বিয়ের উপহারে সোনার বদলে কী হতে পারে উপযুক্ত অলঙ্কার? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
‘লীলাবালি লীলাবালি ভরযুবতী সই গো কী দিয়া সাজাইমু তোরে’ বাংলার বিয়ের এই কনে সাজানোর গানটিতে বিস্তর গয়নার উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সোনার উল্লেখ রয়েছে এক বারই। কেন? বাঙালি বিয়েতে মুক্তো, হিরে, পান্না, চুনির সমরোহ থাকলেও সে সবই তো ধারণ করে থাকে সোনা। ফলে সোনার উল্লেখ আলাদা করে না করলেও চলে। ভরযুবতী লীলাবালির বিয়েতে নাকফুল থেকে টিকলি, কানপাশা থেকে কোমরের বিছে— সবই যে সোনায় মোড়া, তা আলাদা উল্লেখের অপেক্ষা রাখে না। আসলে সোনা ছাড়া বাঙালি বিয়ে ভাবাই যায় না। সোনা যদি না-ও বা থাকে, নিদেনপক্ষে রূপোর সাজও চলে। তবে বাঙালি বিয়েতে গয়না থাকতেই হবে। সে কনের সাজে হোক বা উপহারের কৌটোয়। প্রাচীন কাল থেকেই মানব সমাজে সোনাকে আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বাংলাও তার ব্যতিক্রম নয়। বিয়ের সময় কনেকে সোনা পরানোর রীতি মূলত নতুন পরিবারে সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যকে আমন্ত্রণ জানানোর প্রতীক বলেই বিশ্বাস। আর এই বিশ্বাস এতটাই প্রগাঢ় যে,সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারেও মেয়েকে বিয়ের সময় কিছু না কিছু সোনার গয়না দেওয়ার রেওয়াজ থাকেই। এমনকি, কাছের আত্মীয়েরা বিয়ের উপহারেও সোনা বা রুপোর গয়না দেন। সে দাম যতই চড়া হোক না কেন। কিন্তু এখন সময় অস্থির। সাস্প্রতিক সামাজিক পরিস্থিতিতে বিষয়টা শুধু সোনার মূল্যবৃদ্ধি নয়, দেশের অর্থনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত। বৈদেশিক মুদ্রার ভাঁড়ারে যাতে টান না পড়ে, সে জন্য অন্তত আগামী এক বছর সোনা কেনায় লাগাম পরাতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।তাই বলে কি বিয়ের জৌলুস কমে যাবে?একেবারেই নয়। কনের সাজে হোক বা উপহার দেওয়ার রীতিতে— সোনার বিকল্প হতে পরে বিভিন্ন রাজ্যের এমন সব গয়না, যা কারুকাজে ও শিল্পকর্মে সোনার আভিজাত্যকেও হার মানাতে পারে।
সোনার বিকল্প মানেই জ়াঙ্ক জুয়েলারি বা মাটির গয়না অথবা সোনার জল করা গয়না নয়। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী অবধি দেশের নানা রাজ্যে এমন সব লোকজ গয়নার সম্ভার আছে, যা তাক লাগিয়ে দিতে পারে।
কাশ্মীরের দেঝুর
কাশ্মীরের দেঝুর।
কাশ্মীরি পণ্ডিত সম্প্রদায়ের মেয়েরা বিয়েতে এমন গয়না পরেন। এটি কানের দুলের একটি বিশেষ রকমফের। লম্বা ঝোলা চেনের নীচে ছোট লকেট। তাতে নানা রকম নকশা করা থাকে। অনেক সময়ে দুলে সূক্ষ্ম সোনা বা রূপোর কারুকাজও থাকে। দেঝুরকে শিব ও শক্তির মিলনের প্রতীক হিসেবে মানা হয়। এর সঙ্গে ধর্মীয় ঐতিহ্যও জড়িয়ে রয়েছে।
রাজস্থানের থেওয়া
রাজস্থানের থেওয়া
