব বাড়িতেই যে ফ্রিজ থাকত, তেমনটা নয়। আমাদের বাড়িতে ফ্রিজ থাকলেও কাঁচা আমিষ, শাকসব্জি রাখার জন্যই তার ব্যবহার ছিল বেশি। বাসি খাবারের চল ছিল না আমাদের। রোজ টাটকা রান্না হত। আর ঠান্ডা জলের জন্য ছিল মাটির কুঁজো। কোল্ড ড্রিঙ্কের অত বোলবোলাও ছিল না তখন। তার বদলে মৌরি-মিছরির ঠান্ডা শরবত, সামান্য লেবু চিপে। আহা! আত্মার শান্তি! প্রাণের আরাম।
মহিলাদের সামার ওয়্যার কালেকশন। —নিজস্ব চিত্র।
মা ঠাকুরমাদের চিরকাল বলতে শুনেছি, গরমে হালকা খাবার আর হালকা পোশাক। আর হালকা মানেই সুতি। নরম এবং আরামদায়াক। তাঁরা তো আর ফ্যাশনের পাঠ নেননি, কিন্তু ঋতু অনুযায়ী পোশাকের প্রয়োজন বুঝতেন। তাই গরমের বিকেলে গা ধুয়ে সুতির পাতলা ছাপা শাড়ি অঙ্গে চড়ানোই ছিল তাদের দস্তুর। তাঁতের শাড়িও পাশাপাশি চলত। এই যে অতীতের গ্রীষ্মকালীন ছবি আঁকছিলাম এত ক্ষণ, তার মানে এই নয় যে আমি শুধুই অতীতবিলাসী। আগে সব কিছুই কত ভাল ছিল, আজ সবই খারাপ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবনযাপনের ধারা বদলায়, প্রয়োজন পাল্টায়, নতুনের উদ্ভব হয়। আর নতুনকে সদা স্বাগত। কিন্তু আমি যা বলতে চাইছি তা হল, নানা পরিবর্তনের মাঝেও কিছু শাশ্বত সত্য থেকেই যায়। তাই আজ এসির শীতল স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলেও, এই গরমে সুতির পোশাকই খুঁজে বেড়াই আমরা। সেই মা-ঠাকুরমাদের বলে যাওয়া হালকা পোশাক।
এই গরমে সুতির পোশাকই খুঁজে বেড়াই আমরা। —নিজস্ব চিত্র।
এই গরমে মহিলাদের সামার ওয়্যার কালেকশনের খোঁজ দিই আপনাদের। স্কার্ট, লং ড্রেস ও আরও নানা ধরনের হ্যান্ডলুম কাপড়ের পোশাক। তাঁতে বোনা খাদি কাপড়ের পাশাপাশি গামছা, হ্যান্ড প্রিন্ট, বাটিক— সবের মিলমিশে গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ এক কালেকশন, ‘দ্য কালার্স অফ লাইফ’। গড়ে তুলেছেন নিলয় সেনগুপ্ত। তাঁর ব্র্যান্ডের নাম ‘কেআর নিলয় সেনগুপ্ত’। “আমি আমার ডিজ়াইনে সব সময়ে বাংলার সমৃদ্ধ বুননশিল্পকে প্রাধান্য দিই। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টায় বাংলার কাপড় দিয়ে ডিজ়াইন করি ওয়েস্টার্ন, ইন্দো-ওয়েস্টার্ন পোশাক”, বলেন নিলয়।
তাঁতে বোনা খাদি কাপড়ের পাশাপাশি গামছা, হ্যান্ড প্রিন্ট, বাটিক— সবের মিলমিশে গড়ে উঠেছে সম্পূর্ণ এক কালেকশন। —নিজস্ব চিত্র।
এই কালেকশনের বৈশিষ্ট্য হ্যান্ডলুম কাপড়ের উপর অ্যাপ্লেক, এমব্রয়ডারি, কাঁথা কাজের ব্যবহার। আর মোটিফে মাছ, সূর্য, ফুল, পাতা— প্রকৃতিতে ছড়িয়ে থাকা নানা উপাদান। প্রকৃতির মতো বর্ণময় আর কে আছে! ‘দ্য কালার্স অফ লাইফ’ কালেকশনে তার ছোঁয়া তো থাকবেই।