রাজস্থানি বিয়ের গয়নায় থেওয়া শিল্পের কারুকাজ বিখ্যাত। সাধারণত সোনা ও হিরে বসিয়ে এমন গয়না তৈরি করা হলেও অন্য ধাতু দিয়েও তা তৈরি হয়। রঙিন কাচের উপরে নানা রঙের পাথর বসিয়ে তৈরি হয় এই গয়না। আবার কাচের উপর সোনালি সুতো দিয়ে কারুকাজ করতেও দেখা যায়। থেওয়া শিল্পের উদ্ভব হয়েছিল মোগল আমলে। রাজস্থানের প্রতাপগড় রাজপরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায়। ১৭৬০-এর দশকে রাজা সওয়ন্ত সিংহের রাজত্বকালে থেওয়া শিল্পের প্রসার ঘটে। কথিত আছে, রাজপরিবারের একজন কারিগর স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই শিল্পকলাটি আয়ত্ত করেছিলেন। পরবর্তী কালে, এই শিল্পকলাটি কেবল পরিবারের পুরুষ সদস্যদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল। আজও প্রতাপগড়ের কিছু পরিবার এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
কুন্দন
কুন্দন
রাজস্থানের রাজকীয় গয়নার সম্ভারের তালিকায় উপরে দিকেই থাকবে কুন্দন। মোগল সাম্রাজ্যের রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এই শিল্পকলার জন্ম ও বিকাশ ঘটেছিল। ষোড়শ শতাব্দীতে সম্রাট আকবরের সময়ে দিল্লি এবং সংলগ্ন এলাকায় এই শিল্পের প্রসার ঘটে। সোনা, হিরে ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতু দিয়ে তৈরি হয় কুন্দন। রাজস্থানি রাজপরিবারগুলি বিশেষ করে জয়পুর এবং বিকানেরের রানিরা বিয়েতে কুন্দনের গয়নাই পরতেন। তবে এখন সোনা ছাড়াও অন্য নানা ধাতু ও রঙিন কাচ, রঙিন নানা পাথরের সম্ভারেও কুন্দনের গয়না তৈরি করেন কারিগরেরা।
ওড়িশার ফিলিগ্রি
ওড়িশার ফিলিগ্রি।
ওড়িশার কটক শহরের তরাকশি বা ফিলিগ্রি শিল্পের ইতিহাস প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। ঐতিহাসিকদের মতে, মোগল আমলে পারস্যের কারিগরদের হাত ধরে এই শিল্পকলা ওড়িশায় প্রবেশ করে। পরবর্তীতে ওড়িশার স্থানীয় কারিগরেরা এই শিল্পে তাঁদের নিজস্ব শৈলী মিশিয়ে দেন। ওড়িশার মন্দির স্থাপত্য, বিশেষ করে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের নকশা এবং নানা রকম দেবদেবী, গাছপালা, ফুল ও পশুপাখির রূপ এই গয়নাগুলিতে ফুটিয়ে তোলা হয়। মিহি রুপোর তার দিয়ে তৈরি হয় এই সব গয়না। প্রথমে রুপোর পাত গলিয়ে সেটিকে বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে অত্যন্ত সরু ও লম্বা তারে পরিণত করা হয়। তার পর সেটি পাকিয়ে নানা অবয়ব দেওয়া হয়। বিয়ে বা কোনও উৎসবের সোনার বদলে ফিলিগ্রি গয়না উপহার দিলে আভিজাত্য বাড়বে বই কমবে না।
দক্ষিণের টেম্পল জুয়েলারি
দক্ষিণের টেম্পল জুয়েলারি
টেম্পল জুয়েলারির শিকড় অনেক গভীরে। চোল, পাণ্ড্য এবং বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সময়কার মন্দিরের ভাস্কর্য ও দেওয়ালচিত্র থেকে এই গয়নার নকশা অনুপ্রাণিত। প্রথম দিকে দেবদেবীর বিগ্রহ সাজানোর জন্যই এগুলিি ব্যবহার করা হত। পরবর্তীতে রাজপরিবারগুলিতেও এমন গয়না পরার চল হয়। তামিলনাড়ু, কেরল, কর্ণাটকে বিয়ের কনেরা এমন গয়নার সাজেই সাজেন। টেম্পল জুয়েলারি যেমন সোনার হয়, তেমনই তামার উপর সোনার জল করেও তৈরি হয় এমন গয়না। বিয়েতে উপহার হিসেবে এমন টেম্পল জুয়েলারি দিলে তা যেমন আকর্ষণীয় হবে, তেমনই রুচির পরিচয়ও দেবে।
মহারাষ্ট্রে থুসি
মহারাষ্ট্রে থুসি
মরাঠা রাজপরিবারের আভিজাত্যের প্রতীক ছিল থুশি। যা এখন পছন্দের গয়না হয়ে উঠেছে মহারাষ্ট্রে। বিশেষ করে পুণে এবং কোলহাপুরের স্বর্ণকারদের হাতে এই শিল্পের বিকাশ ঘটে। মরাঠি বিয়ের অনুষ্ঠানে পৈঠানি শাড়ির সঙ্গে থুশি পরাই রেওয়াজ। থুশি মূলত ছোট ছোট সোনার বল গেঁথে তৈরি হয়। হারটি হয় চোকারের মতো। তবে সোনা ছাড়া অন্য ধাতু দিয়েও তৈরি হয় থুশি। এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল এর পিছনের সুতো বা ‘ডোরি’। ব্যবহারকারী তাঁর গলার মাপ অনুযায়ী ছোট-বড় করে নিতে পারেন। সোনার গয়নার বদলে বিয়েতে থুশির সেট উপহার দিতেই পারেন।
অসমের জুনবিরি
অসমের জুনবিরি
অসমের জুনবিরি গয়নাশিল্পের ইতিহাস অতি প্রাচীন। অহোম রাজপরিবারের মহিলারা এমন গয়না পরতেন। এখন অসমের সংস্কৃতির সঙ্গেও এ গয়না জুড়ে গিয়েছে। স্থানীয় ভাষায় ‘জুন’ শব্দের অর্থ হল ‘চাঁদ’ ও ‘বিরি’-র অর্থ 'লকেট' বা 'রিং'। অর্থাৎ, অর্ধচন্দ্রাকার বা চাঁদের আকৃতির লকেট বা গয়নাকেই জুনবিরি বলা হয়। সোনা বা অন্য ধাতুর উপর নানা রঙের পাথর বসিয়ে এমন গয়না তৈরি হয়।
গুজরাতের পাচ্চিকাম
গুজরাতের পাচ্চিকাম
গুজরাতের কচ্ছ অঞ্চলের কারিগরেরা এমন গয়না তৈরি করেন। দেখতে কুন্দনের মতো হলেও এর নকশা ও তৈরির পদ্ধতি আলাদা। সাধারণত রুপোর ফ্রেমে নানা আকার ও রঙের পাথর বসিয়ে এই গয়না তৈরি হয়। এতে কুন্দনের মতো আঠার ব্যবহার হয় না, হাত দিয়ে চেপে পাথরগুলিকে বসানো হয়। ফ্রেমটিও তৈরি করা হয় নিখুঁত মাপে। রুপো বা অন্য ধাতুর তার দিয়ে তৈরি ফ্রেমে নানা রঙের কাচ বসিয়েও এ গয়না তৈরি হয়, যা দূর থেকে দেখলে হিরে বলেই ভ্রম হয়।
দক্ষিণের ভাঙ্কি
দক্ষিণের ভাঙ্কি
বাহুতে বা হাতের উপরের অংশে পরা হয়। ভাঙ্কি হল এক প্রকার বাজুবন্ধ, যা দক্ষিণী বিয়ের সাজের অন্যতম অলঙ্কার। দক্ষিণী রাজপরিবারগুলিতে বাজুবন্ধকে মনে করা হয়, ক্ষমতা, সমৃদ্ধি এবং রাজকীয়তার প্রতীক। যদিও এ গয়না এখন রাজপরিবারে সীমাবদ্ধ নেই। দক্ষিণ ভারতীয় বিয়ের সাজে এটি প্রায় সকলেই পরেন। ভাঙ্কি কথার অর্থ হল ‘ভি’ আকারের অলঙ্কার। এর নকশা এসেছে প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্য এবং দেবতাদের অলঙ্কার থেকে। এটিতে মূলত দেবদেবীর অবয়ব বা ময়ূরের পেখমের নকশা থাকে। তা ছাড়া নানা রকম ফুল, লতাপাতার মোটিফও ব্যবহার করা হয়। বিয়েতে কেবল হার বা দুল উপহার না দিয়ে, দক্ষিণী ধাঁচের ভাঙ্কিও উপহার হিসেবে দিতে পারেন।